আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে ওঠার শর্তে ব্যাংকগুলোর পরিচালনার দায়িত্ব পুরনো উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে এটি সব ব্যাংকের জন্য সাধারণ নীতি নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
তিনি জানান, প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, বিশেষ করে তারল্য পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা পরিচালকদের উপস্থিতির সাপেক্ষে ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সম্প্রতি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পুরনো উদ্যোক্তা পরিচালকদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
একই ধরনের পদক্ষেপ অন্য ব্যাংকের ক্ষেত্রেও নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে আরিফ হোসেন চরচাকে বলেন, “যেসব ব্যাংক আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মতো স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরেছে, সেসব ব্যাংক পুরনো উদ্যোক্তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
তবে শর্ত হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা পরিচালকদের পেতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগও থাকা যাবে না।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, “সব ব্যাংক পুরনো পরিচালনা পর্ষদকে ধারাবাহিকভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ‘ব্ল্যাঙ্কেট পলিসি’ বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে নেওয়া হবে।”
ব্যাংক স্থিতিশীল কি না সে বিবেচনার মানদণ্ড ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, “কোনো ব্যাংক যদি গ্রাহকের চাহিবামাত্র চেকের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করতে পারে, তাহলে সেটিকে কার্যত স্থিতিশীল বলা যায়।
ঋণ খেলাপি থাকাই সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। মূল বিষয় হলো ব্যাংকের তারল্য। যদি তারল্য সংকট না থাকে এবং গ্রাহকের অর্থ পরিশোধে সমস্যা না হয়, তাহলে ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল ধরা যায়।”
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাবে পরিচালিত বলে অভিযোগ থাকা একাধিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বলা হয়, ব্যাংকগুলোর সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই ছিল পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার কারণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন পর্যন্ত ১৬টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড বা স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক।
এছাড়া, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়।
পরে এসব ব্যাংক ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে একীভূত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া একীভূত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক গত সপ্তাহে কাজে যোগ দিয়েছেন।
গত ১৫ জুলাই আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব পুরনো উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ফিরিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন নিয়োগ দেয়া ১৪ জনের সঙ্গে আগের পাঁচজন মিলিয়ে পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ১৯ জনে দাঁড়ায়।
উদ্যোক্তা পরিচালকদের প্রত্যাবর্তনের অর্থ তদারকি শিথিল হওয়া নয় বলে আল আরাফাহ ব্যাংককে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
একই সঙ্গে ব্যাংকটিকে সুশাসন ও খেলাপি ঋণ আদায়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।
প্রশ্ন হচ্ছে, আগে সুশাসনের ঘাটতি থাকায় যেসব ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করেছিল সেগুলোকে তারল্যের স্থিতিশীলতার শর্তে পুরনো পর্ষদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারটি ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে? তারল্য স্বাভাবিক হলেই কি উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া উচিত, নাকি আগে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি?
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্বহালের ক্ষেত্রে শুধু তারল্য নয়, সুশাসন, সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুসরণ এবং অতীতের অনিয়মের তদন্তের অগ্রগতি—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির চরচাকে বলেন, “যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আর্থিকভাবে স্থিতিশীল ব্যাংকগুলোকে শর্তসাপেক্ষে পুরনো উদ্যোক্তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যেতে পারে, তবে শুধু তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠাই যথেষ্ট নয়, বোর্ডের স্বাধীনতা, মালিকানা কাঠামো, নিয়ন্ত্রক তদারকি, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ব্যাংক খাতে টেকসই আস্থা ফিরে আসবে না।”
গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশটি সংসদে বিল হিসেবে পাস হয়। সংসদে পাসের আগে ১৮(ক) নামে আইনে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।
আমির খসরু। ছবি: বাসসএই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক রেজ্যুলেশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা এর শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তারা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এ সুযোগ দিতে পারবে।
ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনে নতুন ধারা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সংসদে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ফিরিয়ে দিতেই এ ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) ধারাটি বাতিলের দাবি জানায়।
পরে সংসদে বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকার আইন থেকে ধারাটি বাদ দেবে।