প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। ফাইল ছবি: প্রেস উইং
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের লাখো তরুণের জন্য জীবনে প্রথমবারের মতো একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ এটি। ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন এই নির্বাচন নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
কিনের দীর্ঘ লেখাটির প্রথম অংশে আলোচিত হয়েছে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি। বিশ্লেষণটির হুবহু অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটি বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণের জন্য জীবনে প্রথমবারের মতো একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ এটি।
১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা তিনটি কারচুপির নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন। যার দুটিতে, অর্থাৎ ২০১৪ ও ২০২৪ সালে অংশ নেয়নি প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ নিলেও সেটি ছিল ব্যাপক কারচুপির নির্বাচন। অবশ্য হাসিনার শাসনামলের ওই সময়টায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছেই হাসিনার শাসনে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিটা কোনো ব্যাপার ছিল না। তবে ২০২০ সালে কোভিড–১৯ মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে হাসিনার জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছিল। তার সরকারের অর্থনৈতিক অব্যস্থাপনার ব্যাপারটি নিয়ে কথাবার্তা ও সমালোচনা শুরু হয়। মানুষ হাসিনার ক্রমবিকশিত স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার যোগসূত্র অনুধাবন করা শুরু করে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। হাসিনার অপশাসনের সঙ্গে মানুষের ক্ষোভ থেকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন দানা বাঁধে এবং শেষ পর্যন্ত জনরোষেই পতন হয় হাসিনার।
এই নির্বাচন গত দেড় বছরের একটি নাজুক রাজনৈতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ। ২০২৪ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ পুনর্বহাল করলে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সুবিধা দেওয়ার অপকৌশল বলে অভিযোগ উঠেছিল। হাসিনা প্রথমে শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভ দমাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আন্দোলনকে রীতিমতো গণবিপ্লবে পরিণত করে। ২০২৪–এর ৫ আগস্ট সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এই পুরো আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়, যাদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগের হাতে।
হাসিনার পতনের পর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর আলোচনার ভিত্তিতে ২০২৪–এর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। ইউনূস খুব দ্রুততার সঙ্গে তার করণীয়গুলো জানিয়ে দেন। সেগুলো হচ্ছে—বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কার, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন; আন্দোলনের সময় যারা মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করা এবং একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।
ইউনূস সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) পুনর্বহাল করে। এটি একটি অভ্যন্তরীণ বিচারিক আদালত, যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও বিচারের জন্য ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই আইসিটিতে এখন হাসিনার শাসনামলে গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হচ্ছে। ইউনূস সরকার এর পাশাপাশি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের জন্য ছয়টি সংস্কার কমিশনও গঠন করে। এসবের মধ্যে অন্যতম সংবিধান, নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বিচারব্যবস্থা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেন, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতসহ প্রধান দলগুলো সই করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সমালোচনার ঊর্ধে উঠতে পারেনি। যে সমালোচনাটি ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি, সেটা হচ্ছে, তারা আওয়ামী লীগের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ। সরকার অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ; একই সঙ্গে এই অন্তর্বর্তী সরকার ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ। তবে এই সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে (আওয়ামী লীগ ছাড়া) এক ধরনের রাজনৈতিক মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে জুলাই সনদে সই করাতে পেরেছে। এই সরকারের যে কাজটি এখন বাকি আছে, সেটি হচ্ছে, একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরে যাওয়া।
তারেক রহমান ও মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: ফেসবুক
প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কারা আছে এই নির্বাচনে?
এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি। এই নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ নেই। ২০২৫ সালের মে মাসে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর যে সহিংসতা হয়েছে, সেটির জন্য আওয়ামী লীগের ও এর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়েছে। সেসব মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনও আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে দিয়েছে।
গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলার প্রথম রায়টি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই রায়ে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হলো, দলটির লাখ লাখ সমর্থক কার্যত এর মাধ্যমে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও নির্বাচনী লড়াই হবে তীব্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মূলত দুটি প্রধান রাজনৈতিক ধারা এই লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে একটির নেতৃত্বে থাকবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং অন্যটির নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি দেশের অন্যতম বৃহৎ দল এবং আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা দলটির দেশজুড়ে রয়েছে এক বিশাল কর্মী বাহিনী এবং ব্যাপক জনসমর্থন। তবে গত এক বছরে তৃণমূলের কর্মীদের চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপির ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এছাড়া প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলটির ভেতরে কোন্দল ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটা ধারণার জন্ম জোরালো হচ্ছে যে বিএনপটি শুধু অর্থ ও ক্ষমতার দিকেই মনোযোগী। এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে শ্রেণিচরিত্রের দিক দিয়ে বিএনপির তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ক্রাইসিস গ্রুপের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, দল দুটি আসলে ‘একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে হাজার হাজার সদস্যকে বহিষ্কার করে এই নেতিবাচক ধারণা ঘোচানোর চেষ্টা করলেও, তা কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ের দুটি ঘটনা বিএনপির পালে নতুন করে হাওয়া দিচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশের মাটিতে তার প্রথম বক্তৃতাটি ছিল জনসমুদ্রের মধ্যে। তারেক ফেরার সঙ্গে সঙ্গে যে জনজোয়ার তৈরি হয়, তাতে বিএনপির বিরুদ্ধে যাবতীয় নেতিবাচক সংবাদকে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা থেকে হটিয়ে দেয়।
তারেক ফেরার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় তার মা বাংলাদেশের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃতৃবরণ করেন। পরদিন তার নামাজে জানাজা রাজধানী ঢাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছি। শোকার্ত সেই জনসমুদ্রে শুধু বিএনপির নেতাকর্মীরাই ছিলেন না, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে অন্যতম প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছিলেন লাখো সাধারণ মানুষ।
তবে সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ভোটের বাক্সে বিএনপির পক্ষে কতটা জোয়ার আনবে, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। তারেক রহমান এখন পর্যন্ত তার মায়ের মতো জনভিত্তি তৈরি করতে পারেননি, তদুপরি বিএনপি যখন সর্বশেষ ক্ষমতায় ছিল, তখনকার কথিত দুর্নীতি নিয়ে সমালোচকরা এখনো সোচ্চার। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় প্রবাসে থেকে দল পরিচালনা করলেও বাংলাদেশের দাবিদাওয়াপূর্ণ ও জটিল রাজনীতিতে তার নেতৃত্ব এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়। বিএনপির ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে তিনি দলকে কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন এবং রাজনীতিবিমুখ তরুণ ভোটারদের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বাড়াতে পারেন, তার ওপর।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক
অন্যদিকে, বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হাসিনা সরকারের আমলে তীব্র দমন-পীড়নের শিকার হওয়া জামায়াত ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে সামনে এসেছে; বিশেষ করে সেই আন্দোলনে দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দলটির আমির শফিকুর রহমান দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জামায়াত–শিবিরের সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন এখন রীতিমতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। হাসিনাত্তোর বাংলাদেশে ইসলামপন্থার এই পুনরুত্থান সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়লেও, অনেক ক্ষেত্রে জামায়াত ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। সেটি তাদের আদর্শের চেয়েও রাজনৈতিক কৌশল দিয়েই। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মধ্যপন্থী ও সমন্বিত ইসলামি সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী, যা জামায়াতের কঠোর ও আক্ষরিক ব্যাখ্যাধর্মী আদর্শ থেকে ভিন্ন। তা সত্ত্বেও, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রজন্মের অনেকেই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে খুব বেশি ভাবে না। এমনকি তারা বিচলিতও নায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। শুধু তা–ই নয়, দলটির নেতাকর্মীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নানা ধরনের নৃশংসতায় অংশ নিয়েছিল।
