শেখ হাসিনাহীন নির্বাচন, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের অপেক্ষা
চরচা ডেস্ক
শেখ হাসিনাহীন নির্বাচন, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের অপেক্ষা
চরচা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০: ০৬
জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট বক্স। ফাইল ছবি: রয়টার্স
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম জাতীয় ভোট। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার এবার ৩৫০ আসনে ভোট দেবেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার ২০২৫’ নিয়ে গণভোট।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেই আন্দোলনের সময় সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয় এবং তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে তার দল আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এবার নির্বাচনে বড় দুই রাজনৈতিক শক্তি হলো বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় দেশের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা একেবারে ঘুরে গেছে। এবারের নির্বাচনে আলোচনায় থাকা প্রতিটি অংশীজন নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি)। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। বিএনপি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থানের পর তারেক রহমান ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নির্বাচনী জনসভায় অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির সমর্থন প্রায় ৩৩ শতাংশ।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক
জামায়াতে ইসলামী
বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পুরনো শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (জামায়াত)। দলটির নেতৃত্বে আছেন শফিকুর রহমান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থানের কারণে দলটি বিতর্কিত ইতিহাস বহন করে। শেখ হাসিনার সময়ে দলটি নিষিদ্ধ হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক আদালতের রায়ে তাদের নিবন্ধন পুনর্বহাল করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে হাসিনা সরকারের সময়ে দলটির শীর্ষ পাঁচ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
কিন্তু গত দুই বছরে রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে গেছে। জামায়াত এবার ১১ দলীয় জোট নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে নতুন প্রজন্মের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যে দলটি ২০২৪ সালের গণ–আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া প্রথমবারের মতো জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনসিপি
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উদ্যোগে ২০২৫ সালে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপির নেতৃত্বে আছেন ২৭ বছর বয়সী নাহিদ ইসলাম। দলের লক্ষ্য, দুর্নীতি–মুক্ত শাসন, নারী অধিকার রক্ষা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোটে অংশ নিয়েছে। যদিও এই জোট দলটির ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং কয়েকজন নেতা পদত্যাগও করেছেন। সমালোচকরা বলেছেন, ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একটি দল হিসেবে এনসিপির জামায়াত–জোটে যাওয়ায় তাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তবে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “এটি কেবল কৌশলগত জোট, আদর্শগত নয়।”
জামায়াত, এনসিপি নিয়ে ১১ দলের জোট গঠন হয়েছে, যা বিএনপির ঠিক পরেই জনপ্রিয় জোট হিসেবে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট ের এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের সমর্থন প্রায় ২৯ শতাংশ। তারা নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক
অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনী
রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে, এবার নির্বাচনকে প্রভাবিত করছেন দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
নির্বাচনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি একই দিনে অনুষ্ঠেয় ‘জুলাই চার্টার’ গণভোট নিয়েও সক্রিয়। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই চার্টারে দুর্নীতি দমন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সমালোচকদের অনেকে বলছেন, গণভোট আয়োজনে সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্সের লেকচারার খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলছেন, “নির্বাচন সফল করতে ইউনূসের প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সেনাপ্রধানের মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা—উভয়ই অপরিহার্য। একজনের হাত ধরে ভোট হবে, আর অন্যজনের হাত ধরে দেশ শান্ত থাকবে।”
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেবল নির্বাচন আয়োজনই করছেন না, বরং দেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। তার নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন (সিআরসি) গত এক বছরে শাসনকাঠামো, পুলিশ ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছে।
ড. ইউনূস এই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য আশা করলেও, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো এর কিছু ধারায় (যেমন: আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) দ্বিমত পোষণ করেছে। অনেক আইনজ্ঞ আবার বর্তমান সংবিধানের অধীনে এই গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ওয়াকার-উজ-জামান সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নির্বাচন-নিরাপত্তার মূল দায়িত্বে আছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন জানান এবং ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত দেন। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর একটি বড় প্রভাব থাকলেও, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শুরু থেকেই ঘোষণা করেছেন যে সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতার লড়াইয়ে নেই। তবে তার ভূমিকা এখন পর্দার আড়ালের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন দলের নেতারা। ছবি: ফেসবুক
২০২৪-এর পরবর্তী অস্থিতিশীলতা ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে, নির্বাচন চলাকালীন দেশজুড়ে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী হবে প্রধান শক্তি। রাজনৈতিক সমর্থন: ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছিলেন যে, ‘যাই ঘটুক না কেন’ তিনি ইউনূস সরকারকে সমর্থন দেবেন। তার এই সমর্থনই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান শক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
শেখ হাসিনার প্রভাব
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ থাকলেও আলোচনা ও উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী সেখান থেকেই আসন্ন নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছেন।
গত মাসে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, একটি বড় জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে আয়োজিত নির্বাচন দেশকে আরও বিভক্ত করবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অস্বীকার করলে ভবিষ্যতে দেশে আরও চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমর্থকদের ভোটদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে জনসম্মুখে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ভারতের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় তার বক্তব্যকে ‘বিদ্বেষমূলক’ ও ‘গণহত্যাকারীর ভাষণ’ হিসেবে অভিহিত করে একে বাংলাদেশের জনগণের ওপর অপমান বলে দাবি করেছে। উল্লেখ্য, গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে এবং ঢাকা বারবার তার প্রত্যর্পণের দাবি জানাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের একটি বিশাল ও বিশ্বস্ত ভোট ব্যাংক রয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় সেই ভোটাররা এখন দোলাচলে। শেখ হাসিনা যদি এই ভোটারদের বড় অংশকে কেন্দ্র থেকে দূরে রাখতে পারেন, তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার বক্তব্য প্রচারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
