উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যের বাজার কেন সম্প্রসারিত হচ্ছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যের বাজার কেন সম্প্রসারিত হচ্ছে
বর্তমানে বোটক্স, হায়ালুরোনিক ফিলার, কেমিক্যাল পিল, লেজার দিয়ে লোম অপসারণ বা চুল ঘন করা করা হয়। ছবি: ফ্রিপিক

বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় সব দেশেরই বড় সমস্যা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ এই কঠিন সময়েও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যের বাজারে, যা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে।

প্যারিসভিত্তিক জরিপ প্রতিষ্ঠান ইপসসের ২০টি দেশের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থা এখনো দুর্বল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক বাণিজ্যচুক্তি ভেঙে দেওয়ার প্রবণতা কিংবা বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকিও ভোক্তাদের মনোবল বাড়াতে পারেনি। তবু দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, নিত্যপণ্য কিনতে কষ্ট হলেও মানুষের চেহারায় উজ্জ্বলতা বেড়েছে।

আমেরিকার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিন্সির হিসাব অনুযায়ী, ত্বক, চুল, মেকআপ ও সুগন্ধি—সব মিলিয়ে ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যে খুচরা ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৪০ বিলিয়ন ডলার। আগের দুই বছরে এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৭ শতাংশ, যা সামগ্রিক খুচরা বাজারের প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি।

কঠিন সময়ে মানুষ ছোটখাটো বিলাসে খরচ বাড়ায়—এই প্রবণতাকে একসময় আমেরিকান বিউটি উদ্যোক্তা লিওনার্ড লডার নাম দিয়েছিলেন ‘লিপস্টিক ইফেক্ট’।

আমেরিকান প্রসাধনী প্রস্তুতকারক কোম্পানি এস্টি লডারের বর্তমান প্রধান স্টেফান দ্য লা ফাভেরির মতে, মানুষ নিজেকে আরও ‘আত্মবিশ্বাসী’ দেখানোর জন্য এসব পণ্য কিনে থাকে।

তবে সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যের বাড়তি চাহিদার পেছনে কেবল মানসিক সান্ত্বনা নয়, আরও গভীর কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিপুলসংখ্যক পুরুষও এখন সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যে খরচ করছেন। ছবি: রয়টার্স
বিপুলসংখ্যক পুরুষও এখন সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যে খরচ করছেন। ছবি: রয়টার্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানো ভোক্তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিজের চেহারা নিয়ে সচেতন। পাশাপাশি দ্রুত ওজন কমানোর ওষুধ ও উন্নত প্লাস্টিক সার্জারির দিকেও ঝুঁকছেন অনেকে। ফলে নতুন ক্রেতা, নতুন পণ্য ও নতুন ব্র্যান্ডের সম্মিলিত ঢেউ সৌন্দর্যবর্ধক শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

নতুন শ্রেণির ক্রেতা

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শিল্প আর শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিপুলসংখ্যক পুরুষও এখন সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যে খরচ করছেন। হেয়ার জেল বা ফেসক্রিমের পাশাপাশি মেকআপেও বাড়ছে ব্যয়। বিশেষ করে টিন্টেড ময়েশ্চারাইজার, কনসিলার ও আইব্রো জেলের মতো হালকা পণ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

সেফোরার মতো খুচরা বিক্রেতারা কসমেটিকস কাউন্টারে পুরুষ বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে, যাতে পুরুষ ক্রেতারা কম অস্বস্তি বোধ করেন। দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পুরুষ বিউটি ইনফ্লুয়েন্সাররা সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে ভূমিকা রাখছেন। সেফোরার কর্মকর্তা প্রিয়া ভেঙ্কটেশের ভাষায়, “পুরুষদের মেকআপ করা এখন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য।”

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশু-কিশোরদের মধ্যেও সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিপগ্লস থেকে অ্যান্টি-এজিং ক্রিম পর্যন্ত নানা পণ্য দেখে তারা বাবা-মাকে কিনে দিতে বলছে। আল্টা বিউটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালে জন্ম নেওয়া আমেরিকানরা সাধারণত ১৮ বছর বয়সের পর এসব পণ্য ব্যবহার শুরু করতেন। কিন্তু জেনারেশন-আলফা (২০১০–২০২৫ সালে জন্ম নেওয়া) মাত্র আট বছর বয়সেই এসব পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।

ভোক্তাদের সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যে করা ব্যয়ের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশই যায় স্কিন কেয়ারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (আসল ও ভুয়া) ত্বকবিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মানুষ রেটিনলের মতো সক্রিয় উপাদান সম্পর্কে শিখছেন, যা বয়সের ছাপ কমাতে সহায়ক।

