কেয়া সরকার

বিয়ের মধ্য দিয়ে দুটি মানুষ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একেক দেশে বিয়ের রীতিনীতি, পোশাক-আশাক, ঐতিহ্য একেক রকম। কখনো এক দেশের বিয়ের রীতি অন্য দেশের বিপরীত। যেমন: বাংলাদেশে বিয়ের সময় কন্যাপক্ষ পাত্রপক্ষকে বিভিন্ন উপহার দিয়ে থাকে, যা আমরা যৌতুক হিসেবে অভিহিত করে থাকি। আর চীনে হয় তার ঠিক উল্টো। বিয়ে করতে হলে পাত্রপক্ষকে দিতে হয় ‘ব্রাইড প্রাইস’।
এ নিয়ে আবার অনেক যুবক নানা দুশ্চিন্তায় ভোগেন। বাংলাদেশে যেমন মেয়েকে বিয়ে দিতে গেলে কন্যাপক্ষের গলার কাঁটা হয়ে ওঠে যৌতুক, চীনের বিয়ের বাজারের অন্যতম সমস্যা এই ব্রাইড প্রাইস বা কনেকে বিয়ের জন্য দিতে হয় অর্থ। সম্প্রতি চীনে শিশু জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এই ব্রাইড প্রাইস বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইউন চিচি নামে এক নারী চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিয়াওহংশুতে বিয়ের উপযুক্ত এক পাত্রের জন্য পোস্ট দেন। সেখানে পাত্রের বহু গুণগান করেন তিনি। পোস্টে লেখেন ওই পাত্রের একটি গাড়ি আছে, হাসপাতালে একটি স্থায়ী চাকরি আছে। তার বাবা-মায়ের অবসরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত। তিনি ধূমপান বা মদ্যপান করেন না, রান্না করতে পারেন এবং স্বভাবেও শান্ত। এক কথায়, একবারে আদর্শ পাত্র।
এরপর চিচি লেখেন, তিনি যদি ওই পাত্রকে নিজের পরিবারে জামাই হিসেবে নিতে (যা চীনে বেশ অস্বাভাবিক) চান, তাহলে বিয়ের বাজারে তার জন্য কত টাকা দিতে হবে।
মজার ব্যাপার হলো, পোস্টকারী আসলে মেয়ে সেজে নিজেকেই বর্ণনা করছিলেন। এই সত্য প্রকাশের আগেই পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। সত্য প্রকাশের পর পোস্টটি দ্রুত মুছে ফেলা হয়।
চীনে এখনো দিতে হয় ব্রাইড প্রাইস
চীনের ইতিহাসে ভালোবাসা ছিল মূলত লেনদেননির্ভর। ঐতিহ্যগতভাবে ঘটকরা পরিবারিক মর্যাদা, সম্পদ ও সামাজিক রীতিনীতি বিবেচনা করতেন।

অর্গানাইজেশন অব রিসার্চ অন চায়না অ্যান্ড এশিয়াতে (ওআরসিএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত কনের পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের কাছ থেকে কনের শ্রমশক্তি হারানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্রাইড প্রাইসের প্রচলন শুরু হয়েছিল। যেটি চীনে ‘কাইলি’ নামে পরিচিত।
তবে ১৯৯০–এর দশকে চীনে বাজার উদারীকরণের পর এটি ধীরে ধীরে একটি বড় অর্থনৈতিক লেনদেনে পরিণত হয়। ২০২৩ সালের মধ্যে সারা দেশে কনের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৬৯ হাজার ইউয়ান। তুলনামূলকভাবে ধনী প্রদেশ যেমন ঝেজিয়াংয়ে এই অঙ্ক গড়ে এক লাখ ৮৩ হাজার ইউয়ানেরও বেশি ছিল।
এর বিপরীতে, জিয়াংসি মতো গ্রামীণ অঞ্চলে কনের মূল্য তিন লাখ ৮০ হাজার ইউয়ান ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে বাড়ি বা গাড়ির মতো অতিরিক্ত দাবিগুলো থাকে না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দেশে ‘বিয়ে বাবদ মূল্য’ বা ব্রাইড প্রাইস দেওয়ার প্রথা ধীরে ধীরে উঠে গেলেও চীনে এখনো এই প্রথা অনেকাংশে চলমান।
কিছু চীনা নাগরিক মনে করেন, ব্রাইড প্রাইস নারীদের পণ্যে পরিণত করে। আবার দেশটির কিছু রক্ষণশীল মানুষের দাবি, এমন অর্থ গ্রহণ করা মানেই যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেওয়া।
আমেরিকার জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইফেং ওয়ানের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, চীনের গ্রামগুলোতে বিয়ের ক্ষেত্রে মাঝারি যোগ্যতাসম্পন্ন কনের মূল্য ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তব হিসাবে দ্বিগুণ হয়েছে। শহরাঞ্চলেও এই অঙ্ক বাড়ছে।
