চরচা প্রতিবেদক

সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর এমনটা আর কখনো হয়নি।
১৯৯১ সালের জুলাইয়ে দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যায় বাংলাদেশ। এরপর থেকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সব সময়ই সভাপতিত্ব করেছেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার। কিন্তু এবারই এই রেওয়াজের ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন না বিদায়ী সংসদের স্পিকার। স্পিকার পদত্যাগ করেছেন, ডেপুটি স্পিকার কারাগারে। তাহলে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগে সংসদ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন কে?
সর্বশেষ তিনটি সংসদে স্পিকার ছিলেন একই ব্যক্তি–শিরীন শারমিন চৌধুরী। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার হিসেবে আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল তারই। কিন্তু ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি পলাতক। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলেও জানা গেছে। এদিকে দ্বাদশ সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে এই প্রথম স্পিকার নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে।
কার্যপ্রণালি বিধির ১২ (২) তে বলা আছে, “যদি কোনো সময় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার কিংবা সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে কেউই উপস্থিত না থাকেন, তাহা হইলে সচিব তাহা সংসদকে জানাইবেন এবং সংসদ একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে সভাপতিত্ব করিবার জন্য নির্বাচিত করিবেন।”

সে হিসেবে এবারের ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়ার কথা। তিনি নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের আগ পর্যন্ত হাউজ পরিচালনা করবেন।
অতীতে রেওয়াজ ও বিধির বাইরে গিয়ে সংসদ অধিবেশনের শুরু হয়েছিল মোট কতবার? ইতিহাস বলছে দেশের ইতিহাসের প্রথম জাতীয় সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কেউই দ্বিতীয় সংসদের শুরুতে সভাপতিত্ব করতে পারেননি। একইভাবে দ্বিতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কেউই তৃতীয় সংসদের শুরুতে সভাপতিত্ব করেননি।
চতুর্থ সংসদের শুরুতেই প্রথমবারের মতো তৃতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেছিলেন। স্পিকার সভাপতিত্ব করেননি। কারণ, তৃতীয় সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীকেই চতুর্থ সংসদের স্পিকার নির্বাচন করা হয়েছিল। বিধি অনুযায়ী স্পিকার নির্বাচনে বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অংশ নিলে তারা নির্বাচনের সময় হাউজের সভাপতিত্ব করতে পারবেন না।
পঞ্চম সংসদের শুরুতে চতুর্থ সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী সভাপতিত্ব করেছিলেন। পঞ্চম সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনও হয়েছিল তারই তত্ত্বাবধানে। তবে বিশেষ কারণে পঞ্চম সংসদে নির্বাচিত কয়েকটি দলের সংসদ সদস্যরা স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী বা সে সময়ের ডেপুটি স্পিকার রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়ার কাছে শপথ পড়েননি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের সংবিধান রচনার একটি গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ গণপরিষদের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। তার তত্ত্বাবধানেই গণপরিষদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন যথাক্রমে শাহ আবদুল হামিদ ও মোহাম্মদউল্লাহ। শাহ আবদুল হামিদ কিছুদিন পর প্রয়াত হলে মোহাম্মদউল্লাহ হন স্পিকার, ডেপুটি হন মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ।

মোহাম্মদউল্লাহই ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দেশের প্রথম জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। ১৯৭৪ সালে মোহাম্মদউল্লাহকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করা হলে স্পিকারের দায়িত্ব নেন আবদুল মালেক উকিল। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে থেকে যান মোহাম্মদ বায়তুল্লাহই।
দেশের প্রথম সংসদের মেয়াদ ছিল ১৯৭৮ পর্যন্ত। কিন্তু তার আগেই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম হলে সংসদের মেয়াদ ১৯৮০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু পঁচাত্তরের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে গেলেও সংসদ বহালই ছিল। ১৯৭৭ সালে দেশের সে সময়ের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রথম সংসদ ভেঙে দিয়ে আদেশ জারি করেন।
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে কিন্তু প্রথম সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিল সভাপতিত্ব করেননি। ১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই সেই সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করে ফেলে সে সময়ের সরকারি দল বিএনপি। স্পিকার হন মির্জা গোলাম হাফিজ ও ডেপুটি স্পিকার হন ব্যারিস্টার সুলতানউদ্দিন আহমেদ। তবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার। তার অধীনেই মির্জা গোলাম হাফিজ ও সুলতানউদ্দিন আহমেদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ১৯৭৯’র সংসদের মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল ১৯৮৪ পর্যন্ত। ১৯৮২ সালে দেশে সামরিক আইন জারি হলে সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায় তখনই। ১৯৮৬ সালে সামরিক আইনের অধীনেই দেশে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয় সংসদের শুরুর অধিবেশনেও দ্বিতীয় সংসদের বিদায়ী স্পিকার সভাপতিত্ব করেননি। এক সামরিক ফরমান দিয়ে মনোনীত স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীকে সে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। সে সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন এম কোরবান আলী। তৃতীয় সংসদ দেড় বছরের বেশি টেকেনি। ১৯৮৭ সালের শেষে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল সেই সংসদ।

