ফজলে রাব্বি

তীব্র বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার জন্য ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের প্রতি আগ্রহী হয়। আলোচনার পর সে ঋণ পায়ও। এই ঋণগ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আইএমএফের নানা কিস্তির অর্থছাড় পর্যন্ত নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে। সংস্থাটির নাম আইএমএফ বলেই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা শঙ্কা, প্রতিবাদও। কিন্তু কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আইএমএফের ঋণ পেতে বাংলাদেশের আগ্রহী হওয়ার প্রেক্ষাপটটির দিকে তাকাতে হবে। মূলত কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। দ্রুত বাড়তে থাকে আমদানি ব্যয়। একই সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে এবং ডলার সংকট দেখা দেয়। এই সময়ে আমদানি ব্যয় মেটাতে চাপ বাড়ে, এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়ে এবং জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হয়। সার্বিকভাবে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
এই পরিস্থিতিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এবং বৈদেশিক খাতে আস্থা ফেরাতে আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ নেয়। সে সময় তো বটেই ওই ঋণের কিস্তি-ছাড় এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। মোট ৭ কিস্তিতে এ টাকা পাওয়ার কথা। এ জন্য দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু শর্ত। এর মধ্যে মুখ্য শর্তের মধ্যে রয়েছে–ব্যাংক খাত সংস্কার, মুদ্রা বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, রাজস্ব সংস্কার এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসে। গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। এখন পর্যন্ত ওই ঋণ কর্মসূচি থেকে পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। ওই কিস্তিসহ চলতি বছরের জুনের মধ্যে আইএমএফ থেকে ১৩০ কোটি ডলারের অর্থছাড় আশা করছে।
কিন্তু ওই ষষ্ঠ কিস্তির ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইএমএফ বলছে, কিছু শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সব শর্ত একতরফাভাবে মানা সম্ভব নয় এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। এই অবস্থানগত পার্থক্যই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ধরনের নীতিগত টানাপোড়েনে ফেলেছে।
আইএমএফ কী বলছে
আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন সম্প্রতি স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলমান, তবে কিস্তি ছাড়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তার মতে, কর্মসূচির তিনটি প্রধান ভিত্তি–রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং বিনিময় হার সংস্কার–এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে শ্রিনিবাসন আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও দুর্বল হয়েছে। এই দুর্বল রাজস্ব কাঠামোই আইএমএফ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নীতিতে ধীর অগ্রগতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের অবস্থান হলো–সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া কিস্তি ছাড়ের গতি বাড়ানো সম্ভব নয়।
আইএমএফের শর্তগুলো কী
আইএমএফের ঋণ শুনলেই প্রথমে মাথায় আসে শর্ত। সর্বশেষ আইএমএফ ঋণের ক্ষেত্রেও সংস্থাটি একগুচ্ছ শর্ত আরোপ করেছে। ঋণছাড়ের ক্ষেত্রে এসব শর্ত পরিপালন করাটা চুক্তিতে বাধ্যতামূলক করা হয়। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে–
আইএমএফ কেন এত শর্ত দেয়?
আইএমএফের ঋণ মূলত দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ছাড় করা হয়। তাই তারা শুধু অর্থ দেয় না, বরং সঙ্গে কিছু নীতিগত শর্ত জুড়ে দেয়। এই শর্তগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো–যে যে ‘সংকটের’ কারণে দেশটি আইএমএফের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছে, সেগুলোর মূল কারণগুলো সমাধান করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনো দেশে ডলার সংকট, রিজার্ভ হ্রাস, বা বাজেট ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে শুধু ঋণ দিয়ে সাময়িকভাবে চাপ কমানো সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে একই সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে। এজন্য আইএমএফ সাধারণত রাজস্ব আয় বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি কমানো, বিনিময় হারকে আরো বাজারভিত্তিক করা, এবং জ্বালানি বা বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি সংস্কারের মতো পদক্ষেপের শর্ত দেয়।
আইএমএফের যুক্তি হলো–এই স্বল্পমেয়াদি কষ্টের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল, বাজারভিত্তিক এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে ওঠে। তাই আইএমএফ শর্তগুলো মূলত তাৎক্ষণিক স্বস্তির বদলে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। কিন্তু তাদের এই শর্তের সাথে প্রায়ই বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সরকারের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সংস্থাটি কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনাও আছে।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে আইএফএফ। বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সদস্য দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে সহায়তা করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোই এই সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য।
