Advertisement Banner

জামুকা বিল পাস: আপত্তি জামায়াতের, অনাপত্তি এনসিপির

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
জামুকা বিল পাস: আপত্তি জামায়াতের, অনাপত্তি এনসিপির
ফাইল ছবি: চরচা

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় সহযোগীদের তালিকায় মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইনের সংশোধনে আনা বিল সংসদে পাস হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমদ আজম খান ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন বিল, ২০২৬’ সংসদে পাসের প্রস্তাব করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিলটি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আপত্তি তোলেন। তবে তার দলের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) লিখিতভাবে স্পিকারকে জানিয়েছে, এ বিল নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দিলেও তিনি বিলের নির্দিষ্ট কোনো ধারায় সংশোধনী প্রস্তাব দেননি।

পরে স্পিকার বলেন, এনসিপি লিখিতভাবে তাকে জানিয়ে বিলটি নিয়ে তাদের আপত্তি নেই।

এরপর মন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এ অধ্যাদেশে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীর’ সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করতে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় সহযোগীদের তালিকায় তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম রাখা হয়েছিল।

অধ্যাদেশটি বিল হিসেবে পাস করার সুপারিশ করেছিল সংসদের বিশেষ কমিটি। ওই কমিটিতে জামায়াতের সদস্যরা বিলটি নিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন।

যা বললেন বিরোধীদলীয় নেতা

বিরোধীদলীয় নেতা বক্তব্যের শুরুতে মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষ চেয়েছিল একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা হয়েছে।

তিনি বলেন, “জনগণের রায় অস্বীকারের কারণেই যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীনরা সেই শিক্ষাও ধরে রাখতে পারেনি। এক পর্যায়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। এই সংসদ মাত্র সাত মিনিট আলোচনা করে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিল এবং একদলীয় বাকশালের জন্ম দিয়েছিল।”

তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে দেশের তখনকার সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এমনকি আওয়ামী লীগ এতটা বেপরোয়া হয়েছিল যে, আওয়ামী লীগ নামে তারা নির্বাচন করে ১৯৭০ এবং ১৯৭৩ সালে ক্ষমতায় আসলো, তারা স্বয়ং আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করল।

বিলের মূল আপত্তির জায়গা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরের সরকার, জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার সরকার কেউই আইনের সংজ্ঞায় রাজনৈতিক দলগুলোর নাম এভাবে আনেনি। বিষয়টি প্রথমে শেখ হাসিনার আমলে এসেছে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারও সামান্য পরিবর্তনসহ সেই ধারাবাহিকতা রেখেছে।

শফিকুর বলেন, “আল্লাহ ভালো জানেন, ৭১ সালের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী, আমরা বাকিরা আংশিক সাক্ষী।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতি সুস্থ ধারায় চলুক, প্রতিটি রাজনৈতিক দল জনগণের প্রতি দায়দরদ ও দেশের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে কাজ করুক। আমরা আর এই জাতিতে কোনো বিভক্তি চাচ্ছি না।

স্পিকার পরে বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা কার্যত নির্দিষ্ট কোনো আপত্তি তোলেননি, বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর তিনি মন্ত্রীকে বিলটি উত্থাপনের আহ্বান জানান।

বিলে মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী পরিবারের সংজ্ঞা নতুন করে দেওয়া হয়েছে।

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র জায়গায় ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য’ বাস্তবায়নের কথা আনা হয়েছে। একই সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পাশাপাশি ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী পরিবার’কেও আইনের আওতায় যুক্ত করা হয়েছে।

‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বলতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের বোঝানো হয়েছে।

সহযোগী শক্তির তালিকায় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের পাশাপাশি তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, দালাল ও শান্তি কমিটির নাম রাখা হয়েছে।

‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধই মুক্তিযুদ্ধ।

‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’-এর আলাদা সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা রাখা বাংলাদেশী পেশাজীবী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ডাক্তার, নার্স ও সহকারী, গণপরিষদের সদস্য হিসেবে গণ্য এমএনএ ও এমপিএ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কলাকুশলী, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিক এবং স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সম্পর্কিত