দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ওয়াশিংটন বৈশ্বিক মঞ্চে এক ধরনের পরোক্ষ আগ্রাসনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু প্রতিষ্ঠান ও নিয়মকানুন গড়ে তুলেছে যেগুলো শুধু মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র যেসব বহুপাক্ষিক চুক্তির অংশ, সেখানেও তারা তাদের স্বার্থের ব্যাপারে সতর্ক। কোনো সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপক্ষে গেলে, সেখানে তারা চাপ প্রয়োগ, বয়কট বা নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নেয়।
তিনটি সাম্প্রতিক উদাহরণ বিবেচনা করা যাক। সমুদ্র আইন বিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন (UNCLOS), জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)- এগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র অনুপস্থিত থাকলেও এরা টিকে আছে এবং কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৮২ সালে জাতিসংঘের তৃতীয় সমুদ্র আইন বিষয়ক সম্মেলনে সনদটি চূড়ান্ত হওয়ার পরেও ওয়াশিংটন এতে স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু তার পরেও সামুদ্রিক অঞ্চলে বিরোধ নিরসন ও স্থিতিশীলতা আনয়নে এই আইন ব্যাপকভাবে কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই সনদে সই করা থেকে বিরত থাকলেও নিজেদের স্বার্থে ঠিকই কাজে লাগায়। দক্ষিণ চীন সাগরকে নিয়ে চীনের দাবি খণ্ডন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র UNCLOS-এর বিধানগুলো ব্যবহার করে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও UNCLOS-এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করার সিদ্ধান্ত ‘ওয়ার্ল্ড মাইনাস ওয়ান’-এর সম্ভাব্য সেরা দৃশ্যপট- যেখানে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে প্রত্যাখ্যান করলেও অলিখিতভাবে সেগুলো মেনে চলতে থাকে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র কোনো বহুপাক্ষিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালেও তার কোনো সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে না। যেমন: প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে প্রত্যাহার। যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর ফলে জলবায়ু কার্যক্রমের অর্থায়ন আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তবে চুক্তিবদ্ধ অন্যান্য দেশ এখনো এর নেট-জিরো কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ দেশ চীন ২০৬০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাপানও একই লক্ষ্য নিয়েছে এবং ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র না থাকলেও প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অন্যান্য দেশগুলোর প্রতি পাঁচ বা দশ বছর অন্তর জাতীয়ভাবে নির্ধারিত কার্বন হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন ও উন্নত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর বায়ু ও সৌর প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে এখন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন খুব কঠিন হবে না।
সবশেষে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এর উদাহরণ দেওয়া যায়। ১৯৯৮ সালে রোম চুক্তির মাধ্যমে এই আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় এই চুক্তির বিরোধিতা করেছিল, কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল এটি মার্কিন নাগরিক, কূটনীতিক ও সৈন্যদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এখন দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির বিচারক ও কৌঁসুলিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু ব্রিটেনসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো আদালতটির স্বাধীনতা সমর্থন করে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরণের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। ফলস্বরূপ, মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধের একটি নিয়ন্ত্রক হিসেবে আইসিসি এখনো টিকে আছে।
তবে বিষয়টি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্রাজিল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক নেতৃত্ব জোরদার করার একটি সুযোগ করে দিয়েছে জি-২০। ২০২২ সালে ইন্দোনেশিয়ায় আয়োজিত সম্মেলনে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতকে ঘিরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত সম্মেলনে আফ্রিকান ইউনিয়ন জি-২০-এর সদস্যপদ পায়, ফলে ‘গ্লোবাল সাউথ’ দেশগুলোর ভূমিকা বিস্তৃত হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলন ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আফ্রিকা মহাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম জি-২০ সম্মেলন এটি এবং যুক্তরাষ্ট্র সম্মেলন বয়কট করা সত্ত্বেও এখানে বৈচিত্র্য ও সমতার মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়। অনেকে ধারণা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বয়কটের ফলে অনেক দেশ হয়তো এই পথে হাঁটতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি, যা ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
ট্রাম্পের অসহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডের পরেও অনেক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা টিকে আছে। ব্রিকস (BRICS), জি-২০, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট (ASEAN)-এর মতো সংস্থাগুলো ট্রাম্পের শুল্ক অবরোধ বা হুমকিকে গ্রাহ্য করছে না। বিশেষ করে ব্রিকসের প্রধান সদস্য দেশগুলো উচ্চ শুল্ক আরোপ করা সত্ত্বেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর বিচারকাজ বন্ধ করার জন্য হোয়াইট হাউস চাপ দিচ্ছিল, তা সত্ত্বেও সেই বিচারকাজ এখনো চলছে এবং তাকে তার অপরাধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে–ট্রাম্প এমন দাবি করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা হোয়াইট হাউসে গিয়ে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। চীন তার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলের আধিপত্য ব্যবহার করে বাণিজ্যযুদ্ধে ট্রাম্পকে কৌশলগতভাবে পরাস্ত করেছে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বিরদ্ধে অবস্থান না নিলেও এই অঞ্চল নিয়ে ট্রাম্পের আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলকে ক্ষুব্ধ করেছে। কারণ চীনের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভারতকে ব্যবহারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগে থেকেই ছিল।
বৈশ্বিক মঞ্চগুলোতে সংহতি প্রদর্শনের পাশাপাশি আঞ্চলিক জোটও দৃঢ় হচ্ছে। আফ্রিকান নেতৃত্বাধীন শান্তিরক্ষা অভিযান গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU), পশ্চিম আফ্রিকা অর্থনৈতিক জোট (ECOWAS)-এর মতো উপআঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান এবং অনেক ছোট ছোট জোট আফ্রিকার ১৭টি দেশে মোট ১০টি অভিযান পরিচালনা করছে। আফ্রিকান নেতৃত্বাধীন এসব শান্তিরক্ষা উদ্যোগ শাদ, সিয়েরা লিওন ও সোমালিয়ায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণে সাফল্য অর্জন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব উদ্যোগের অর্থায়ন প্রধানত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সীমিত।
(প্রখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ অনুসারে)