আব্দুস সবুর

জাপানের শ্রমবাজারে চাহিদা অনুসারে তিন ক্যাটাগরিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী পাঠানোর জন্য চুক্তি করেছে সরকার। তিনটি ক্যাটাগরি হলো-টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (টিআইটিপি), স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) এবং বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন।
২০২৫ সালে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরের সময় তিনটি জাপানি কোম্পানির সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। কোম্পানি তিনটি হলো-কাইকম ড্রিম স্ট্রিট (কেডিএস), ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কোঅপারেটিভস এবং জাপান বাংলা ব্রিজ রিক্রুটিং এজেন্সি (জেবিবিআরএ)।
ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কোঅপারেটিভস জাপানের ৬৫টির বেশি কোম্পানির একটি ফেডারেশন। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ২০২৬ সালে দুই হাজার, ২০২৭ সালে ছয় হাজার, ২০২৮ সালে ১২ হাজার, ২০২৯ সালে ৩০ হাজার এবং ২০৩০ সালে ৫০ হাজার শ্রমিক জাপানে পাঠানোর কথা রয়েছে।
চুক্তি অনুসারে চলতি বছরে প্রাথমিকভাবে দুই হাজার কর্মী পাঠানোর কথা। এখন পর্যন্ত ভাষা শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে সরকারের কার্যক্রম।
অন্যদিকে, সরকারিভাবে দেড় লাখ টাকায় জাপান যাওয়ার সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাপান যাচ্ছে। তবে সরকারি খরচের তুলনায় বেসরকারিভাবে যাওয়ার খরচ পড়ছে প্রায় ৬ গুণ।
যেসব খাতে জাপানে কর্মী পাঠাবে বাংলাদেশ
পাঁচটি খাতে এক লাখ কর্মী পাঠাবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে নির্মাণ খাতে ৪০ হাজার, শিল্প-কলকারখানায় ২০ হাজার, গাড়ি সার্ভিসিং ও কৃষি খাতে ২০ হাজার এবং বয়োবৃদ্ধ জাপানি নাগরিকদের সেবা দিতে কেয়ারগিভার খাতে ২০ হাজার কর্মী যাবে।
বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো (টিটিসি) চার মাস মেয়াদি জাপানি ভাষা শিক্ষার কোর্স চালু করেছে। বাংলাদেশ কোরিয়া টিটিসি (মিরপুর), মহিলা টিটিসি (মিরপুর), বাংলাদেশ কোরিয়া টিটিসি (চট্টগ্রাম), নরসিংদী টিটিসি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ টিটিসি, টাঙ্গাইল টিটিসি ও খুলনা টিটিসিসহ বিভিন্ন জেলার কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভাষা কোর্স চালু হয়েছে। প্রায় ৫০টি কেন্দ্রের মাধ্যমে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি টিটিসিতে ‘এন-ফোর’ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জাপানি ভাষা বোঝার মৌলিক ক্ষমতা অর্জন করাকেই এন-ফোর পাস বোঝানো হয়। এসএসসি পাসের সনদ থাকলেই ভর্তি হওয়া যায়। প্রতি কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ৪০ জন করে। এছাড়া, বেসরকারি কোচিং থেকেও জাপানি ভাষা শেখা যায়। ঢাকায় বেসরকারি কয়েকটি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বাংলাদেশ–জার্মান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল আলিম চরচাকে বলেন, “আমাদের এখানে বর্তমানে তিনটি ব্যাচে প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী জাপানি ভাষা শিখছে। মাত্র এক হাজার টাকায় ভাষা কোর্স শেখা সম্ভব। এখানে ছয়জনের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন জাপানিজ। তবে এখনো কোনো কেন্দ্রে দক্ষতার প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি।”
কর্মী হিসেবে যেভাবে যাওয়া যাবে জাপানে
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গামাটি ও ফরিদপুরসহ কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাঙ্গামাটিতে কেয়ারগিভার এবং ফরিদপুরে ড্রাইভিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে চারটি খাতে দক্ষতা পরীক্ষা দেওয়া যায়। সেগুলো হলো কৃষি, শিল্প-কলকারখানা বা ম্যানুফ্যাকচারিং, কেয়ারগিভিং ও ড্রাইভিং। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে কেয়ারগিভিং ও কৃষিক্ষেত্রে। জাপানে যাওয়ার প্রক্রিয়া জাপান যেতে ইচ্ছুক কর্মীকে ভাষার পরীক্ষা এন-ফাইভ অথবা এন-ফোর পাস করার পর টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (টিআইটিপি) অথবা স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এরপর বাংলাদেশি তালিকাভুক্ত এজেন্সির মাধ্যমে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো সাক্ষাৎকার নেবে। সেই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জাপানে পাঠানোর জন্য কর্মী চূড়ান্ত করা হবে।
