মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত পরিস্থিতি জনসাধারণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জ্বালানি স্থাপনা সৌদি আরামকোয় হামলার পর তেল শোধন প্রক্রিয়া বন্ধ রেখেছে সংস্থাটি। এর প্রভাব পড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে। এরই মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ৮৫ ডলারে উঠেছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ৭০ ডলারের আশপাশে। দেশের জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়বে কতটা?
এরই মধ্যে সরকার মার্চ মাসের জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে, যা রোজা ও ঈদের মাসে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু ঈদের পর এ দাম বাড়বে কি?
অর্থনীতিবিদ ড. গোলাম মোয়াজ্জেম চরচাকে বলেন, “এই হারে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে থাকলে এপ্রিল মাসে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা, কিংবা তারও বেশি বাড়াতে হতে পারে পারে। যার প্রভাব হবে বহুমুখী।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ চাহিদার ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে আমদানি করে। তবে এই রিফাইনারিগুলো তাদের অপরিশোধিত তেল সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকেই সংগ্রহ করে। ফলে আরামকোতে আঘাত মানে এশিয়াজুড়ে পরিশোধিত তেলের সংকট ও আকাশচুম্বী দাম।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের ব্যবহারযোগ্য মজুত নেমে এসেছে প্রায় ১০ দিনের সমপরিমাণে, যা চলতি চাহিদা অনুযায়ী সীমিত। অন্যদিকে, অকটেন ও ফার্নেস অয়েলের মজুত আপাতত স্থিতিশীল এবং তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখাচ্ছে।
ডিজেল: সীমিত ব্যবহারযোগ্য মজুত
বিপিসির তথ্যমতে, দেশে ডিজেলের মোট মজুত সক্ষমতা প্রায় ছয় লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ মেট্রিক টন। যদিও ৩ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহারযোগ্য মজুত আছে মাত্র এক লাখ ৩৪ হাজার ৬২ টন।
বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে দৈনিক ১৩ হাজার টন ডিজেল লাগে। মজুত যা আছে, তা দিয়ে আনুমানিক ১০ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে। ডিজেলের মোট ধারণক্ষমতা ৩০–৪৫ দিনের মতো হলেও কার্যকর ব্যবহারযোগ্য মজুত কমে যাওয়ায় তা সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা সংশয় তৈরি করেছে।
ডিজেল মূলত পরিবহন, কৃষি, শিল্পখাত এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার হয়। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশজুড়ে মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ চাপে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “যদি আমদানি নিয়মিত না থাকে, তবে এই মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে, যা বাজারে তেল সরবরাহকে প্রভাবিত করবে।”
অকটেন: আপাতত স্থিতিশীল
অকটেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মোট মজুত সক্ষমতা প্রায় ৫৩ হাজার ৩৬১ টন এবং ব্যবহারযোগ্য মজুত ৩৩ হাজার ৬৪০ টন। এটি আনুমানিক ২৮ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অকটেন মজুত পর্যাপ্ত হওয়ায় তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে উচ্চ চাহিদা বা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলে অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে পারে।
ফার্নেস অয়েল: বিদ্যুৎ খাতে স্বস্তি
ফার্নেস অয়েল মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ধারণক্ষমতা প্রায় এক লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৯ টন এবং ব্যবহারযোগ্য মজুত ৭৬ হাজার ১৫৬ টন। বর্তমান ব্যবহারের হারে এটি প্রায় ৯৩ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার কমেছে। ফলে এই খাতে পর্যাপ্ত রিজার্ভ আছে এবং তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা খুব কম।
এলএনজি: আন্তর্জাতিক ঝুঁকি এবং সরবরাহ চ্যালেঞ্জ
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দেশের গ্যাস সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার চলতি বছর প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছে। একটি কার্গো সাধারণত ৩-৫ দিনের চাহিদা পূরণ করে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর এই সরবরাহ রুটে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থাকায় এলএনজি আমদানিতে সম্ভাব্য বিঘ্ন তৈরি হতে পারে। তবে, চলতি মাসের এলএনজি নিয়ে রওনা হওয়া ৯টি জাহাজই ইরান সংঘাত শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ায় কিছুটা স্বস্তিতে আছ সরকারের জ্বালানি বিভাগ।
সরকারের অবস্থান
দেশের জ্বালানি সরবরাহে বর্তমানে তাৎক্ষণিক কোনো সংকট নেই বলে ধারণা দিচ্ছেন পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কর্মকর্তারা। তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও সরবরাহ চেইন মনিটরিং করা হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় কৌশলগত রিজার্ভ গড়ে তোলা এবং আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণ অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
ডিজেলের মজুত কম হওয়ায় সরবরাহ চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। অকটেন ও ফার্নেস অয়েল আপাতত স্থিতিশীল হলেও এলএনজি আন্তর্জাতিক সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, যা জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সতর্কতার তাগিদ দিচ্ছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জ্বালানি তেলের মজুতের সামগ্রিক চিত্র এই খাত-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তায় ফেললেও নতুন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। পেট্রোবাংলা ও বিপিসি’র কর্মকর্তারা নতুন নেতৃত্বকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।
মঙ্গলবার পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যন সাংবাদিকদের জানান, বর্তমান তেলের মজুতে ১৪ দিন চলবে। একই সাথে ডিজেলসহ অন্যান্য তেলের ক্ষেত্রে কোনো সংকট হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের ওপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন চরচাকে বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমরা গভীর সংকটে পড়ব, তবে মনে হয় যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এ ছাড়া ব্যবহারযোগ্য মজুত নিয়ে বিপিসির বক্তব্যকে গ্রহণ করাটাই যৌক্তিক হবে। কারণ, তাদের তেল ব্যবস্থাপনার হিসাব তারাই জানে।”
এই অধ্যাপক বলেন, “আমরা বছরের মোট ব্যবহারের থেকে গড় করে হিসাব করি। বিপিসি জানে কোন নির্দিষ্ট সময় তেলের কতটা চাহিদা থাকে। এখন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যদি কম উৎপাদনে থাকে, তাহলেও তেলের চাহিদা কম থাকতে পারে।”