চতুর্থ সংসদেও স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। সেবার তার ডেপুটি ছিলেন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া। চতুর্থ সংসদ ১৯৯০ সালে এক গণঅভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি এরশাদ ও জাতীয় পার্টি সরকারের পতনের পর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে পঞ্চম সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। সংসদে নির্বাচিত দলগুলো চতুর্থ সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কাছে শপথ পড়তে চাননি। চতুর্থ সংসদ নির্বাচন ছিল বিরোধী দলবিহীন ও ভোটারবিহীন। সে কারণে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রায় সব শীর্ষ রাজনৈতিক দলই চতুর্থ সংসদকে ‘বৈধ’ সংসদের স্বীকৃতি দেয়নি। তাই পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সব নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা চতুর্থ সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীর কাছে শপথ পড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সেবার সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো দলগুলো যখন শামসুল হুদা চৌধুরীর কাছে শপথ পড়তে অস্বীকৃতি জানায়। তখন বিকল্প বিধি অনুযায়ী সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর জন্য। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছেই শপথ পড়েন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। তবে ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল পঞ্চম সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন বিদায়ী স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীই। তার তত্ত্বাবধানেই স্পিকার নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস ও ডেপুটি স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। কয়েক মাস পর আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি করা হলে শেখ রাজ্জাক আলী হয়ে যান স্পিকার। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন হুমায়ূন খান পন্নী।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার আবদুল হামিদ। ২০০১ সালের জুলাই মাসে সপ্তম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েকদিন আগে মৃত্যু হয় হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর। অষ্টম সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছিলেন ডেপুটি স্পিকার আবদুল হামিদ। তিনিই অষ্টম সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। তার তত্ত্বাবধানেই স্পিকার নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী।

সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর এমনটা আর কখনো হয়নি।
১৯৯১ সালের জুলাইয়ে দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যায় বাংলাদেশ। এরপর থেকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সব সময়ই সভাপতিত্ব করেছেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার। কিন্তু এবারই এই রেওয়াজের ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন না বিদায়ী সংসদের স্পিকার। স্পিকার পদত্যাগ করেছেন, ডেপুটি স্পিকার কারাগারে। তাহলে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগে সংসদ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন কে?
সর্বশেষ তিনটি সংসদে স্পিকার ছিলেন একই ব্যক্তি–শিরীন শারমিন চৌধুরী। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার হিসেবে আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল তারই। কিন্তু ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি পলাতক। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলেও জানা গেছে। এদিকে দ্বাদশ সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে এই প্রথম স্পিকার নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে।
কার্যপ্রণালি বিধির ১২ (২) তে বলা আছে, “যদি কোনো সময় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার কিংবা সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে কেউই উপস্থিত না থাকেন, তাহা হইলে সচিব তাহা সংসদকে জানাইবেন এবং সংসদ একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে সভাপতিত্ব করিবার জন্য নির্বাচিত করিবেন।”

সে হিসেবে এবারের ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে প্রস্তাবের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়ার কথা। তিনি নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের আগ পর্যন্ত হাউজ পরিচালনা করবেন।
অতীতে রেওয়াজ ও বিধির বাইরে গিয়ে সংসদ অধিবেশনের শুরু হয়েছিল মোট কতবার? ইতিহাস বলছে দেশের ইতিহাসের প্রথম জাতীয় সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কেউই দ্বিতীয় সংসদের শুরুতে সভাপতিত্ব করতে পারেননি। একইভাবে দ্বিতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কেউই তৃতীয় সংসদের শুরুতে সভাপতিত্ব করেননি।
চতুর্থ সংসদের শুরুতেই প্রথমবারের মতো তৃতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেছিলেন। স্পিকার সভাপতিত্ব করেননি। কারণ, তৃতীয় সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীকেই চতুর্থ সংসদের স্পিকার নির্বাচন করা হয়েছিল। বিধি অনুযায়ী স্পিকার নির্বাচনে বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অংশ নিলে তারা নির্বাচনের সময় হাউজের সভাপতিত্ব করতে পারবেন না।
পঞ্চম সংসদের শুরুতে চতুর্থ সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী সভাপতিত্ব করেছিলেন। পঞ্চম সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনও হয়েছিল তারই তত্ত্বাবধানে। তবে বিশেষ কারণে পঞ্চম সংসদে নির্বাচিত কয়েকটি দলের সংসদ সদস্যরা স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী বা সে সময়ের ডেপুটি স্পিকার রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়ার কাছে শপথ পড়েননি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের সংবিধান রচনার একটি গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ গণপরিষদের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। তার তত্ত্বাবধানেই গণপরিষদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন যথাক্রমে শাহ আবদুল হামিদ ও মোহাম্মদউল্লাহ। শাহ আবদুল হামিদ কিছুদিন পর প্রয়াত হলে মোহাম্মদউল্লাহ হন স্পিকার, ডেপুটি হন মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ।