এদিকে, ২০০১ সালে সাংহাই একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের লিউ ওয়েনরংয়ের গবেষণা অনুযায়ী, ওই সময়ে ১২ শতাংশেরও কম মানুষ প্রেম ছাড়া বিয়ে করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বাস্তব বিবেচনার চাপে রোমান্স ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। বর্তমানে সাংহাইয়ে ২৫ শতাংশ পুরুষ এবং ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ নারী বলেন, তারা প্রেম ছাড়াও বিয়ে করতে রাজি।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চীনের বিয়ের সংকটের জন্য অর্থনৈতিক মন্দাও একটি বড় কারণ হতে পারে। উচ্চশিক্ষা এখন আর ভালো চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না এবং নভেম্বর পর্যন্ত যুব বেকারত্বের হার ছিল ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। অনেক পরিবারই আশা করে পাত্রের নিজের একটি বাড়ি থাকবে। ফলে অর্থনৈতিক সংকট বহু তরুণের বিয়ের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে তরুণরা অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পড়ছে। সাংহাইয়ে প্রায় অর্ধেক অবিবাহিত তরুণী বলেন, বাবা-মায়ের অনুমোদন না পেলে তারা বিয়ে করবেন না।

অনেকে বিয়ের সামাজিক ও আর্থিক চাপ এড়িয়ে চলতেই বিয়ে থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। গত বছরের প্রথমভাগে মাত্র ১৮ লাখ দম্পতি বিয়ে নিবন্ধন করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ কম। ২৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে অবিবাহিত থাকার হার ৫০ শতাংশের বেশি।
চীন সরকারের ‘মাথা ব্যথ্যা’ ব্রাইড প্রাইস
কন্যামূল্য দেওয়ার এই রীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন চীনের সরকার। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তারা, যেখানে আয় অনুযায়ী কনের মূল্য খুবই বেশি। অনেক সময় প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে বরপক্ষের পরিবার দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। এই ব্রাইড প্রাইসের বৃদ্ধি চীনের বিয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার পেছেনে অন্যতম কারণ বলে অভিহিত করেছে ওআরসিএ।
২০১৯ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টি নিয়মিত এই সমস্যাটি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবুও খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। যদিও চীনের আইন অনুযায়ী ‘বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থ বা উপহার আদায়’ নিষিদ্ধ। তবে গ্রামাঞ্চলের কর্মকর্তারা স্থানীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখাতে এবং পারিবারিক বিবাদে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে সাধারণত হস্তক্ষেপ এড়িয়ে যান। বিভিন্ন জায়গায় কনের মূল্য নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই সীমাও কখনো কখনো বেশ বেশি। উদাহরণস্বরূপ গানসু প্রদেশের কিছু এলাকায় পঞ্চাশ হাজার থেকে আশি হাজার ইউয়ান পর্যন্ত।
চীনে প্রায় সব শিশুই বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেই জন্মায়, তাই এই পরিস্থিতি সরকারের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। গত ১৯ জানুয়ারি সরকার জানায়, জন্মহার ১৯৪৯ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। প্রতি এক হাজার জনে ৫ দশমিক ৬৩ জন জন্ম নিচ্ছে (অন্যদিকে মৃত্যুহার ৮ দশমিক ৪)।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মহার বাড়ানোর চেষ্টায় এবার অভিনব সব ব্যবস্থা নিয়েছে চীন। নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে কনডমসহ সব ধরনের গর্ভনিরোধক পণ্যের ওপর ১৩ শতাংশ বিক্রয় কর কার্যকর করা হয়েছে।
