ফরেন পলিসির বিশ্লেষণ
চরচা ডেস্ক

ইরানে টানা সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করছে, তার আড়ালে উঠে আসছে এক অচেনা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের নাম– টাংস্টেন। রুপালি রঙের এই ধাতুটি সাধারণ মানুষের কাছে খুব পরিচিত না হলেও আধুনিক যুদ্ধযন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু সেই টাংস্টেন নিয়েই এখন দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
টাংস্টেনের বিশেষত্ব তার ঘনত্ব এবং তাপ সহ্য করার ক্ষমতায়। সব ধাতুর মধ্যে এর গলনাঙ্ক সবচেয়ে বেশি। এই কারণেই এটি আর্মার-পিয়ার্সিং গোলাবারুদ, রকেটের নোজলসহ বিভিন্ন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রে অপরিহার্য। একে অনেকেই সরাসরি ‘যুদ্ধের ধাতু’ বলেই অভিহিত করেন।
সমস্যা হল, যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই ধাতুর বেশি উৎপাদন করে না। বাণিজ্যিকভাবে টাংস্টেন উত্তোলন প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ও পুনর্ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই সরবরাহ শৃংখলে ফাটল ধরছে।
ইরানকে লক্ষ্য করে চলমান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের চাপ এতটাই বেড়েছে যে টাংস্টেন-নির্ভর গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমে আসছে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে এই ধাতুর দামও আকাশছোঁয়া। সংঘাত শুরুর পর টাংস্টেনের মূল্য বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল জায়গাটি আরও গভীরে। বিশ্বজুড়ে টাংস্টেনের উৎপাদন, আমদানি ও ব্যবহার– সব ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে চীন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকে কার্যত সেই সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেই হচ্ছে। এই নির্ভরতা এখন কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা টাংস্টেন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তখন বেইজিং পাল্টা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জারি করে। তারপর থেকেই সরবরাহ সংকট তীব্র হতে শুরু করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই চাপ আরও বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও উদ্বেগে। যুদ্ধ শুরুর আগেই তারা দেশীয় খনিজ মজুত বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হল, নতুন খনি চালু করা বা সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা কোনো দ্রুত সমাধান নয়। এতে সময় লাগে বছরের পর বছর।
এখন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিদেশে নতুন অংশীদার খুঁজছে। কাজাখস্তানে একটি টাংস্টেন খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্পে বিনিয়োগ তারই অংশ। পাশাপাশি নেভাদায় নতুন প্রকল্পে অর্থ সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতের জন্য। বর্তমান সংকট মেটাতে এগুলো তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান দেবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা চীনের প্রভাবমুক্ত, তা তৈরি হতে সময় লাগতে পারে তিন থেকে দশ বছর।
এই অবস্থায় যুদ্ধের চাপ যত বাড়বে, টাংস্টেনের চাহিদাও তত বাড়বে। ফলে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যখন মজুত ফুরিয়ে গেলে তা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে, টাংস্টেন সংকট একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে–আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়, বরং সরবরাহ চেইনেরও লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কখনো কখনো বন্দুকের গুলির চেয়েও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
টাংস্টেনকে ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতা
বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেল’ বা কৌশলগত খনিজ সম্পদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। সেই তালিকায় নতুন করে উঠে এসেছে তুলনামূলক কম আলোচিত ধাতু–টাংস্টেন। একসময় যাকে কেবল শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই পরিণত হচ্ছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে।
টাংস্টেনের গুরুত্ব বোঝার জন্য এর বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। উচ্চ ঘনত্ব এবং অস্বাভাবিক উচ্চ গলনাঙ্কের কারণে এটি আধুনিক প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্পে অপরিহার্য। টারবাইন ব্লেড থেকে শুরু করে আর্মার-পিয়ার্সিং গোলাবারুদ–সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। ইতিহাসও দেখায়, এই ধাতুকে কেন্দ্র করে শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও টাংস্টেনের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ছিল কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বিশ্বব্যাপী টাংস্টেন উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে এই খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলে বেইজিংয়ের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব উৎপাদন কমিয়ে আমদানি ও পুনর্ব্যবহারের ওপর নির্ভর করেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে বাণিজ্যিকভাবে টাংস্টেন উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।
