‘নতুন বাংলাদেশ’ কি আদৌ হবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘নতুন বাংলাদেশ’ কি আদৌ হবে?
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাজপথে আন্দোলনকারীরা। ছবি: রয়টার্স

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগের ‘দুঃশাসনের’ পতন ঘটানো ‘বিপ্লবের’ পর ১৮ মাস কেটে গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষের বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে অবশেষে ‘গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন’ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কেননা ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো ‘প্রতিযোগিতামূলক’ ভোট হতে যাচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে পর্যবেক্ষকরা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকলেও, ‘সৌভাগ্যবশত’ এখন পর্যন্ত তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক নিবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, নির্বাচন, রাজনীতির মাঠ এবং নতুন বাংলাদেশের গঠন নিয়ে আলোকপাত করা হয়।

‘দ্য নিউ বাংলাদেশ ইজ অনলি হাফ বিল্ড’–শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়, এবারের নির্বাচনে লড়াইটা মূলত দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত দুটি দলের মধ্যে হবে, যারা উভয়ই বিগত শাসনামলে নির্যাতিত হয়েছিল। একটি হলো, বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ‘মধ্যপন্থী’ দল জামায়াতে ইসলামী। অন্যটি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বছরের পর বছর ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (সদ্যপ্রয়াত) দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনে জয়ের দৌড়ে বিএনপি এগিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইকোনমিস্টের নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে অনেকেই এখন হতাশ। কেননা এই অভ্যুত্থান সাহসী এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা নতুন কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতা কিংবা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আনতে পারেনি। শেখ হাসিনার শাসন ছিল ‘জঘন্য’, কিন্তু তার আগের রাজনীতিও ছিল ‘ভয়াবহ’। যে ইসলামপন্থীরা প্রচুর আসন পেতে যাচ্ছে, তারা এখন যতটা উদারতা দেখাচ্ছে, বাস্তবে সম্ভবত তার চেয়ে কম সহনশীল। আর বিএনপির আগের মেয়াদের শাসনকালেও চরম দুর্নীতি ও এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি ছিল।

তবে বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে দুই বছর আগের সেই শোচনীয় অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে ইকোনমিস্টের নিবন্ধে বলা হয়, মনে করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার শান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হতে পারে। কিন্তু সেই অবস্থা হয়নি। এসব ব্যাপার বিবেচনা করল বাংলাদেশের এই দীর্ঘ পথের অর্জন বিশাল এবং উদযাপন করার মতোই।

তবে ইকোনমিস্ট বলছে, এই নির্বাচন ‘বিপ্লবকে’ একটি নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে ঠেলে দেবে। প্রথাগত রাজনীতি পুনরায় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি মিত্রদের সমর্থন কমে আসতে পারে। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া রাজনীতিবিদরা হয়তো আবার সেই পুরনো ‘অসৎ’ পথেই ফিরে যেতে পারেন। বাংলাদেশ কেবল তখনই সমৃদ্ধ হবে, যদি এখানে সংস্কারের উদ্যম ধরে রাখা হয়। বিজয়ী যেই হোক না কেন, তাকে অনেক কিছু করতে হবে।

নিবন্ধে সবচয়ে জরুরি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অর্থনীতিকে। ইকোনমিস্ট বলছে, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে একপাশে এনে রেখেছে। কিন্তু বড় ধরনের অনেক পরিবর্তন দরকার। এই বছর ‘স্বল্পোন্নত দেশের’ তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হবে। আর এ কারণে তারা বাণিজ্য এবং সহজ শর্তে ঋণের ক্ষেত্রে সুবিধাও পাবে। তবে দেশের কারখানাকে আরও কার্যকর করা দরকার। সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, যা বর্তমানে জিডিপির মাত্র ৭%। এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এটি অনেক কম, ২০%। এ ছাড়া ঘুষের বিনিময়ে ব্যবসায়ী সমাজকে জিম্মি করে রাখা দুর্নীতিবাজ আমলাদের অনিয়ম বন্ধ করে তাদের দমন করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে নিবন্ধে। ইকোনমিস্ট বলছে, শেখ হাসিনাকে দিল্লির সরকার যেভাবে সমর্থন দিয়েছিল, তা নিয়ে বাংলাদেশিদের ক্ষোভ প্রকাশ করার অধিকার রয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা যখন ‘মিথ্যাচার’ করে বাংলাদেশকে ‘হিন্দু-বিরোধী কার্যক্রমে’ কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেন, তখন বাংলাদেশিরা বিরক্ত হন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতকে খোঁচা দেওয়া ব্যাপারে অনেক বেশিই তৎপর ছিল। পরবর্তী সরকারকে এই সম্পর্কের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে।

ইকোনমিস্টের নিবন্ধে বলা হয়, শেষ কাজটি হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কার। নির্বাচনের দিন একটি গণভোটে বাংলাদেশিদের সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে, যার লক্ষ্য হলো নতুন করে স্বৈরাচারী মনোভাব ফিরে আসার ঝুঁকি কমানো। বাংলাদেশি নাগরিকদের উচিত এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করা। পরবর্তী সরকারের উচিত এগুলোকে আইনে পরিণত করা। যদিও এই আইন কার্যকর না করে তা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তাদেরকে প্রলোভনও দেওয়া হতে পারে।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন নেতাদের উচিত হবে দলটিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার ব্যবস্থা করা। তবে কাজটা হবে বেশ ‘কষ্টকর’। কেননা শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতা ‘আঁকড়ে’ ছিলেন, তখন প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর দায় নেয়নি আওয়ামী লীগ। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ ক্ষমার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করতে হবে।

দ্য ইকোনোমিস্টের নিবন্ধের শেষদিকে বলা হয়, ‘বিপ্লব’ নিয়ে বাংলাদেশিরা গর্ব করতে পারে। আর এই বিপ্লবই বিশ্বের অন্যান্য দেশে ‘জেন জিন’ বিক্ষোভকারীদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এই নির্বাচন স্বাগত জানানোর মতো একটা মাইলফলক। তবে নতুন বাংলাদেশ গঠন করার কঠিন কাজটি কেবল শুরু হলো।

সম্পর্কিত