টিআইটিপি ক্যাটাগরিতে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে ১৮ বছর বা এর বেশি বয়সী হতে হবে। জাপানি ভাষার বেসিক দক্ষতা অর্জন অর্থাৎ এন-ফাইভ লেভেল পর্যায়ের কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। টিআইটিপির আওতায় শতাধিক ধরনের কাজে যোগদানের সুযোগ রয়েছে। এ ভিসায় বাংলাদেশিরা জাপানের বিভিন্ন কোম্পানিতে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়ের জাপান সেল।
এসএসডব্লিউ ক্যাটাগরিতে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে ১৭-১৮ বছর বা এর বেশি বয়সী হতে হবে। জাপানি ভাষার এন-ফোর লেভেল পরীক্ষায় পাস করতে হবে। কর্মীরা যে ক্ষেত্রে কাজের জন্য নির্বাচিত হবে সেই ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এ ক্যাটাগরিতে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা সাধারণত কম্পিউটারভিত্তিক এবং মূলত তাত্ত্বিক। বাংলাদেশে কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন কুমুদিনী ও ব্র্যাক বিনামূল্যে কেয়ার গিভিংয়ের প্রশিক্ষণ দেয়। কেয়ারগিভিং খাতে মেয়েদের প্রাধান্য কিছুটা বেশি হলেও নারী–পুরুষ উভয়েই কাজের সুযোগ পায়।
জাপান যেতে খরচ কত
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে কর্মীদের জাপান যাওয়ার সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে সরকারিভাবে ভাষা ও দক্ষতা শেখা, কাগজপত্র প্রস্তুত, সাক্ষাৎকারসহ জাপানে পৌঁছা পর্যন্ত খরচ। তবে এই খরচকে অভিবাসন ব্যয় নয়, দেশটির যাওয়ার প্রস্তুতি খরচ হিসেব বলছে মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে বেসরকারি কয়েকটি এজেন্সি জানিয়েছে তাদের মাধ্যমে জাপান যেতে আট থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হবে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভাষা শেখা থেকে শুরু করে জাপানে পাঠানোর সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দিচ্ছে প্রার্থীকে।
জাপান জব ও স্ট্যাডি সেন্টার মিরপুর শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা ভাষা শেখানোর জন্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে থাকি। যারা জাপান যাওয়ার ফুল প্যাকেজ নেন তাদের থেকে আগে এক লাখ টাকা ও সব কাগজপত্র জমা নেওয়া হয়। এরপর ভাষা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য সব কিছু আমরা নিজেরা করে দিই। তবে জাপান পৌঁছানো পর্যন্ত সকল খরচ হিসেব আমরা আট লাখের বেশি টাকা সার্ভিস চার্জ হিসেব নিয়ে থাকি। এ ক্ষেত্রে আমাদের কারণে ভিসা না হলে আমরা সব টাকা ফেরত দেব।”
বেতন-ভাতা কত
বেতন–ভাতা জাপানে স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডাব্লিউ) হিসেবে কাজে গেলে প্রতিষ্ঠানভেদে মাসিক বেতন ধরা হবে বাংলাদেশি টাকায় এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। টেকনিক্যাল ইন্টার্নদের বেতন এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বেতন ও ওভারটাইম ধরা হবে সংশ্লিষ্ট পদ ও জাপানের শ্রম আইন অনুসারে।
জাপানে যাওয়ার বিমানভাড়া নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বহন করবে। সেখানে বাসস্থান, চিকিৎসা ও খাওয়াসহ অন্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থেকেই পাওয়া যায়। কাজের কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটিসহ অন্য বিষয়াদি জাপান সরকারের শ্রম আইন অনুসারে নির্ধারণ করা হবে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) মো. মেহবুব আলম বলেন, “বর্তমানে আমরা ৫০টির বেশি জায়গায় ভাষা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তবে বিশেষ দক্ষতার প্রশিক্ষণ এখনো শুরু হয়নি। জাপান যাওয়ার জন্য ভাষা শিখলে দক্ষতার কিছুও হয়ে যায়। কারণ দক্ষতার সব বিষয় হাতে-কলমে নয়, বরং কিছু টেকনিক্যাল বিষয় জানলেও হয়ে যায়। সেদিক থেকে কেউ ভালো করে ভাষা আয়ত্ত করলে জাপানে যেতে পারবে। এছাড়া, বিশেষ দক্ষতা শেখানোর জন্য কিছু সেন্টার তৈরির কাজ চলছে।”