এই নির্ভরতা প্রথমে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা না দিলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। খনিজ সম্পদ এখন আর শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তখন চীনও পাল্টা টাংস্টেনসহ বিভিন্ন খনিজের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর ফলে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে শুরু করেছেন যে, টাংস্টেনের মতো খনিজে নির্ভরতা একটি বড় ঝুঁকি। ফলে তারা বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা জোরদার করেছে। দেশীয় উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি বিদেশে নতুন খনি ও সরবরাহ শৃঙ্খলা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মধ্য এশিয়া এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। কাজাখস্তানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে টাংস্টেন খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প তারই উদাহরণ। এই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে নিজস্ব সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। তবে এই অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে চীন ও রাশিয়ার প্রভাবাধীন হওয়ায় সেখানে নতুন করে ব্যবসা বিস্তার সহজ নয়।
দেশের ভেতরেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। নেভাদায় টাংস্টেন খনির উন্নয়ন, বেসরকারি খনি কোম্পানিতে সরাসরি বিনিয়োগ—সবই সেই প্রচেষ্টার অংশ। একই সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের আগ্রহও বেড়েছে, কারণ এই খনিজকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের সামনে রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। নতুন খনি খুঁজে পাওয়া যেমন জরুরি, তেমনি তার সঙ্গে জড়িত প্রক্রিয়াজাতকরণ, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলাও সময়সাপেক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলা দাঁড় করাতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় টাংস্টেনকে ঘিরে প্রতিযোগিতা কেবল একটি খনিজ সম্পদের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক শক্তির লড়াইয়ের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নির্ভরতা কমাতে চাইছে, চীন সেখানে তার প্রভাব ধরে রাখতে কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ বা প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক শক্তির নয়—বরং কাঁচামাল, সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক প্রভাবেরও। টাংস্টেন সেই বাস্তবতারই একটি প্রতীক, যেখানে ছোট একটি ধাতু বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে নতুন করে নির্ধারণ করছে।
(ফরেন পলিসি অবলম্বনে)

ইরানে টানা সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করছে, তার আড়ালে উঠে আসছে এক অচেনা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের নাম– টাংস্টেন। রুপালি রঙের এই ধাতুটি সাধারণ মানুষের কাছে খুব পরিচিত না হলেও আধুনিক যুদ্ধযন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু সেই টাংস্টেন নিয়েই এখন দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
টাংস্টেনের বিশেষত্ব তার ঘনত্ব এবং তাপ সহ্য করার ক্ষমতায়। সব ধাতুর মধ্যে এর গলনাঙ্ক সবচেয়ে বেশি। এই কারণেই এটি আর্মার-পিয়ার্সিং গোলাবারুদ, রকেটের নোজলসহ বিভিন্ন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রে অপরিহার্য। একে অনেকেই সরাসরি ‘যুদ্ধের ধাতু’ বলেই অভিহিত করেন।
সমস্যা হল, যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই ধাতুর বেশি উৎপাদন করে না। বাণিজ্যিকভাবে টাংস্টেন উত্তোলন প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ও পুনর্ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই সরবরাহ শৃংখলে ফাটল ধরছে।
ইরানকে লক্ষ্য করে চলমান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের চাপ এতটাই বেড়েছে যে টাংস্টেন-নির্ভর গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমে আসছে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে এই ধাতুর দামও আকাশছোঁয়া। সংঘাত শুরুর পর টাংস্টেনের মূল্য বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল জায়গাটি আরও গভীরে। বিশ্বজুড়ে টাংস্টেনের উৎপাদন, আমদানি ও ব্যবহার– সব ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে চীন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকে কার্যত সেই সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেই হচ্ছে। এই নির্ভরতা এখন কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা টাংস্টেন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তখন বেইজিং পাল্টা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জারি করে। তারপর থেকেই সরবরাহ সংকট তীব্র হতে শুরু করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই চাপ আরও বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও উদ্বেগে। যুদ্ধ শুরুর আগেই তারা দেশীয় খনিজ মজুত বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হল, নতুন খনি চালু করা বা সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা কোনো দ্রুত সমাধান নয়। এতে সময় লাগে বছরের পর বছর।
এখন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিদেশে নতুন অংশীদার খুঁজছে। কাজাখস্তানে একটি টাংস্টেন খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্পে বিনিয়োগ তারই অংশ। পাশাপাশি নেভাদায় নতুন প্রকল্পে অর্থ সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতের জন্য। বর্তমান সংকট মেটাতে এগুলো তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান দেবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা চীনের প্রভাবমুক্ত, তা তৈরি হতে সময় লাগতে পারে তিন থেকে দশ বছর।