জামায়াতকে অনেকেই এখন দুই দলীয় প্রথাগত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, প্রচলিত রাজনীতি শুধু অভিজাত রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে। সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে মনোযোগ, শৃঙ্খলিত সাংগঠনিক কাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি জামায়াতকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। গত বছরের শেষ দিকে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মধ্য ও বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির দুর্গ হিসেবেই পরিচিত ছিল এত বছর ধরে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরের জয় এক সময় ছিল অকল্পনীয়ই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার মাধ্যমে জামায়াত আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনের নেতৃত্ব থাকা ছাত্ররাই গঠন করেছে এনসিপি। দলটি নিজস্ব শক্তিতে একটি শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আশা করেছিল, কিন্তু বিভিন্ন মত ও পথের নেতা–কর্মীদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের পেছনে ঐক্যবদ্ধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। নির্বাচনের আগ দিয়েই দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অনুধাবন করেন বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ না হলে এনসিপির পক্ষে নির্বাচনে হাতেগোনা কয়েকটি আসনের বেশি পাওয়া সম্ভব হবে না।
এনসিপি, বিএনপি ও জামায়াত—দুই বড় দলের সঙ্গেই জোট করার জন্য দরকষাকষি করেছে। জামায়াত তাদের বেশি আসন ছাড়ার কারণে এনসিপি তাদের সঙ্গেই জোট বেধেছে। যদিও ইসলামপন্থী দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করা নিয়ে এনসিপির মধ্যপন্থী অংশে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পদত্যাগ করেছেন। জামায়াতের সঙ্গে জোট নির্বাচনে এনসিপির আসন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ালেও দীর্ঘ মেয়াদে দলটির সমস্যা তৈরি করতে পারে। এনসিপি ভবিষ্যতে নিজস্ব সত্ত্বা হারাতে পারে, দলটির জামায়াতের একটি ধামাধরা সংগঠনে পরিণত হওয়ারও আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল কী হবে–তা অনুমান করা কঠিন। কারণ নির্বাচনী প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে–যেটিকে বাংলাদেশের সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মনে করা হয়–আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশ পেয়েছিল। যদিও বর্তমানে তাদের জনসমর্থন নিঃসন্দেহে কমেছে, তবুও দেশজুড়ে দলটির লাখ লাখ সমর্থক রয়েছে। এই ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কাকে ভোট দেবেন—কিংবা আদৌ ভোট দেবেন কি না—তা ফলাফলের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (যে বেশি ভোট পায় সেই জয়ী হয়) নির্বাচনী ব্যবস্থায়। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি জামায়াতের তুলনায় সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে। তা সত্ত্বেও, জামায়াত ১৯৯১ সালের তুলনায় ভালো ফলাফল করার পথে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন পেয়েছিল। সেটিই এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জামায়াতের সবচেয়ে ভালো ফলাফল।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। ফাইল ছবি: প্রেস উইং
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের লাখো তরুণের জন্য জীবনে প্রথমবারের মতো একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ এটি। ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন এই নির্বাচন নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
কিনের দীর্ঘ লেখাটির প্রথম অংশে আলোচিত হয়েছে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি। বিশ্লেষণটির হুবহু অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটি বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণের জন্য জীবনে প্রথমবারের মতো একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ এটি।
১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা তিনটি কারচুপির নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন। যার দুটিতে, অর্থাৎ ২০১৪ ও ২০২৪ সালে অংশ নেয়নি প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ নিলেও সেটি ছিল ব্যাপক কারচুপির নির্বাচন। অবশ্য হাসিনার শাসনামলের ওই সময়টায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছেই হাসিনার শাসনে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিটা কোনো ব্যাপার ছিল না। তবে ২০২০ সালে কোভিড–১৯ মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে হাসিনার জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছিল। তার সরকারের অর্থনৈতিক অব্যস্থাপনার ব্যাপারটি নিয়ে কথাবার্তা ও সমালোচনা শুরু হয়। মানুষ হাসিনার ক্রমবিকশিত স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার যোগসূত্র অনুধাবন করা শুরু করে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। হাসিনার অপশাসনের সঙ্গে মানুষের ক্ষোভ থেকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন দানা বাঁধে এবং শেষ পর্যন্ত জনরোষেই পতন হয় হাসিনার।
এই নির্বাচন গত দেড় বছরের একটি নাজুক রাজনৈতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ। ২০২৪ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ পুনর্বহাল করলে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সুবিধা দেওয়ার অপকৌশল বলে অভিযোগ উঠেছিল। হাসিনা প্রথমে শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভ দমাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আন্দোলনকে রীতিমতো গণবিপ্লবে পরিণত করে। ২০২৪–এর ৫ আগস্ট সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এই পুরো আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়, যাদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগের হাতে।