সেই সঙ্গে, তরুণ প্রজন্মকে সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করতে শিশু যত্ন (চাইল্ড কেয়ার) ও বিয়ে সংক্রান্ত সেবাকে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে কর ব্যবস্থায় এই রদবদলের ফলে ১৯৯৪ সাল থেকে চলে আসা বহু করছাড় বাতিল হয়ে গেছে।
গত বছরের মে মাসে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গানসু প্রদেশের সরকার এ বছরের শেষ নাগাদ উচ্চ ব্রাইড প্রাইস ‘কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ’ এবং ২০২৬ সালে তা ‘ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার’ একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, চীনে এই প্রথার পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক পুরুষের বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা। দেশটিতে লিঙ্গ ভারসাম্যে বিশাল অসামাঞ্জস্যতা রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে বিয়ের উপযুক্ত বয়সী গোষ্ঠীতে প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষ থাকবে ১১৯ জন।
আবার নারীরাও সংস্কারের বিরোধিতা করেন। অনেকেই কনের মূল্যকে বিবাহবিচ্ছেদের বিরুদ্ধে এক ধরনের সুরক্ষা হিসেবে দেখেন, কারণ চীনে বিয়ে ভাঙার হার আমেরিকার তুলনায় বেশি।
সব মিলিয়ে বিয়ে নিয়ে শাঁখের করাতে আছে চীনের সরকার। একদিকে আছে সামাজিক, অর্থনৈতিক বাধা, অন্যদিকে শ্রমশক্তিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এ সমস্যার সমাধানও অতীব প্রয়োজন। সি চিন পিংয়ের সরকার এ ক্ষেত্রে কতটা কী করতে পারে, তাই এখন দেখার।

বিয়ের মধ্য দিয়ে দুটি মানুষ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একেক দেশে বিয়ের রীতিনীতি, পোশাক-আশাক, ঐতিহ্য একেক রকম। কখনো এক দেশের বিয়ের রীতি অন্য দেশের বিপরীত। যেমন: বাংলাদেশে বিয়ের সময় কন্যাপক্ষ পাত্রপক্ষকে বিভিন্ন উপহার দিয়ে থাকে, যা আমরা যৌতুক হিসেবে অভিহিত করে থাকি। আর চীনে হয় তার ঠিক উল্টো। বিয়ে করতে হলে পাত্রপক্ষকে দিতে হয় ‘ব্রাইড প্রাইস’।
এ নিয়ে আবার অনেক যুবক নানা দুশ্চিন্তায় ভোগেন। বাংলাদেশে যেমন মেয়েকে বিয়ে দিতে গেলে কন্যাপক্ষের গলার কাঁটা হয়ে ওঠে যৌতুক, চীনের বিয়ের বাজারের অন্যতম সমস্যা এই ব্রাইড প্রাইস বা কনেকে বিয়ের জন্য দিতে হয় অর্থ। সম্প্রতি চীনে শিশু জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এই ব্রাইড প্রাইস বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইউন চিচি নামে এক নারী চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিয়াওহংশুতে বিয়ের উপযুক্ত এক পাত্রের জন্য পোস্ট দেন। সেখানে পাত্রের বহু গুণগান করেন তিনি। পোস্টে লেখেন ওই পাত্রের একটি গাড়ি আছে, হাসপাতালে একটি স্থায়ী চাকরি আছে। তার বাবা-মায়ের অবসরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত। তিনি ধূমপান বা মদ্যপান করেন না, রান্না করতে পারেন এবং স্বভাবেও শান্ত। এক কথায়, একবারে আদর্শ পাত্র।
এরপর চিচি লেখেন, তিনি যদি ওই পাত্রকে নিজের পরিবারে জামাই হিসেবে নিতে (যা চীনে বেশ অস্বাভাবিক) চান, তাহলে বিয়ের বাজারে তার জন্য কত টাকা দিতে হবে।
মজার ব্যাপার হলো, পোস্টকারী আসলে মেয়ে সেজে নিজেকেই বর্ণনা করছিলেন। এই সত্য প্রকাশের আগেই পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। সত্য প্রকাশের পর পোস্টটি দ্রুত মুছে ফেলা হয়।
চীনে এখনো দিতে হয় ব্রাইড প্রাইস