আশির দশকে নানা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু উন্নয়নশীল দেশকে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল। সেসব ঋণের বিপরীতে ছিল কঠোর সব শর্ত। সেসব লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে নানা দেশের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি বিঘ্নিত হয়েছে, দারিদ্র্য ও অসমতা বেড়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাত সংকুচিত হয়েছে। এক কথায়, মানুষের জীবনকে অস্থিতিশীল করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সে সময়েও তাদের দেওয়া শর্ত পূরণ না করতে পারায় বহু দেশের প্রতিশ্রুত ঋণের কিস্তি আটকে রাখা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশও ১৯৮০-৯০ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ পাঁচবার আইএমএফের দ্বারস্থ হয়। এর পর ২০০৩ সালে। এবং তারপর ২০১২ সালে ঋণ নেয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে। প্রতিবারই আরোপ করা হয়েছে একগুচ্ছ শর্ত। ১৯৯১ সালে অর্থনীতির উদারীকরণের নেপথ্যেও ছিল ১৯৯০ সালে নেওয়া আইএমএফ ঋণ। ভ্যাট বা মূসকের প্রবর্তন থেকে আজকের দিনে মূসক আইনের সংশোধন–এ সবই আইএমএফ ঋণের সূত্র ধরেই হয়েছে। আর এসব শর্তারোপ ও তা পূরণ নিয়ে চলা টানাপোড়েনের সঙ্গে বরাবরই সঙ্গী হয়েছে অর্থছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গটি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
আইএমএফের ঋণ পেতেই হবে?
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি আইএমএফের সাথে বৈঠকের পর দেশে ফিরে জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে করা চুক্তির সব শর্ত বর্তমান সরকার বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করবে–এমন কোনো বিষয় নেই।
আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং এখানে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয় বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি জানান, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে আলোচনা এখনো চলমান এবং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
সরকারের এই অবস্থান মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দেয়–একদিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
আইএমএফের টাকা: অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম আইএমএফ কর্মসূচিকে দেখছেন সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী একটি কাঠামো হিসেবে। চরচাকে তিনি বলেন, “আইএমএফের ঋণ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা, এই খাতকে বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তরিত করা এবং দেশকে একটি আমদানিকারক দেশে পরিণত করা।”
শামসুল আলম আরো বলেন, “সরকার আইএমএফের শর্তকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জনস্বার্থবিরোধীভাবে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।”
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্যের দামে পড়ছে, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির আইএমএফ কর্মসূচিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তার মতে, “আইএমএফ যখন কোনো দেশকে গ্রিন সিগনাল দেয়, তখন এডিবি, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতারা অর্থায়নে উৎসাহিত হয়।”
মাহফুজ কবির বলেন, “এই ঋণ মূলত বাজেট সাপোর্ট এবং জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এর শর্তগুলো, বিশেষ করে ভর্তুকি প্রত্যাহার ও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।”
অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, আইএমএফ কর্মসূচি একটি বৈশ্বিক আর্থিক সংযোগ ব্যবস্থার অংশ, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তবে একই সাথে মার্কিন ডলারের আধিপত্য ধরে রাখতেও আইএমএফের শর্তগুলো পরোক্ষভাবে কাজ করে।
অর্থনীতির কাঠামোগত বাস্তবতা: তিনটি প্রধান চাপ
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি বড় চাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, যা মূলত জ্বালানি মূল্য, আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, যা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিময় হার নীতিকে প্রভাবিত করছে।
তৃতীয়ত, রাজস্ব ঘাটতি, যেখানে কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় সরকারকে ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই তিনটি চাপ একসঙ্গে কাজ করায় আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন আর্থিক সহায়তার উৎস, অন্যদিকে তেমনি কঠিন নীতি-সংস্কারের কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
সংস্কার বনাম সামাজিক বাস্তবতা
আইএমএফ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতিকে বাজারভিত্তিক ও টেকসই কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে এই সংস্কারের ফলে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় বাড়া এবং সামাজিক চাপ তৈরির ঝুঁকি থাকে।
আর এখানেই মূল দ্বন্দ্ব–একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আইএমএফ কর্মসূচি এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর বাস্তবায়ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক–সব দিক থেকেই জটিল।
ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে বাংলাদেশ?
কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তাই শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একদিকে সংস্কারের চাপ, অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতা–এই দুইয়ের ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী পথ চলা।

তীব্র বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার জন্য ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের প্রতি আগ্রহী হয়। আলোচনার পর সে ঋণ পায়ও। এই ঋণগ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আইএমএফের নানা কিস্তির অর্থছাড় পর্যন্ত নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে। সংস্থাটির নাম আইএমএফ বলেই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা শঙ্কা, প্রতিবাদও। কিন্তু কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আইএমএফের ঋণ পেতে বাংলাদেশের আগ্রহী হওয়ার প্রেক্ষাপটটির দিকে তাকাতে হবে। মূলত কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। দ্রুত বাড়তে থাকে আমদানি ব্যয়। একই সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে এবং ডলার সংকট দেখা দেয়। এই সময়ে আমদানি ব্যয় মেটাতে চাপ বাড়ে, এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়ে এবং জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হয়। সার্বিকভাবে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
এই পরিস্থিতিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এবং বৈদেশিক খাতে আস্থা ফেরাতে আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ নেয়। সে সময় তো বটেই ওই ঋণের কিস্তি-ছাড় এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। মোট ৭ কিস্তিতে এ টাকা পাওয়ার কথা। এ জন্য দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু শর্ত। এর মধ্যে মুখ্য শর্তের মধ্যে রয়েছে–ব্যাংক খাত সংস্কার, মুদ্রা বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, রাজস্ব সংস্কার এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসে। গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। এখন পর্যন্ত ওই ঋণ কর্মসূচি থেকে পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। ওই কিস্তিসহ চলতি বছরের জুনের মধ্যে আইএমএফ থেকে ১৩০ কোটি ডলারের অর্থছাড় আশা করছে।
কিন্তু ওই ষষ্ঠ কিস্তির ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইএমএফ বলছে, কিছু শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সব শর্ত একতরফাভাবে মানা সম্ভব নয় এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। এই অবস্থানগত পার্থক্যই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ধরনের নীতিগত টানাপোড়েনে ফেলেছে।
আইএমএফ কী বলছে
আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন সম্প্রতি স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলমান, তবে কিস্তি ছাড়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তার মতে, কর্মসূচির তিনটি প্রধান ভিত্তি–রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং বিনিময় হার সংস্কার–এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে শ্রিনিবাসন আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও দুর্বল হয়েছে। এই দুর্বল রাজস্ব কাঠামোই আইএমএফ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নীতিতে ধীর অগ্রগতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের অবস্থান হলো–সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া কিস্তি ছাড়ের গতি বাড়ানো সম্ভব নয়।
আইএমএফের শর্তগুলো কী
আইএমএফের ঋণ শুনলেই প্রথমে মাথায় আসে শর্ত। সর্বশেষ আইএমএফ ঋণের ক্ষেত্রেও সংস্থাটি একগুচ্ছ শর্ত আরোপ করেছে। ঋণছাড়ের ক্ষেত্রে এসব শর্ত পরিপালন করাটা চুক্তিতে বাধ্যতামূলক করা হয়। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে–
আইএমএফ কেন এত শর্ত দেয়?
আইএমএফের ঋণ মূলত দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ছাড় করা হয়। তাই তারা শুধু অর্থ দেয় না, বরং সঙ্গে কিছু নীতিগত শর্ত জুড়ে দেয়। এই শর্তগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো–যে যে ‘সংকটের’ কারণে দেশটি আইএমএফের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছে, সেগুলোর মূল কারণগুলো সমাধান করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনো দেশে ডলার সংকট, রিজার্ভ হ্রাস, বা বাজেট ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে শুধু ঋণ দিয়ে সাময়িকভাবে চাপ কমানো সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে একই সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে। এজন্য আইএমএফ সাধারণত রাজস্ব আয় বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি কমানো, বিনিময় হারকে আরো বাজারভিত্তিক করা, এবং জ্বালানি বা বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি সংস্কারের মতো পদক্ষেপের শর্ত দেয়।
আইএমএফের যুক্তি হলো–এই স্বল্পমেয়াদি কষ্টের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল, বাজারভিত্তিক এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে ওঠে। তাই আইএমএফ শর্তগুলো মূলত তাৎক্ষণিক স্বস্তির বদলে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। কিন্তু তাদের এই শর্তের সাথে প্রায়ই বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সরকারের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সংস্থাটি কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনাও আছে।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে আইএফএফ। বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সদস্য দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে সহায়তা করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোই এই সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য।
আশির দশকে নানা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু উন্নয়নশীল দেশকে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল। সেসব ঋণের বিপরীতে ছিল কঠোর সব শর্ত। সেসব লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে নানা দেশের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি বিঘ্নিত হয়েছে, দারিদ্র্য ও অসমতা বেড়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাত সংকুচিত হয়েছে। এক কথায়, মানুষের জীবনকে অস্থিতিশীল করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সে সময়েও তাদের দেওয়া শর্ত পূরণ না করতে পারায় বহু দেশের প্রতিশ্রুত ঋণের কিস্তি আটকে রাখা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশও ১৯৮০-৯০ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ পাঁচবার আইএমএফের দ্বারস্থ হয়। এর পর ২০০৩ সালে। এবং তারপর ২০১২ সালে ঋণ নেয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে। প্রতিবারই আরোপ করা হয়েছে একগুচ্ছ শর্ত। ১৯৯১ সালে অর্থনীতির উদারীকরণের নেপথ্যেও ছিল ১৯৯০ সালে নেওয়া আইএমএফ ঋণ। ভ্যাট বা মূসকের প্রবর্তন থেকে আজকের দিনে মূসক আইনের সংশোধন–এ সবই আইএমএফ ঋণের সূত্র ধরেই হয়েছে। আর এসব শর্তারোপ ও তা পূরণ নিয়ে চলা টানাপোড়েনের সঙ্গে বরাবরই সঙ্গী হয়েছে অর্থছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গটি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
আইএমএফের ঋণ পেতেই হবে?