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জাপান সেলের ফোকাল পারসন (উপসচিব) মো. হেদায়েতুল ইসলাম মন্ডল বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অনেক চুক্তি রয়েছে। তবে জাপান যাওয়ার জন্য অবশ্যই ভাষা ও দক্ষতা জানতে হবে। এই দুটি বিষয় অর্জনের পর জাপানের নির্ধারিত সেন্টার সাক্ষাৎকার দিয়ে পাস করতে হবে। তারপর ওই ব্যক্তি তার যোগ্যতায় ভিসা পেয়ে যাবেন। এছাড়া, আমরা জাপানি চাহিদামতো ভাষা ও দক্ষতা জানা মানুষদের একটা তালিকা করে ওয়েবাইটে প্রকাশ করব। যাতে জাপানি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান খুব সহজে তাদের চাহিদামতো দক্ষ জনবল খুঁজে পায়। এর ফলে জাপান যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও সুষ্ঠু হবে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের ৪০টির বেশি চুক্তি রয়েছে। বর্তমানে অনেক জায়গায় ভাষা প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামে টিটিসিতে কেয়ার গিভারের প্রশিক্ষণ শুরু হবে। ফরিদপুর টিটিসিতে ড্রাইভিং শেখানো হবে। কিছু জায়গায় নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ শুরুর কার্যক্রম চলছে। শুধু সরকারিভাবে নয়, জাপান বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেও তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরির কাজ করছে। এছাড়া, আমরা সব সময় বলে আসছি, দক্ষ জনবল তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন আমরা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।”

জাপানের শ্রমবাজারে চাহিদা অনুসারে তিন ক্যাটাগরিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী পাঠানোর জন্য চুক্তি করেছে সরকার। তিনটি ক্যাটাগরি হলো-টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (টিআইটিপি), স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) এবং বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন।
২০২৫ সালে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরের সময় তিনটি জাপানি কোম্পানির সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। কোম্পানি তিনটি হলো-কাইকম ড্রিম স্ট্রিট (কেডিএস), ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কোঅপারেটিভস এবং জাপান বাংলা ব্রিজ রিক্রুটিং এজেন্সি (জেবিবিআরএ)।
ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কোঅপারেটিভস জাপানের ৬৫টির বেশি কোম্পানির একটি ফেডারেশন। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ২০২৬ সালে দুই হাজার, ২০২৭ সালে ছয় হাজার, ২০২৮ সালে ১২ হাজার, ২০২৯ সালে ৩০ হাজার এবং ২০৩০ সালে ৫০ হাজার শ্রমিক জাপানে পাঠানোর কথা রয়েছে।
চুক্তি অনুসারে চলতি বছরে প্রাথমিকভাবে দুই হাজার কর্মী পাঠানোর কথা। এখন পর্যন্ত ভাষা শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে সরকারের কার্যক্রম।
অন্যদিকে, সরকারিভাবে দেড় লাখ টাকায় জাপান যাওয়ার সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাপান যাচ্ছে। তবে সরকারি খরচের তুলনায় বেসরকারিভাবে যাওয়ার খরচ পড়ছে প্রায় ৬ গুণ।
যেসব খাতে জাপানে কর্মী পাঠাবে বাংলাদেশ
পাঁচটি খাতে এক লাখ কর্মী পাঠাবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে নির্মাণ খাতে ৪০ হাজার, শিল্প-কলকারখানায় ২০ হাজার, গাড়ি সার্ভিসিং ও কৃষি খাতে ২০ হাজার এবং বয়োবৃদ্ধ জাপানি নাগরিকদের সেবা দিতে কেয়ারগিভার খাতে ২০ হাজার কর্মী যাবে।
বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো (টিটিসি) চার মাস মেয়াদি জাপানি ভাষা শিক্ষার কোর্স চালু করেছে। বাংলাদেশ কোরিয়া টিটিসি (মিরপুর), মহিলা টিটিসি (মিরপুর), বাংলাদেশ কোরিয়া টিটিসি (চট্টগ্রাম), নরসিংদী টিটিসি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ টিটিসি, টাঙ্গাইল টিটিসি ও খুলনা টিটিসিসহ বিভিন্ন জেলার কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভাষা কোর্স চালু হয়েছে। প্রায় ৫০টি কেন্দ্রের মাধ্যমে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি টিটিসিতে ‘এন-ফোর’ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জাপানি ভাষা বোঝার মৌলিক ক্ষমতা অর্জন করাকেই এন-ফোর পাস বোঝানো হয়। এসএসসি পাসের সনদ থাকলেই ভর্তি হওয়া যায়। প্রতি কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ৪০ জন করে। এছাড়া, বেসরকারি কোচিং থেকেও জাপানি ভাষা শেখা যায়। ঢাকায় বেসরকারি কয়েকটি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বাংলাদেশ–জার্মান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল আলিম চরচাকে বলেন, “আমাদের এখানে বর্তমানে তিনটি ব্যাচে প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী জাপানি ভাষা শিখছে। মাত্র এক হাজার টাকায় ভাষা কোর্স শেখা সম্ভব। এখানে ছয়জনের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন জাপানিজ। তবে এখনো কোনো কেন্দ্রে দক্ষতার প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি।”
কর্মী হিসেবে যেভাবে যাওয়া যাবে জাপানে
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গামাটি ও ফরিদপুরসহ কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাঙ্গামাটিতে কেয়ারগিভার এবং ফরিদপুরে ড্রাইভিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে চারটি খাতে দক্ষতা পরীক্ষা দেওয়া যায়। সেগুলো হলো কৃষি, শিল্প-কলকারখানা বা ম্যানুফ্যাকচারিং, কেয়ারগিভিং ও ড্রাইভিং। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে কেয়ারগিভিং ও কৃষিক্ষেত্রে। জাপানে যাওয়ার প্রক্রিয়া জাপান যেতে ইচ্ছুক কর্মীকে ভাষার পরীক্ষা এন-ফাইভ অথবা এন-ফোর পাস করার পর টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (টিআইটিপি) অথবা স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এরপর বাংলাদেশি তালিকাভুক্ত এজেন্সির মাধ্যমে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো সাক্ষাৎকার নেবে। সেই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জাপানে পাঠানোর জন্য কর্মী চূড়ান্ত করা হবে।
টিআইটিপি ক্যাটাগরিতে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে ১৮ বছর বা এর বেশি বয়সী হতে হবে। জাপানি ভাষার বেসিক দক্ষতা অর্জন অর্থাৎ এন-ফাইভ লেভেল পর্যায়ের কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। টিআইটিপির আওতায় শতাধিক ধরনের কাজে যোগদানের সুযোগ রয়েছে। এ ভিসায় বাংলাদেশিরা জাপানের বিভিন্ন কোম্পানিতে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়ের জাপান সেল।
এসএসডব্লিউ ক্যাটাগরিতে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে ১৭-১৮ বছর বা এর বেশি বয়সী হতে হবে। জাপানি ভাষার এন-ফোর লেভেল পরীক্ষায় পাস করতে হবে। কর্মীরা যে ক্ষেত্রে কাজের জন্য নির্বাচিত হবে সেই ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এ ক্যাটাগরিতে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা সাধারণত কম্পিউটারভিত্তিক এবং মূলত তাত্ত্বিক। বাংলাদেশে কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন কুমুদিনী ও ব্র্যাক বিনামূল্যে কেয়ার গিভিংয়ের প্রশিক্ষণ দেয়। কেয়ারগিভিং খাতে মেয়েদের প্রাধান্য কিছুটা বেশি হলেও নারী–পুরুষ উভয়েই কাজের সুযোগ পায়।
জাপান যেতে খরচ কত