চীনের ইতিহাসে ভালোবাসা ছিল মূলত লেনদেননির্ভর। ঐতিহ্যগতভাবে ঘটকরা পরিবারিক মর্যাদা, সম্পদ ও সামাজিক রীতিনীতি বিবেচনা করতেন।

অর্গানাইজেশন অব রিসার্চ অন চায়না অ্যান্ড এশিয়াতে (ওআরসিএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত কনের পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের কাছ থেকে কনের শ্রমশক্তি হারানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্রাইড প্রাইসের প্রচলন শুরু হয়েছিল। যেটি চীনে ‘কাইলি’ নামে পরিচিত।
তবে ১৯৯০–এর দশকে চীনে বাজার উদারীকরণের পর এটি ধীরে ধীরে একটি বড় অর্থনৈতিক লেনদেনে পরিণত হয়। ২০২৩ সালের মধ্যে সারা দেশে কনের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৬৯ হাজার ইউয়ান। তুলনামূলকভাবে ধনী প্রদেশ যেমন ঝেজিয়াংয়ে এই অঙ্ক গড়ে এক লাখ ৮৩ হাজার ইউয়ানেরও বেশি ছিল।
এর বিপরীতে, জিয়াংসি মতো গ্রামীণ অঞ্চলে কনের মূল্য তিন লাখ ৮০ হাজার ইউয়ান ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে বাড়ি বা গাড়ির মতো অতিরিক্ত দাবিগুলো থাকে না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দেশে ‘বিয়ে বাবদ মূল্য’ বা ব্রাইড প্রাইস দেওয়ার প্রথা ধীরে ধীরে উঠে গেলেও চীনে এখনো এই প্রথা অনেকাংশে চলমান।
কিছু চীনা নাগরিক মনে করেন, ব্রাইড প্রাইস নারীদের পণ্যে পরিণত করে। আবার দেশটির কিছু রক্ষণশীল মানুষের দাবি, এমন অর্থ গ্রহণ করা মানেই যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেওয়া।
আমেরিকার জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইফেং ওয়ানের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, চীনের গ্রামগুলোতে বিয়ের ক্ষেত্রে মাঝারি যোগ্যতাসম্পন্ন কনের মূল্য ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তব হিসাবে দ্বিগুণ হয়েছে। শহরাঞ্চলেও এই অঙ্ক বাড়ছে।
এদিকে, ২০০১ সালে সাংহাই একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের লিউ ওয়েনরংয়ের গবেষণা অনুযায়ী, ওই সময়ে ১২ শতাংশেরও কম মানুষ প্রেম ছাড়া বিয়ে করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বাস্তব বিবেচনার চাপে রোমান্স ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। বর্তমানে সাংহাইয়ে ২৫ শতাংশ পুরুষ এবং ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ নারী বলেন, তারা প্রেম ছাড়াও বিয়ে করতে রাজি।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চীনের বিয়ের সংকটের জন্য অর্থনৈতিক মন্দাও একটি বড় কারণ হতে পারে। উচ্চশিক্ষা এখন আর ভালো চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না এবং নভেম্বর পর্যন্ত যুব বেকারত্বের হার ছিল ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। অনেক পরিবারই আশা করে পাত্রের নিজের একটি বাড়ি থাকবে। ফলে অর্থনৈতিক সংকট বহু তরুণের বিয়ের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে তরুণরা অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পড়ছে। সাংহাইয়ে প্রায় অর্ধেক অবিবাহিত তরুণী বলেন, বাবা-মায়ের অনুমোদন না পেলে তারা বিয়ে করবেন না।

অনেকে বিয়ের সামাজিক ও আর্থিক চাপ এড়িয়ে চলতেই বিয়ে থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। গত বছরের প্রথমভাগে মাত্র ১৮ লাখ দম্পতি বিয়ে নিবন্ধন করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ কম। ২৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে অবিবাহিত থাকার হার ৫০ শতাংশের বেশি।
চীন সরকারের ‘মাথা ব্যথ্যা’ ব্রাইড প্রাইস