হাসিনার পতনের পর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর আলোচনার ভিত্তিতে ২০২৪–এর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। ইউনূস খুব দ্রুততার সঙ্গে তার করণীয়গুলো জানিয়ে দেন। সেগুলো হচ্ছে—বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কার, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন; আন্দোলনের সময় যারা মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করা এবং একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।
ইউনূস সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) পুনর্বহাল করে। এটি একটি অভ্যন্তরীণ বিচারিক আদালত, যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও বিচারের জন্য ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই আইসিটিতে এখন হাসিনার শাসনামলে গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হচ্ছে। ইউনূস সরকার এর পাশাপাশি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের জন্য ছয়টি সংস্কার কমিশনও গঠন করে। এসবের মধ্যে অন্যতম সংবিধান, নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বিচারব্যবস্থা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেন, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতসহ প্রধান দলগুলো সই করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সমালোচনার ঊর্ধে উঠতে পারেনি। যে সমালোচনাটি ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি, সেটা হচ্ছে, তারা আওয়ামী লীগের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ। সরকার অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ; একই সঙ্গে এই অন্তর্বর্তী সরকার ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ। তবে এই সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে (আওয়ামী লীগ ছাড়া) এক ধরনের রাজনৈতিক মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে জুলাই সনদে সই করাতে পেরেছে। এই সরকারের যে কাজটি এখন বাকি আছে, সেটি হচ্ছে, একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরে যাওয়া।
তারেক রহমান ও মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: ফেসবুক
প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কারা আছে এই নির্বাচনে?
এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি। এই নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ নেই। ২০২৫ সালের মে মাসে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর যে সহিংসতা হয়েছে, সেটির জন্য আওয়ামী লীগের ও এর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়েছে। সেসব মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনও আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে দিয়েছে।
গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলার প্রথম রায়টি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই রায়ে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হলো, দলটির লাখ লাখ সমর্থক কার্যত এর মাধ্যমে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও নির্বাচনী লড়াই হবে তীব্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মূলত দুটি প্রধান রাজনৈতিক ধারা এই লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে একটির নেতৃত্বে থাকবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং অন্যটির নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি দেশের অন্যতম বৃহৎ দল এবং আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা দলটির দেশজুড়ে রয়েছে এক বিশাল কর্মী বাহিনী এবং ব্যাপক জনসমর্থন। তবে গত এক বছরে তৃণমূলের কর্মীদের চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপির ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এছাড়া প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলটির ভেতরে কোন্দল ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটা ধারণার জন্ম জোরালো হচ্ছে যে বিএনপটি শুধু অর্থ ও ক্ষমতার দিকেই মনোযোগী। এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে শ্রেণিচরিত্রের দিক দিয়ে বিএনপির তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ক্রাইসিস গ্রুপের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, দল দুটি আসলে ‘একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে হাজার হাজার সদস্যকে বহিষ্কার করে এই নেতিবাচক ধারণা ঘোচানোর চেষ্টা করলেও, তা কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ের দুটি ঘটনা বিএনপির পালে নতুন করে হাওয়া দিচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশের মাটিতে তার প্রথম বক্তৃতাটি ছিল জনসমুদ্রের মধ্যে। তারেক ফেরার সঙ্গে সঙ্গে যে জনজোয়ার তৈরি হয়, তাতে বিএনপির বিরুদ্ধে যাবতীয় নেতিবাচক সংবাদকে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা থেকে হটিয়ে দেয়।
তারেক ফেরার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় তার মা বাংলাদেশের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃতৃবরণ করেন। পরদিন তার নামাজে জানাজা রাজধানী ঢাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছি। শোকার্ত সেই জনসমুদ্রে শুধু বিএনপির নেতাকর্মীরাই ছিলেন না, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে অন্যতম প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়েছিলেন লাখো সাধারণ মানুষ।