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে কর্মীদের জাপান যাওয়ার সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে সরকারিভাবে ভাষা ও দক্ষতা শেখা, কাগজপত্র প্রস্তুত, সাক্ষাৎকারসহ জাপানে পৌঁছা পর্যন্ত খরচ। তবে এই খরচকে অভিবাসন ব্যয় নয়, দেশটির যাওয়ার প্রস্তুতি খরচ হিসেব বলছে মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে বেসরকারি কয়েকটি এজেন্সি জানিয়েছে তাদের মাধ্যমে জাপান যেতে আট থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হবে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভাষা শেখা থেকে শুরু করে জাপানে পাঠানোর সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দিচ্ছে প্রার্থীকে।
জাপান জব ও স্ট্যাডি সেন্টার মিরপুর শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা ভাষা শেখানোর জন্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে থাকি। যারা জাপান যাওয়ার ফুল প্যাকেজ নেন তাদের থেকে আগে এক লাখ টাকা ও সব কাগজপত্র জমা নেওয়া হয়। এরপর ভাষা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য সব কিছু আমরা নিজেরা করে দিই। তবে জাপান পৌঁছানো পর্যন্ত সকল খরচ হিসেব আমরা আট লাখের বেশি টাকা সার্ভিস চার্জ হিসেব নিয়ে থাকি। এ ক্ষেত্রে আমাদের কারণে ভিসা না হলে আমরা সব টাকা ফেরত দেব।”
বেতন-ভাতা কত
বেতন–ভাতা জাপানে স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডাব্লিউ) হিসেবে কাজে গেলে প্রতিষ্ঠানভেদে মাসিক বেতন ধরা হবে বাংলাদেশি টাকায় এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। টেকনিক্যাল ইন্টার্নদের বেতন এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বেতন ও ওভারটাইম ধরা হবে সংশ্লিষ্ট পদ ও জাপানের শ্রম আইন অনুসারে।
জাপানে যাওয়ার বিমানভাড়া নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বহন করবে। সেখানে বাসস্থান, চিকিৎসা ও খাওয়াসহ অন্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থেকেই পাওয়া যায়। কাজের কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটিসহ অন্য বিষয়াদি জাপান সরকারের শ্রম আইন অনুসারে নির্ধারণ করা হবে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) মো. মেহবুব আলম বলেন, “বর্তমানে আমরা ৫০টির বেশি জায়গায় ভাষা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তবে বিশেষ দক্ষতার প্রশিক্ষণ এখনো শুরু হয়নি। জাপান যাওয়ার জন্য ভাষা শিখলে দক্ষতার কিছুও হয়ে যায়। কারণ দক্ষতার সব বিষয় হাতে-কলমে নয়, বরং কিছু টেকনিক্যাল বিষয় জানলেও হয়ে যায়। সেদিক থেকে কেউ ভালো করে ভাষা আয়ত্ত করলে জাপানে যেতে পারবে। এছাড়া, বিশেষ দক্ষতা শেখানোর জন্য কিছু সেন্টার তৈরির কাজ চলছে।”
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জাপান সেলের ফোকাল পারসন (উপসচিব) মো. হেদায়েতুল ইসলাম মন্ডল বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অনেক চুক্তি রয়েছে। তবে জাপান যাওয়ার জন্য অবশ্যই ভাষা ও দক্ষতা জানতে হবে। এই দুটি বিষয় অর্জনের পর জাপানের নির্ধারিত সেন্টার সাক্ষাৎকার দিয়ে পাস করতে হবে। তারপর ওই ব্যক্তি তার যোগ্যতায় ভিসা পেয়ে যাবেন। এছাড়া, আমরা জাপানি চাহিদামতো ভাষা ও দক্ষতা জানা মানুষদের একটা তালিকা করে ওয়েবাইটে প্রকাশ করব। যাতে জাপানি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান খুব সহজে তাদের চাহিদামতো দক্ষ জনবল খুঁজে পায়। এর ফলে জাপান যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও সুষ্ঠু হবে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের ৪০টির বেশি চুক্তি রয়েছে। বর্তমানে অনেক জায়গায় ভাষা প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামে টিটিসিতে কেয়ার গিভারের প্রশিক্ষণ শুরু হবে। ফরিদপুর টিটিসিতে ড্রাইভিং শেখানো হবে। কিছু জায়গায় নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ শুরুর কার্যক্রম চলছে। শুধু সরকারিভাবে নয়, জাপান বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেও তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরির কাজ করছে। এছাড়া, আমরা সব সময় বলে আসছি, দক্ষ জনবল তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন আমরা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।”