কন্যামূল্য দেওয়ার এই রীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন চীনের সরকার। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তারা, যেখানে আয় অনুযায়ী কনের মূল্য খুবই বেশি। অনেক সময় প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে বরপক্ষের পরিবার দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। এই ব্রাইড প্রাইসের বৃদ্ধি চীনের বিয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার পেছেনে অন্যতম কারণ বলে অভিহিত করেছে ওআরসিএ।
২০১৯ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টি নিয়মিত এই সমস্যাটি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবুও খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। যদিও চীনের আইন অনুযায়ী ‘বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থ বা উপহার আদায়’ নিষিদ্ধ। তবে গ্রামাঞ্চলের কর্মকর্তারা স্থানীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখাতে এবং পারিবারিক বিবাদে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে সাধারণত হস্তক্ষেপ এড়িয়ে যান। বিভিন্ন জায়গায় কনের মূল্য নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই সীমাও কখনো কখনো বেশ বেশি। উদাহরণস্বরূপ গানসু প্রদেশের কিছু এলাকায় পঞ্চাশ হাজার থেকে আশি হাজার ইউয়ান পর্যন্ত।
চীনে প্রায় সব শিশুই বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেই জন্মায়, তাই এই পরিস্থিতি সরকারের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। গত ১৯ জানুয়ারি সরকার জানায়, জন্মহার ১৯৪৯ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। প্রতি এক হাজার জনে ৫ দশমিক ৬৩ জন জন্ম নিচ্ছে (অন্যদিকে মৃত্যুহার ৮ দশমিক ৪)।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মহার বাড়ানোর চেষ্টায় এবার অভিনব সব ব্যবস্থা নিয়েছে চীন। নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে কনডমসহ সব ধরনের গর্ভনিরোধক পণ্যের ওপর ১৩ শতাংশ বিক্রয় কর কার্যকর করা হয়েছে।
সেই সঙ্গে, তরুণ প্রজন্মকে সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করতে শিশু যত্ন (চাইল্ড কেয়ার) ও বিয়ে সংক্রান্ত সেবাকে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে কর ব্যবস্থায় এই রদবদলের ফলে ১৯৯৪ সাল থেকে চলে আসা বহু করছাড় বাতিল হয়ে গেছে।
গত বছরের মে মাসে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গানসু প্রদেশের সরকার এ বছরের শেষ নাগাদ উচ্চ ব্রাইড প্রাইস ‘কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ’ এবং ২০২৬ সালে তা ‘ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার’ একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, চীনে এই প্রথার পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক পুরুষের বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা। দেশটিতে লিঙ্গ ভারসাম্যে বিশাল অসামাঞ্জস্যতা রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে বিয়ের উপযুক্ত বয়সী গোষ্ঠীতে প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষ থাকবে ১১৯ জন।
আবার নারীরাও সংস্কারের বিরোধিতা করেন। অনেকেই কনের মূল্যকে বিবাহবিচ্ছেদের বিরুদ্ধে এক ধরনের সুরক্ষা হিসেবে দেখেন, কারণ চীনে বিয়ে ভাঙার হার আমেরিকার তুলনায় বেশি।
সব মিলিয়ে বিয়ে নিয়ে শাঁখের করাতে আছে চীনের সরকার। একদিকে আছে সামাজিক, অর্থনৈতিক বাধা, অন্যদিকে শ্রমশক্তিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এ সমস্যার সমাধানও অতীব প্রয়োজন। সি চিন পিংয়ের সরকার এ ক্ষেত্রে কতটা কী করতে পারে, তাই এখন দেখার।