দফায় দফায় সংশোধন: গণভোটের ফলাফলে আসলে কী ঘটেছে?

দফায় দফায় সংশোধন: গণভোটের ফলাফলে আসলে কী ঘটেছে?
গণভোট। ছবি: চরচা

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোটের ফলাফল প্রকাশের পর থেকে সংখ্যার অমিল নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা চলছে। ভোট শেষ হওয়ার ১৩ দিন পর সংশোধিত নতুন ফল ঘোষণায় এ আলোচনা একটি নতুন মোড় নিয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের ফল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে বেসরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ভোটের পরদিন বিকেলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ যে পরিসংখ্যান দিয়েছিলেন, রাতে প্রকাশিত গেজেটের সঙ্গে তার গরমিল দেখা যায়। পরে আসনভিত্তিক ফল প্রকাশের পর আরও নানা অসামঞ্জস্য নিয়ে গণমাধ্যমে খবর হলে বেসরকারি ফল সংশোধন করা হয়।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসি সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে জানায়, আগে ঘোষিত হিসাবের তুলনায় মোট প্রদত্ত ভোট কমেছে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৬টি। কমেছে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’—দুই পক্ষের ভোটসংখ্যাও; বেড়েছে বাতিল ভোট। ২৫ ফেব্রুয়ারি জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদের সই করা এই গেজেট নতুন করে সামনে আনে ফলাফল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন।

প্রথম গেজেট ও সর্বশেষ সংশোধিত গেজেটের পরিসংখ্যান পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয়—মোট ভোট, বৈধ ভোট, বাতিল ভোট এবং ‘হ্যাঁ–না’ ভোটের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কীভাবে এই গরমিল তৈরি হলো, কোন ধাপে সংশোধন হলো এবং চূড়ান্ত হিসাবে আসলে কী দাঁড়াল?

দুই দফা ফলাফল সংশোধনের খতিয়ান

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দুই দফায় সংখ্যাগত পরিবর্তন দেখা যায়। প্রথম দফায় ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলের বেসরকারি ঘোষণা ও একই দিনের রাতের গেজেটের মধ্যে গরমিল ছিল। দ্বিতীয় দফায় ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সংশোধিত গেজেটে আগের গেজেটের তুলনায় মোট ভোট, বৈধ ভোট ও ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটে পরিবর্তন আনা হলো।

প্রথম দফা সংশোধন: বিকেলের ঘোষণা বনাম রাতের গেজেট

১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ইসি সচিব যে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট ছিল ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। কিন্তু একই দিন রাতে প্রকাশিত গেজেটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি এবং ‘না’ ভোট কমে হয় ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট বেড়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৩১ (০.২৬%) এবং ‘না’ ভোট কমেছে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯০১ (২.১৯%)। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিকেলের ঘোষণায় মোট ভোট, বৈধ ভোট ও বাতিল ভোটের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

ছবি: চরচা
ছবি: চরচা

এই প্রথম দফায় একই দিনের মধ্যে ঘোষিত দুই তথ্যের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, যা পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের মাধ্যমে আরও বদলে গেছে।

দ্বিতীয় দফা সংশোধন: ১৩ ফেব্রুয়ারির গেজেট বনাম ২৫ ফেব্রুয়ারির সংশোধিত গেজেট

১৩ ফেব্রুয়ারি রাতের গেজেটে মোট প্রদত্ত ভোট ছিল ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি। ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সংশোধিত গেজেটে তা কমে দাঁড়ায় ৭ কোটি ৬৬ লাখ ২১ হাজার ৪০৭টি। অর্থাৎ মোট ভোট কমেছে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৬টি (১.৩৮%)। বাতিল ভোট ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৯৬, বৃদ্ধি ১২ হাজার ৫৫৯ (০.১৭%)। মোট বৈধ ভোট ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬ থেকে কমে হয়েছে ৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৬ হাজার ২১১। এক্ষেত্রে কমেছে ১০ লাখ ৮৬ হাজার ১৭৫ (১.৫৫%)।

একইভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ থেকে কমে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০ হয়েছে। এক্ষেত্রে কমেছে ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৬৮০ (২.০২%)। ‘না’ ভোট ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ থেকে কমে ২ কোটি ১৯ হাজার ৬০ হাজার ২৩১ হয়েছে—কমেছে ১ লাখ ১১ হাজার ৪৯৫ (০.৫১%)।

ছবি: চরচা
ছবি: চরচা

দুই দফা সংশোধনের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, প্রথম দফায় ‘হ্যাঁ’ ভোট সামান্য বৃদ্ধি ও ‘না’ ভোট উল্লেখযোগ্য হ্রাস পায়। দ্বিতীয় দফায় মোট প্রদত্ত ভোট ১০ লাখের বেশি কমে যায়; একই সঙ্গে বৈধ ভোট ও উভয় পক্ষের ভোটসংখ্যা কমে এবং বাতিল ভোট বৃদ্ধি পায়। এখানে সব হিসাব সরাসরি প্রদত্ত সংখ্যার ভিত্তিতে শতকরা হারে গণনা করা হয়েছে; কোনো তথ্য সংযোজন বা পরিবর্তন করা হয়নি।

ইসি ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা যা বলছেন

গণভোটের সামগ্রিক ফলাফলের হার ছাড়াও গুরুতর অসঙ্গতি ছিল আসনভিত্তিক ফলাফলের হারেও। নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪, নেত্রকোনা-৫, সিরাজগঞ্জ-১ ও রাজশাহী-৪—এই আসনগুলোতে গণভোটের হার মোট ভোটারের চেয়েও বেশি দেখানো হয়েছিল। ফলাফলের গরমিলের কারণ হিসেবে ইসি ‘করণিক ভুল’–এর কথা বলেছে বার বার।

ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, “আগের প্রকাশিত ফলাফলে করণিক ভুল ছিল, কিছু সংখ্যা এদিক, ওদিক হয়েছে। পরবর্তীতে তা সংশোধন করে যেটা হয়েছে, তা আজ (বৃহস্পতিবার) প্রকাশ করা হয়েছে। এখনও ‘হ্যাঁ’ এর সংখ্যা বেশি, তাতে কোনো বিচ্যুতি হয়নি।”

ফলাফল গরমিলের বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের এক আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে চরচা’কে বলেন, ‘‘তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে গণভোটের ফলাফল সংকলনে বেশির ভাগ এআরও (সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা) ভুল করেছেন। কোন কোন ইউএনও সংসদ ভোটের ফলাফল আগে পাঠিয়ে (সাধারণত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন), পরদিন সকালেও গণভোটের ফলাফল পাঠাতে পারেননি। যেটা হয়েছে সংসদ ভোটের ফলাফল গণনা করার পর গণভোটের ফলাফল গণনায় এক রকমের অলসতা দেখা গেছে।’’

তবে নির্বাচন পরিচালনা অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন চরচা’কে বলেন, ‘‘ফলাফল সময়মতোই এসেছে। সেগুলো শিটে তুলতে গিয়ে কিছু ভুল, ক্ল্যারিক্যাল ভুল হয়েছে। আমরা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সেটা ঠিক করেছি।’’

সম্পর্কিত