যেভাবে ভারতের অর্থনীতির ‘বড় ক্ষতি’ করছে বায়ুদূষণ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যেভাবে ভারতের অর্থনীতির ‘বড় ক্ষতি’ করছে বায়ুদূষণ
ফাইল ছবি

প্রতি বছর এই মৌসুমে দিল্লিতে অল্প সময়ের জন্য এক মনোমুগ্ধকর আবহ তৈরি হয়। বসন্তের আগমনে বাগানগুলো ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, আর এক-দুই সপ্তাহের জন্য আকাশও নীল হয়ে ওঠে। প্রায় তিন কোটি মানুষের এই শহরে তখন অনেকেই মনে করেন, বিষাক্ত দূষণ যেন কিছুটা কমেছে, বাতাস আবার শ্বাস নেওয়ার মতো হয়েছে।

বাস্তবে তা নয়। দিল্লির বায়ুদূষণ সারা বছরের সমস্যা। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শহরটিতে একদিনও বাতাসের মান ‘ভালো’ হিসেবে রেকর্ড হয়নি। আর সরকার যে মানদণ্ডে ‘সন্তোষজনক’ বলে চিহ্নিত করে, সেই পর্যায়ে ছিল মাত্র ৬৫ দিন।

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, সমস্যাটি ভৌগোলিকভাবেও বিস্তৃত হচ্ছে। উত্তর ভারতের বাইরে থাকা অনেকেই মনে করেন, অন্তত দিল্লির মতো খারাপ অবস্থা তাদের নয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পূর্ব ভারতের কলকাতা শহরের বিখ্যাত হাওড়া ব্রিজ প্রায়ই কুয়াশা ও ধোঁয়াশায় আড়াল হয়ে যায়। পশ্চিমের মুম্বাইয়ের পরিস্থিতিও একই। এমনকি তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার বাতাসের জন্য পরিচিত দক্ষিণ ভারতেও ক্ষুদ্র কণাদূষণ সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত করছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

ইকোনমিস্ট বলছে, ভারতে বায়ুদূষণ সংকট বিস্তারের পেছনে নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মোটরযানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি। দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট যানজট ও থেমে-থেমে চলাচল নির্গমন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশজুড়ে একের পর এক সড়কসহ নানা নির্মাণকাজে বিপুল পরিমাণ ধুলা সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইটভাটাগুলো থেকেও অতিরিক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে দূষণ বাড়ছে।

ভারতে বায়ুদূষণের আর্থিক ও মানবিক মূল্য দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসাবিষয়ক ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ল্যানসেটের তথ্য অনুযায়ী, দূষিত বায়ুর কারণে প্রতিবছর দেশটিতে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

গত মাসে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ও হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতা গোপিনাথ বলেন, দূষণের অর্থনৈতিক প্রভাব মার্কিন শুল্কের তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর। ২০১৯ সালে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডালবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণের কারণে ভারতের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ।

বিপরীতে, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক (যা পরে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়) ভারতের জিডিপি ০ দশমিক ৬ শতাংশ কমিয়েছে। তবে শুল্ক আরোপের পরপরই নীতিগত প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও দূষণের ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ভারত সরকার বায়ুদূষণ সমস্যাকে খাটো করে দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী পার্লামেন্টে বলেন, দূষণের সঙ্গে মৃত্যু ও রোগের সরাসরি সম্পর্কের কোনো তথ্য নেই। তিনি দাবি করেন, বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যপ্রভাব নানা উপাদানের সম্মিলিত ফল। ১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত সর্বশেষ বাজেটে দূষণ নিয়ন্ত্রণ খাতে বরাদ্দও কমানো হয়েছে।

ইকোনমিস্টের মতে, ধূমপানের সঙ্গে এর একটি তুলনা টানা যায়। ধূমপায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানেন, এটিও জানেন যে এটি ব্যয়বহুল অভ্যাস। কিন্তু এসব উদ্বেগ অনেক সময় বিমূর্ত থেকে যায়। একইভাবে, চোখে না দেখা অর্থনৈতিক ক্ষতি সহজেই উপেক্ষিত হয়। দূষণ সমস্যার সমাধান জটিল, এর সুফল দীর্ঘমেয়াদি এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভও স্পষ্ট নয়, ফলে অগ্রাধিকার কম।

তবে বিমূর্ত অর্থনৈতিক উদ্বেগ এখন দৃশ্যমান ব্যবসায়িক প্রভাব হিসেবে সামনে আসছে। সাম্প্রতিক এক নথিতে খুচরা বিপণি প্রতিষ্ঠান শপার্স স্টপ গত বছরের শেষ দিকে ভোক্তাদের চলাচল ও ঐচ্ছিক ব্যয় কমে যাওয়ার জন্য দূষণকে দায়ী করেছে। একই সময়ে সুপারমার্কেট চেইন বিশাল মেগা মার্টের প্রধান নির্বাহী বলেন, উত্তর ভারতের বায়ুমান সমস্যা ভোগব্যয়ের প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে।

এদিকে, দূষণের ঝুঁকি উল্লেখ করে অনেক দেশই এখন ভারতে ভ্রমণ বিষয়ে নাগরিকদের সতর্কতা জারি করছে, যার প্রভাব পড়ছে পর্যটনখাতে। প্রতিবছর শীতকালে উত্তর ভারতে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় শত শত ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে।

বায়ুদূষণের প্রভাব করপোরেট খাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দক্ষ জনবল আকর্ষণ ও ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। গত ডিসেম্বর একটি ওষুধ কোম্পানির ভারতীয় এক শীর্ষ নির্বাহী দিল্লির দূষণের কারণে পদত্যাগ করেন। একই কারণে অনেক বিদেশি নির্বাহীও ভারতে চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছেন। গত বছর সফররত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারী ব্রায়ান জনসন খারাপ বায়ুমানের অভিযোগ তুলে একটি পডকাস্টের রেকর্ডিং মাঝপথে ছেড়ে যান।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পরিসরেও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। গত ডিসেম্বর ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে একটি ক্রিকেট ম্যাচ ধোঁয়াশার কারণে বাতিল করতে হয়, বল দেখা যাচ্ছিল না। জানুয়ারিতে বিশ্বের শীর্ষ ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের একজন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া ওপেন থেকে সরে দাঁড়ান, কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন খারাপ বায়ুমান। এজন্য তাকে ৫ হাজার ডলার জরিমানাও গুনতে হয়। যারা খেলেছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছেন।

ধূমপায়ীরা সাধারণত কবে অভ্যাস ছাড়েন? অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সামনে এলে। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যখন হঠাৎ তীব্র ও ভয়াবহ রূপ নেয়, তখনই সিদ্ধান্ত বদলায়। ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এরকম পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। দূষণ সরাসরি ভোগব্যয় ও প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এই বায়ুদূষণ। এরপরও যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আর কিছুতেই ভারত সরকারের বোধদয় হবে বলে মনে করেন না বিশ্লেষকরা।

সম্পর্কিত