এই অবস্থায় যুদ্ধের চাপ যত বাড়বে, টাংস্টেনের চাহিদাও তত বাড়বে। ফলে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যখন মজুত ফুরিয়ে গেলে তা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে, টাংস্টেন সংকট একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে–আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়, বরং সরবরাহ চেইনেরও লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কখনো কখনো বন্দুকের গুলির চেয়েও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
টাংস্টেনকে ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতা
বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেল’ বা কৌশলগত খনিজ সম্পদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। সেই তালিকায় নতুন করে উঠে এসেছে তুলনামূলক কম আলোচিত ধাতু–টাংস্টেন। একসময় যাকে কেবল শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই পরিণত হচ্ছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে।
টাংস্টেনের গুরুত্ব বোঝার জন্য এর বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। উচ্চ ঘনত্ব এবং অস্বাভাবিক উচ্চ গলনাঙ্কের কারণে এটি আধুনিক প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্পে অপরিহার্য। টারবাইন ব্লেড থেকে শুরু করে আর্মার-পিয়ার্সিং গোলাবারুদ–সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। ইতিহাসও দেখায়, এই ধাতুকে কেন্দ্র করে শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও টাংস্টেনের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ছিল কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বিশ্বব্যাপী টাংস্টেন উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে এই খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলে বেইজিংয়ের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব উৎপাদন কমিয়ে আমদানি ও পুনর্ব্যবহারের ওপর নির্ভর করেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে বাণিজ্যিকভাবে টাংস্টেন উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।
এই নির্ভরতা প্রথমে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা না দিলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। খনিজ সম্পদ এখন আর শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তখন চীনও পাল্টা টাংস্টেনসহ বিভিন্ন খনিজের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর ফলে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে শুরু করেছেন যে, টাংস্টেনের মতো খনিজে নির্ভরতা একটি বড় ঝুঁকি। ফলে তারা বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা জোরদার করেছে। দেশীয় উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি বিদেশে নতুন খনি ও সরবরাহ শৃঙ্খলা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মধ্য এশিয়া এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। কাজাখস্তানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে টাংস্টেন খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প তারই উদাহরণ। এই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে নিজস্ব সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। তবে এই অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে চীন ও রাশিয়ার প্রভাবাধীন হওয়ায় সেখানে নতুন করে ব্যবসা বিস্তার সহজ নয়।
দেশের ভেতরেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। নেভাদায় টাংস্টেন খনির উন্নয়ন, বেসরকারি খনি কোম্পানিতে সরাসরি বিনিয়োগ—সবই সেই প্রচেষ্টার অংশ। একই সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের আগ্রহও বেড়েছে, কারণ এই খনিজকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের সামনে রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। নতুন খনি খুঁজে পাওয়া যেমন জরুরি, তেমনি তার সঙ্গে জড়িত প্রক্রিয়াজাতকরণ, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলাও সময়সাপেক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলা দাঁড় করাতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় টাংস্টেনকে ঘিরে প্রতিযোগিতা কেবল একটি খনিজ সম্পদের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক শক্তির লড়াইয়ের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নির্ভরতা কমাতে চাইছে, চীন সেখানে তার প্রভাব ধরে রাখতে কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ বা প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক শক্তির নয়—বরং কাঁচামাল, সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক প্রভাবেরও। টাংস্টেন সেই বাস্তবতারই একটি প্রতীক, যেখানে ছোট একটি ধাতু বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে নতুন করে নির্ধারণ করছে।
(ফরেন পলিসি অবলম্বনে)

জর্জের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে জে. ক্রিস্টোফার লানেভের নাম সামনে আসা এবং একই সঙ্গে জে. ডেভিড এম হুডনে ও মে. জে. উইলিয়াম গ্রিন জুনিয়ার-কে অপসারণের ঘটনা দেখায়, এটি একক কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে একটি বিস্তৃত পুনর্গঠনের অংশ। এর আগে জে. জেমস জে মিঙ্গাস-এর আগাম অবসরও একই ধারার ইঙ্গিত দেয়।

ইরানে স্থলযুদ্ধ-এক সময় যা ছিল প্রায় অকল্পনীয়, আজ তা বাস্তব আলোচনার কেন্দ্রে। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করা যেমন কঠিন, তা বজায় রাখা তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত সেই সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন ‘যুদ্ধ হবে কি না’ তা নয়, বরং