পর্দার আড়াল থেকে হাসিনা আওয়ামী লীগের ক্যাডার ও গোপন কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে অস্থিরতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ততই তীব্র হচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট বক্স। ফাইল ছবি: রয়টার্স
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম জাতীয় ভোট। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার এবার ৩৫০ আসনে ভোট দেবেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার ২০২৫’ নিয়ে গণভোট।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেই আন্দোলনের সময় সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয় এবং তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে তার দল আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এবার নির্বাচনে বড় দুই রাজনৈতিক শক্তি হলো বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় দেশের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা একেবারে ঘুরে গেছে। এবারের নির্বাচনে আলোচনায় থাকা প্রতিটি অংশীজন নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি)। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। বিএনপি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থানের পর তারেক রহমান ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নির্বাচনী জনসভায় অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির সমর্থন প্রায় ৩৩ শতাংশ।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক
জামায়াতে ইসলামী
বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পুরনো শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (জামায়াত)। দলটির নেতৃত্বে আছেন শফিকুর রহমান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থানের কারণে দলটি বিতর্কিত ইতিহাস বহন করে। শেখ হাসিনার সময়ে দলটি নিষিদ্ধ হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক আদালতের রায়ে তাদের নিবন্ধন পুনর্বহাল করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে হাসিনা সরকারের সময়ে দলটির শীর্ষ পাঁচ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
কিন্তু গত দুই বছরে রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে গেছে। জামায়াত এবার ১১ দলীয় জোট নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে নতুন প্রজন্মের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যে দলটি ২০২৪ সালের গণ–আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া প্রথমবারের মতো জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনসিপি
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উদ্যোগে ২০২৫ সালে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপির নেতৃত্বে আছেন ২৭ বছর বয়সী নাহিদ ইসলাম। দলের লক্ষ্য, দুর্নীতি–মুক্ত শাসন, নারী অধিকার রক্ষা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোটে অংশ নিয়েছে। যদিও এই জোট দলটির ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং কয়েকজন নেতা পদত্যাগও করেছেন। সমালোচকরা বলেছেন, ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একটি দল হিসেবে এনসিপির জামায়াত–জোটে যাওয়ায় তাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তবে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “এটি কেবল কৌশলগত জোট, আদর্শগত নয়।”
জামায়াত, এনসিপি নিয়ে ১১ দলের জোট গঠন হয়েছে, যা বিএনপির ঠিক পরেই জনপ্রিয় জোট হিসেবে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট ের এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের সমর্থন প্রায় ২৯ শতাংশ। তারা নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক
অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনী
রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে, এবার নির্বাচনকে প্রভাবিত করছেন দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
নির্বাচনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি একই দিনে অনুষ্ঠেয় ‘জুলাই চার্টার’ গণভোট নিয়েও সক্রিয়। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই চার্টারে দুর্নীতি দমন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সমালোচকদের অনেকে বলছেন, গণভোট আয়োজনে সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্সের লেকচারার খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলছেন, “নির্বাচন সফল করতে ইউনূসের প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সেনাপ্রধানের মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা—উভয়ই অপরিহার্য। একজনের হাত ধরে ভোট হবে, আর অন্যজনের হাত ধরে দেশ শান্ত থাকবে।”
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেবল নির্বাচন আয়োজনই করছেন না, বরং দেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। তার নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন (সিআরসি) গত এক বছরে শাসনকাঠামো, পুলিশ ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছে।
ড. ইউনূস এই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য আশা করলেও, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো এর কিছু ধারায় (যেমন: আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) দ্বিমত পোষণ করেছে। অনেক আইনজ্ঞ আবার বর্তমান সংবিধানের অধীনে এই গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ওয়াকার-উজ-জামান সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নির্বাচন-নিরাপত্তার মূল দায়িত্বে আছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন জানান এবং ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত দেন। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর একটি বড় প্রভাব থাকলেও, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শুরু থেকেই ঘোষণা করেছেন যে সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতার লড়াইয়ে নেই। তবে তার ভূমিকা এখন পর্দার আড়ালের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন দলের নেতারা। ছবি: ফেসবুক
২০২৪-এর পরবর্তী অস্থিতিশীলতা ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে, নির্বাচন চলাকালীন দেশজুড়ে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী হবে প্রধান শক্তি। রাজনৈতিক সমর্থন: ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছিলেন যে, ‘যাই ঘটুক না কেন’ তিনি ইউনূস সরকারকে সমর্থন দেবেন। তার এই সমর্থনই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান শক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
শেখ হাসিনার প্রভাব
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ থাকলেও আলোচনা ও উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী সেখান থেকেই আসন্ন নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছেন।
গত মাসে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, একটি বড় জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে আয়োজিত নির্বাচন দেশকে আরও বিভক্ত করবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অস্বীকার করলে ভবিষ্যতে দেশে আরও চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সমর্থকদের ভোটদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে জনসম্মুখে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ভারতের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় তার বক্তব্যকে ‘বিদ্বেষমূলক’ ও ‘গণহত্যাকারীর ভাষণ’ হিসেবে অভিহিত করে একে বাংলাদেশের জনগণের ওপর অপমান বলে দাবি করেছে। উল্লেখ্য, গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে এবং ঢাকা বারবার তার প্রত্যর্পণের দাবি জানাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের একটি বিশাল ও বিশ্বস্ত ভোট ব্যাংক রয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় সেই ভোটাররা এখন দোলাচলে। শেখ হাসিনা যদি এই ভোটারদের বড় অংশকে কেন্দ্র থেকে দূরে রাখতে পারেন, তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার বক্তব্য প্রচারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
পর্দার আড়াল থেকে হাসিনা আওয়ামী লীগের ক্যাডার ও গোপন কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে অস্থিরতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ততই তীব্র হচ্ছে।