তবে সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ভোটের বাক্সে বিএনপির পক্ষে কতটা জোয়ার আনবে, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। তারেক রহমান এখন পর্যন্ত তার মায়ের মতো জনভিত্তি তৈরি করতে পারেননি, তদুপরি বিএনপি যখন সর্বশেষ ক্ষমতায় ছিল, তখনকার কথিত দুর্নীতি নিয়ে সমালোচকরা এখনো সোচ্চার। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় প্রবাসে থেকে দল পরিচালনা করলেও বাংলাদেশের দাবিদাওয়াপূর্ণ ও জটিল রাজনীতিতে তার নেতৃত্ব এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়। বিএনপির ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে তিনি দলকে কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন এবং রাজনীতিবিমুখ তরুণ ভোটারদের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বাড়াতে পারেন, তার ওপর।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক
অন্যদিকে, বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হাসিনা সরকারের আমলে তীব্র দমন-পীড়নের শিকার হওয়া জামায়াত ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে সামনে এসেছে; বিশেষ করে সেই আন্দোলনে দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দলটির আমির শফিকুর রহমান দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জামায়াত–শিবিরের সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন এখন রীতিমতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। হাসিনাত্তোর বাংলাদেশে ইসলামপন্থার এই পুনরুত্থান সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়লেও, অনেক ক্ষেত্রে জামায়াত ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। সেটি তাদের আদর্শের চেয়েও রাজনৈতিক কৌশল দিয়েই। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মধ্যপন্থী ও সমন্বিত ইসলামি সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী, যা জামায়াতের কঠোর ও আক্ষরিক ব্যাখ্যাধর্মী আদর্শ থেকে ভিন্ন। তা সত্ত্বেও, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রজন্মের অনেকেই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে খুব বেশি ভাবে না। এমনকি তারা বিচলিতও নায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। শুধু তা–ই নয়, দলটির নেতাকর্মীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নানা ধরনের নৃশংসতায় অংশ নিয়েছিল।
জামায়াতকে অনেকেই এখন দুই দলীয় প্রথাগত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, প্রচলিত রাজনীতি শুধু অভিজাত রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে। সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে মনোযোগ, শৃঙ্খলিত সাংগঠনিক কাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি জামায়াতকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। গত বছরের শেষ দিকে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মধ্য ও বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির দুর্গ হিসেবেই পরিচিত ছিল এত বছর ধরে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরের জয় এক সময় ছিল অকল্পনীয়ই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার মাধ্যমে জামায়াত আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনের নেতৃত্ব থাকা ছাত্ররাই গঠন করেছে এনসিপি। দলটি নিজস্ব শক্তিতে একটি শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আশা করেছিল, কিন্তু বিভিন্ন মত ও পথের নেতা–কর্মীদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের পেছনে ঐক্যবদ্ধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। নির্বাচনের আগ দিয়েই দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অনুধাবন করেন বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ না হলে এনসিপির পক্ষে নির্বাচনে হাতেগোনা কয়েকটি আসনের বেশি পাওয়া সম্ভব হবে না।
এনসিপি, বিএনপি ও জামায়াত—দুই বড় দলের সঙ্গেই জোট করার জন্য দরকষাকষি করেছে। জামায়াত তাদের বেশি আসন ছাড়ার কারণে এনসিপি তাদের সঙ্গেই জোট বেধেছে। যদিও ইসলামপন্থী দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করা নিয়ে এনসিপির মধ্যপন্থী অংশে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পদত্যাগ করেছেন। জামায়াতের সঙ্গে জোট নির্বাচনে এনসিপির আসন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ালেও দীর্ঘ মেয়াদে দলটির সমস্যা তৈরি করতে পারে। এনসিপি ভবিষ্যতে নিজস্ব সত্ত্বা হারাতে পারে, দলটির জামায়াতের একটি ধামাধরা সংগঠনে পরিণত হওয়ারও আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল কী হবে–তা অনুমান করা কঠিন। কারণ নির্বাচনী প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে–যেটিকে বাংলাদেশের সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মনে করা হয়–আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশ পেয়েছিল। যদিও বর্তমানে তাদের জনসমর্থন নিঃসন্দেহে কমেছে, তবুও দেশজুড়ে দলটির লাখ লাখ সমর্থক রয়েছে। এই ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কাকে ভোট দেবেন—কিংবা আদৌ ভোট দেবেন কি না—তা ফলাফলের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (যে বেশি ভোট পায় সেই জয়ী হয়) নির্বাচনী ব্যবস্থায়। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি জামায়াতের তুলনায় সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে। তা সত্ত্বেও, জামায়াত ১৯৯১ সালের তুলনায় ভালো ফলাফল করার পথে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন পেয়েছিল। সেটিই এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জামায়াতের সবচেয়ে ভালো ফলাফল।