‘দ্য অর্ডিনারি’র মতো ব্র্যান্ড তুলনামূলক কম দামে উচ্চমাত্রার সক্রিয় উপাদানযুক্ত পণ্য বাজারে আনছে। রোমান্টিক নাম ও গোলাপি জারের বদলে এখন জনপ্রিয় হচ্ছে সাদামাটা বোতল ও ক্লিনিক্যাল লেবেল। কোলাজেন ট্যাবলেটের মতো ‘বিউটি ইনজেস্টিবল’ এবং এলইডি ফেস মাস্কের মতো যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বাড়ছে।

২০২৪ সালে নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিউটি সার্ভিসে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। এসব সেবায় ব্যবহৃত হয় এমন পদার্থ ও যন্ত্র, যা সাধারণ ভোক্তারা নিজেরা কিনতে পারেন না—যেমন বোটক্স, হায়ালুরোনিক ফিলার, কেমিক্যাল পিল, লেজার দিয়ে লোম অপসারণ বা চুল ঘন করা।

এস্টি লডারের বর্তমান প্রধান স্টেফান দ্য লা ফাভেরির মতে, মানুষ নিজেকে আরও ‘আত্মবিশ্বাসী’ দেখানোর জন্য এসব পণ্য কিনে থাকে। ছবি: রয়টার্স
এস্টি লডারের বর্তমান প্রধান স্টেফান দ্য লা ফাভেরির মতে, মানুষ নিজেকে আরও ‘আত্মবিশ্বাসী’ দেখানোর জন্য এসব পণ্য কিনে থাকে। ছবি: রয়টার্স

ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব অ্যাস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২ কোটির বেশি নন-সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া হয়েছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে সৌন্দর্যবর্ধক শিল্প ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমারেখা ক্রমেই মুছে যাচ্ছে।

লন্ডনের সেলিব্রিটি ফেসিয়ালিস্ট সারা চ্যাপম্যান জানান, তার ক্লিনিকে এখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রেসক্রিপশন লেখেন এমন চিকিৎসক, এমনকি রক্ত ও মল পরীক্ষা করা মেডিকেল পেশাজীবীরাও কাজ করেন। তাদের লক্ষ্য শুধু বলিরেখা কমানো নয়, বরং ক্লায়েন্টদের সুস্থ দেখাতে সহায়তা করা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নতুন ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বিজ্ঞাপন ছাড়াই ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। ব্রিটিশ মেকআপ ব্র্যান্ড শার্লট টিলবারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে তাদের ‘সবচেয়ে বড় শোরুম’ বলে উল্লেখ করেছেন। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কিন কেয়ার ব্র্যান্ড বাবলও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে কিশোর ফলোয়ার তৈরি করেছে।

সুগন্ধির ক্ষেত্রেও নতুন কৌশল দেখা যাচ্ছে। সল দে জানেইরো পারফিউমকে ‘মিস্ট’ নামে বাজারজাত করেছে, আর কায়ালি গ্রাহকদের একাধিক সুগন্ধি ‘লেয়ারিং’ করতে উৎসাহ দিচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এসব নতুন ব্র্যান্ড পুরোনো কোম্পানিগুলোর জন্য হুমকির চেয়ে সুযোগই বেশি তৈরি করছে। বড় কোম্পানিগুলো দ্রুত জনপ্রিয় ব্র্যান্ড অধিগ্রহণ করছে। মে মাসে আমেরিকান প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান ইএলএফ বিউটি, হেইলি বিবারের মেকআপ ব্র্যান্ড কিনেছে সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন ডলারে। এস্টি লডার কিনেছে দ্য অর্ডিনারি। ল’রিয়াল ‘বিজ্ঞানভিত্তিক’ ব্র্যান্ড মেডিক৮-এ বড় শেয়ার নিয়েছে এবং সুইস অ্যাস্থেটিক ইনজেকশন প্রস্তুতকারী গালডার্মায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। পি অ্যান্ড জি ও ইউনিলিভারও অধিগ্রহণে সক্রিয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা শীর্ষ কোম্পানিগুলোকে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার ও বড় আকারের বিজ্ঞাপন চালানোর আর্থিক সক্ষমতা দিচ্ছে। একই সঙ্গে চীনে স্থানীয় ব্র্যান্ডের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো আমেরিকা ও ইউরোপে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করছে।

সম্পর্কিত