তড়িঘড়ি করে কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করছে বাংলাদেশ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
তড়িঘড়ি করে কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করছে বাংলাদেশ?
পোশাক খাত থেকেই আসে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। ছবি: রয়টার্স

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক বিষয়ক একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে এ চুক্তি সই হওয়ার কথা। সরকারের বিদায় বেলায় এসে এই চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে উঠছে নানা প্রশ্ন।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্লেষকদের একটি অংশ এই চুক্তিকে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের সামনের দিনগুলোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ‘কটন-ফর-গার্মেন্টস’ বা তুলার বিনিময়ে পোশাক নামে প্রস্তাবিত এই চুক্তিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা ও শুল্কচাপ মোকাবিলায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে স্বল্পোন্নত দেশে উত্তরণের কথা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ অপারস্পরিক শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে, যা দীর্ঘদিন ধরে দেশের উৎপাদন খাতকে সহায়তা দিয়ে আসছে।

এর ফলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত, যে খাত থেকেই আসে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ।

নীতিগত বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বাতিল হলে বছরে সর্বোচ্চ আট বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে বাংলাদেশের। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিল্পখাতে কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চাপের মুখে পড়তে পারে।

এদিকে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিরা পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে স্থায়ী বাণিজ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করায় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম একক বাজার আমেরিকাতেও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। গত বছরের শেষ দিকে দেশটিতে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কের মুখে পড়েন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা, এতে কিছু পণ্যে শুল্কহার ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এই উচ্চ শুল্কের কারণে আমেরিকায় চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি কমেছে।

আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণে উৎপাদিত কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করবে, সেই অনুপাতে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণে উৎপাদিত কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করবে, সেই অনুপাতে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। ছবি: রয়টার্স

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন বাণিজ্য চুক্তিটি সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে শুল্ক প্রতিবন্ধকতা কমানোর পথ তৈরি করতে পারে। এর লক্ষ্য বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়িয়ে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা।

চুক্তির ‘স্কয়ার-মিটার ফর স্কয়ার-মিটার’ কাঠামোর আওতায়, আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণে উৎপাদিত কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করবে, সেই অনুপাতে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।

এশিয়া টাইমস বলছে, এই পদ্ধতিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে আমেরিকার কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণ হবে, পাশাপাশি মূল্য প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশের জন্য একটি শুল্ক সুরক্ষা তৈরি হবে।

তাৎক্ষণিক শুল্ক ছাড়ের বাইরে, চুক্তিতে এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন চেয়ে আসছিল। পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামাতে ই-কমার্সে শুল্ক আরোপ না করার অঙ্গীকার করেছে ঢাকা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেধাস্বত্ব (আইপিআর) নীতিমালা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও)আমেরিকার সংস্কার উদ্যোগগুলোকে সমর্থন দিতেও সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ জি-৭৭ জোটভিত্তিক প্রচলিত অবস্থান থেকে সরে এসে স্বার্থভিত্তিক পশ্চিমা বাণিজ্য নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্পখাতে বৈচিত্র্য আনতে এবং উচ্চমানের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করতে আরও উন্নত নিয়ন্ত্রক পরিবেশের প্রয়োজন। এসব কারণ বিবেচনাতেই চুক্তিতে এসব ছাড় দেওয়া হয়েছে।

চুক্তিটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আদর্শিক ভিত্তি ‘জুলাই সনদের’ চাপের মধ্যে কাজ করছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে এই বাণিজ্য চুক্তিকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সক্ষমতার দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

এই চুক্তি দেশীয় ভোটার ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বার্তা দিচ্ছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ভোটের আগে চুক্তি নিশ্চিত করে ইউনূস প্রশাসন ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ কাঠামোয় কার্যত একটি পশ্চিমমুখী বাণিজ্য অভিমুখ স্থাপন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এতে পরবর্তী সরকারের পক্ষে নীতিগতভাবে ভিন্ন পথে যাওয়া কঠিন করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভূ–রাজনৈতিক দিক থেকেও এই চুক্তির গুরুত্ব রয়েছে। বহুমেরুকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এক ধরনের ভারসাম্য নীতি অনুসরণ করছে। যেমন: অবকাঠামোতে চীনা বিনিয়োগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ভারতের সহযোগিতা এবং শিল্পপণ্যের সবচেয়ে বড় ভোক্তা ও বৃহৎ এফডিআই উৎস হিসেবে আমেরিকার ভূমিকা।

গত বছর বাংলাদেশের পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
গত বছর বাংলাদেশের পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও গভীর বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এই ভারসাম্যে একটি প্রতিপক্ষ শক্তি যোগ করে, যাতে বাংলাদেশ কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। একই সঙ্গে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে আমেরিকার পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলেও, পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের (তুলার বিনিময়ে পোশাক) সম্পর্ককে বাস্তবভিত্তিক স্থিতিশীলতার পথে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, চুক্তি সই করা এই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়, বরং সূচনা। নির্বাচনের পর বাস্তবায়নই হবে কটন-ফর-গার্মেন্টস মডেলের আসল পরীক্ষা।

ইতিহাস বলছে, বাণিজ্য সুবিধা বাস্তবায়নের শেষ ধাপে বাংলাদেশ প্রায়ই সমস্যায় পড়েছে। দুর্বল বন্দর অবকাঠামো, কাস্টমসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং শ্রমমান প্রয়োগে সীমিত স্বচ্ছতা প্রায়ই অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধার সুফল কমিয়ে দিয়েছে।

এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই চুক্তির পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে পরবর্তী সরকারকে লজিস্টিক ও ডিজিটাল বাণিজ্য অবকাঠামোতে সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। না হলে, এটি যদি কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে কেবল রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে থেকে যায়, তবে বিপ্লব-পরবর্তী অর্থনীতিতে জ্বালানি ও শ্রম ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ১৫ শতাংশ শুল্কহারও শিল্পখাতের জন্য বড় চাপ হয়ে থাকতে পারে।

এশিয়া টাইমস বলছে, চুক্তিটি বাংলাদেশের রপ্তানি মডেলের টেকসই যোগ্যতা নিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনার পথও খুলে দেবে। তুলা নিয়ে এই ব্যবস্থাটি তৈরি পোশাক খাতকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও, উচ্চমূল্য সংযোজিত উৎপাদন ও সেবাখাতে বৈচিত্র্য আনার গভীর প্রয়োজনীয়তাকে কিন্তু কমিয়ে দেবে না।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও মেধাস্বত্ব অধিকারের ওপর আমেরিকা জোর দিলেও এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার জন্য যে ব্যাপক মানবসম্পদ বিনিয়োগ দরকার, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। এই পরিস্থিতিতে কটন ফর গার্মেস্টস মডেলকে একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। যা বিদ্যমান অবস্থাকে কয়েক বছর টিকিয়ে রেখে বাংলাদেশকে পরবর্তী রপ্তানি গন্তব্য খোঁজার সময় দিচ্ছে।

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে সই অনুষ্ঠানটি পরিবর্তনের এক শক্তিশালী সূচনা বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চুক্তি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই রাজনৈতিক স্থায়িত্বের চূড়ান্ত নির্ধারক।

এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতির সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বাংলাদেশের। এই অবস্থায় আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা সময়সীমা শেষ হলেও যেন পোশাক কারখানার আলো নিভে না যায়— সেই নিশ্চয়তা দেয়।

তবে এই চুক্তি নতুন সমৃদ্ধির ভিত্তি হবে, নাকি অর্থনৈতিক সংকোচনের ইতিহাসে একটি ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় হয়ে থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

সম্পর্কিত