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি আইএমএফের সাথে বৈঠকের পর দেশে ফিরে জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে করা চুক্তির সব শর্ত বর্তমান সরকার বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করবে–এমন কোনো বিষয় নেই।
আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং এখানে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয় বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি জানান, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে আলোচনা এখনো চলমান এবং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
সরকারের এই অবস্থান মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দেয়–একদিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
আইএমএফের টাকা: অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম আইএমএফ কর্মসূচিকে দেখছেন সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী একটি কাঠামো হিসেবে। চরচাকে তিনি বলেন, “আইএমএফের ঋণ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা, এই খাতকে বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তরিত করা এবং দেশকে একটি আমদানিকারক দেশে পরিণত করা।”
শামসুল আলম আরো বলেন, “সরকার আইএমএফের শর্তকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জনস্বার্থবিরোধীভাবে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।”
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্যের দামে পড়ছে, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির আইএমএফ কর্মসূচিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তার মতে, “আইএমএফ যখন কোনো দেশকে গ্রিন সিগনাল দেয়, তখন এডিবি, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতারা অর্থায়নে উৎসাহিত হয়।”
মাহফুজ কবির বলেন, “এই ঋণ মূলত বাজেট সাপোর্ট এবং জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এর শর্তগুলো, বিশেষ করে ভর্তুকি প্রত্যাহার ও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।”
অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, আইএমএফ কর্মসূচি একটি বৈশ্বিক আর্থিক সংযোগ ব্যবস্থার অংশ, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তবে একই সাথে মার্কিন ডলারের আধিপত্য ধরে রাখতেও আইএমএফের শর্তগুলো পরোক্ষভাবে কাজ করে।
অর্থনীতির কাঠামোগত বাস্তবতা: তিনটি প্রধান চাপ
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি বড় চাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, যা মূলত জ্বালানি মূল্য, আমদানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, যা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিময় হার নীতিকে প্রভাবিত করছে।
তৃতীয়ত, রাজস্ব ঘাটতি, যেখানে কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় সরকারকে ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই তিনটি চাপ একসঙ্গে কাজ করায় আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন আর্থিক সহায়তার উৎস, অন্যদিকে তেমনি কঠিন নীতি-সংস্কারের কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
সংস্কার বনাম সামাজিক বাস্তবতা
আইএমএফ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতিকে বাজারভিত্তিক ও টেকসই কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে এই সংস্কারের ফলে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় বাড়া এবং সামাজিক চাপ তৈরির ঝুঁকি থাকে।
আর এখানেই মূল দ্বন্দ্ব–একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আইএমএফ কর্মসূচি এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর বাস্তবায়ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক–সব দিক থেকেই জটিল।
ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে বাংলাদেশ?
কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তাই শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একদিকে সংস্কারের চাপ, অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতা–এই দুইয়ের ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী পথ চলা।

তীব্র বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার জন্য ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের প্রতি আগ্রহী হয়। আলোচনার পর সে ঋণ পায়ও। এই ঋণগ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আইএমএফের নানা কিস্তির অর্থছাড় পর্যন্ত নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে। সংস্থাটির ন

রূপপুর সফলভাবে পরিচালিত হলে তা কেবল শিল্পের চাকাই সচল করবে না, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এটি কি বাংলাদেশের জ্বালানি স্বাধীনতার পথ দেখাবে, নাকি নতুন ধরনের বৈশ্বিক নির্ভরতা তৈরি করবে, তার উত্তর হয়তো দেবে আগামী কয়েক দশক।