মোহাম্মদউল্লাহই ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দেশের প্রথম জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। ১৯৭৪ সালে মোহাম্মদউল্লাহকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করা হলে স্পিকারের দায়িত্ব নেন আবদুল মালেক উকিল। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে থেকে যান মোহাম্মদ বায়তুল্লাহই।
দেশের প্রথম সংসদের মেয়াদ ছিল ১৯৭৮ পর্যন্ত। কিন্তু তার আগেই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম হলে সংসদের মেয়াদ ১৯৮০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু পঁচাত্তরের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে গেলেও সংসদ বহালই ছিল। ১৯৭৭ সালে দেশের সে সময়ের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রথম সংসদ ভেঙে দিয়ে আদেশ জারি করেন।
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে কিন্তু প্রথম সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিল সভাপতিত্ব করেননি। ১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই সেই সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করে ফেলে সে সময়ের সরকারি দল বিএনপি। স্পিকার হন মির্জা গোলাম হাফিজ ও ডেপুটি স্পিকার হন ব্যারিস্টার সুলতানউদ্দিন আহমেদ। তবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার। তার অধীনেই মির্জা গোলাম হাফিজ ও সুলতানউদ্দিন আহমেদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ১৯৭৯’র সংসদের মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল ১৯৮৪ পর্যন্ত। ১৯৮২ সালে দেশে সামরিক আইন জারি হলে সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায় তখনই। ১৯৮৬ সালে সামরিক আইনের অধীনেই দেশে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয় সংসদের শুরুর অধিবেশনেও দ্বিতীয় সংসদের বিদায়ী স্পিকার সভাপতিত্ব করেননি। এক সামরিক ফরমান দিয়ে মনোনীত স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীকে সে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। সে সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন এম কোরবান আলী। তৃতীয় সংসদ দেড় বছরের বেশি টেকেনি। ১৯৮৭ সালের শেষে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল সেই সংসদ।

চতুর্থ সংসদেও স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। সেবার তার ডেপুটি ছিলেন রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া। চতুর্থ সংসদ ১৯৯০ সালে এক গণঅভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি এরশাদ ও জাতীয় পার্টি সরকারের পতনের পর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে পঞ্চম সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। সংসদে নির্বাচিত দলগুলো চতুর্থ সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কাছে শপথ পড়তে চাননি। চতুর্থ সংসদ নির্বাচন ছিল বিরোধী দলবিহীন ও ভোটারবিহীন। সে কারণে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রায় সব শীর্ষ রাজনৈতিক দলই চতুর্থ সংসদকে ‘বৈধ’ সংসদের স্বীকৃতি দেয়নি। তাই পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সব নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা চতুর্থ সংসদের স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীর কাছে শপথ পড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সেবার সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো দলগুলো যখন শামসুল হুদা চৌধুরীর কাছে শপথ পড়তে অস্বীকৃতি জানায়। তখন বিকল্প বিধি অনুযায়ী সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর জন্য। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছেই শপথ পড়েন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। তবে ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল পঞ্চম সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন বিদায়ী স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীই। তার তত্ত্বাবধানেই স্পিকার নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস ও ডেপুটি স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। কয়েক মাস পর আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি করা হলে শেখ রাজ্জাক আলী হয়ে যান স্পিকার। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন হুমায়ূন খান পন্নী।
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার আবদুল হামিদ। ২০০১ সালের জুলাই মাসে সপ্তম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েকদিন আগে মৃত্যু হয় হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর। অষ্টম সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছিলেন ডেপুটি স্পিকার আবদুল হামিদ। তিনিই অষ্টম সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। তার তত্ত্বাবধানেই স্পিকার নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী।