ফজলে রাব্বি

২০১১ সালের পর থেকে মাঝে মাঝেই বাংলাদেশের জনপরিসরে আলোচনায় উঠে আসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেউ কেউ একে মাইলস্টোন প্রকল্প বলে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। কারো আপত্তি আছে বিশাল টাকার অঙ্কে। কারো কারো চিন্তার বিষয় পরিবেশ-প্রতিবেশ।
নানামাত্রিক প্রচার আর অপপ্রচারে সয়লাব হয়ে যায় মূলধারার গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে আসলেই কতটা ঝুঁকি আছে, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব নিয়ে আলাপগুলো ঠিক দিশা দিতে পারে কি?
পদ্মাপাড়ে রূপপুরের চারপাশের মানুষ দানবীয় চার কুলিং টাওয়ার আর দুটি রিঅ্যাক্টর ভবনের অবকাঠামো অবাক বিস্ময়ে দেখেন; তবে বুঝতে পারেন না প্রতিক্রিয়াটি ঠিক কী হবে! বাপ-দাদার আমল থেকে রূপপুরের বিশাল প্রকল্প এলাকা খালি পড়ে থাকতে দেখেছেন তারা। ঘরোয়া আড্ডায় তারা জেনেছেন–এখানে হবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই সময় গণমাধ্যমে দেখেছেন চেরনোবিল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা, দেখেছেন ফুকুশিমাকে ঘিরে জাপানের দুর্ভোগের খবর। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ২০১১ সালে প্রকল্পের শুরু থেকে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু আতঙ্ক থাকলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের প্রতীক পারমাণবিক বিদ্যুৎকে অস্বীকার করেনি পাবনার মানুষ। তৈরি করেনি কোনো প্রতিবন্ধকতা। অথচ, তাদের অজ্ঞতার অন্ধকারে রেখেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে রূপপুর।
সরেজমিনে প্রকল্পের চারপাশের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল, নির্মাণকাজ শুরুর ১৫ বছর পর যখন রূপপুরের রিঅ্যাক্টর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে পা বাড়িয়েছে, তখনো এই আতঙ্ক রয়েই গেছে! এত বড় একটা প্রকল্প ঘিরে এ ধরনের আচরণকে ব্যর্থতা বলতে অবশ্য নারাজ পরমাণু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তারা একে বলছেন ‘অপরাধ’!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয়দের সচেতন করার প্রধান দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের। কিন্তু তারা এই ১৫ বছরে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঈশ্বরদীতে যে তথ্যকেন্দ্রটি রয়েছে, সেটি রাশিয়ার পক্ষ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ এটি কমিশনের নিজস্ব উদ্যোগে হওয়া উচিত ছিল।”
এই অধ্যাপক বলেন, “একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে কমিশনের এই গা-ছাড়া ভাব রীতিমতো ‘অপরাধ’ এবং ‘বিশাল ব্যর্থতা’। কারণ, জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছাড়া এত বড় একটি প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করা কঠিন।”
স্থানীয়দের উদ্বেগ আর আস্থাহীনতার চিত্র
একটি জরিপ অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে ৯ জন স্থানীয় মানুষ মনে করেন, এই কেন্দ্রের কারণে তাদের ফসল নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ক্ষতি বা বিকলাঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ভয়ের প্রধান কারণ, স্থানীয়দের সাথে কর্তৃপক্ষের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকা। এবং তাদের কোনো সঠিক গাইডলাইন বা নির্দেশিকা দেওয়া হয়নি। এমনকি পাশের কুষ্টিয়া অঞ্চলের মানুষ, যারা তেজস্ক্রিয়তার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে, তাদের কাছেও কোনো তথ্য পৌঁছানো হয়নি।

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, রূপপুরের ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী ৬০০ মানুষের মধ্যে পাঁচ সদস্যের এক গবেষণা দলের চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশর প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সরেজমিনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখনো ইট-পাথরের অবকাঠামো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু না হলেও স্থানীয়দের অনেকের দাবি, তাদের গাছের ডাব ছোট হয়ে গেছে, তাপমাত্রা বেড়ে গেছে, পানির স্তর নিচে নেমে গেছে!
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লক্ষ-কোটি টাকার একটা প্রকল্প ঘিরে স্থানীয়দের এমন অনাস্থা বিরল। এই অবস্থা ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বলেও মনে করেন তারা।
জনঘনত্ব ও ঝুঁকি: নিরাপত্তার ভৌগোলিক প্রশ্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ
রূপপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কগুলোর একটি হলো এর জনঘনত্ব প্রেক্ষাপট। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী এলাকায় প্রকল্পটি অবস্থিত, যেখানে আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ রয়েছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সাধারণত বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ৩০-৫০ কিলোমিটার রেডিয়াসের ইমারজেন্সি প্ল্যানিং জোন (ইপিজেড) বিবেচনা করা হয়। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, বিশ্বের অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তুলনামূলক কম জনঘনত্ব বা নিয়ন্ত্রিত নগর বিন্যাসে স্থাপিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি আলাদা, কেননা এখানে জনঘনত্ব বেশি, জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানান্তর ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ধাপে ধাপে গড়ে উঠছে।
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কেমন?
বাংলাদেশের রূপপুরের যে দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হচ্ছে, তার রেফারেন্স প্রকল্প হচ্ছে রাশিয়ার নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই করেনি, বরং এটি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। মাত্র ত্রিশ হাজার মানুষের ওই শহরের রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল এবং বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়নে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সরাসরি বিনিয়োগ করেছে। এই প্ল্যান্টের পরিচালনা নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং নিয়মিত সেফটি রিভিউ করা হয়। কেবল তাই নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা জানার জন্য নির্দিষ্ট মহড়া ও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়। নিয়মিত তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রায় শতভাগ শিক্ষিত মানুষের জন্য এসব উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয়দের আত্মবিশ্বাস অর্জন ও ভীতি দূর করতে। একই উদ্যোগ নেওয়ার কথা রূপপুরের ক্ষেত্রেও।
এখানেই নভোভরোনেজের সঙ্গে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার ওই প্রকল্পে রোসাটম সরাসরি স্থানীয় শহরের সামাজিক অবকাঠামো–স্কুল, হাসপাতাল, পাবলিক স্পেস–উন্নয়নে দৃশ্যমান বিনিয়োগ করেছে, যা জনআস্থা তৈরির একটি কৌশলগত অংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশে জোর দেওয়া হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি নির্বাচন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্ল্যান্ট অপারেশনের ওপর।
অথচ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অনেক মেগা প্রকল্প নির্মাণ শেষ হলেও কেবল স্থানীয়দের অনাস্থার কারণে প্রকল্প চালু করা যায়নি, কিংবা দেরি করতে বাধ্য হয়েছে।
রূপপুরের নিরাপত্তা কাঠামো: কতটা নিরাপদ?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, রূপপুরের নিরাপত্তা নকশা তৈরি করা হয়েছে “defense-in-depth” নীতির ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, একটি ব্যর্থ হলে আরেকটি স্তর সেটিকে প্রতিহত করবে।

মূল নিরাপত্তা স্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে–
১. Reactor Containment Structure: শক্তিশালী ডাবল-ওয়াল কংক্রিট শেল, যা তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়ানো প্রতিরোধ করে;
২. Passive Safety Systems: বিদ্যুৎ বা মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই জরুরি অবস্থায় রিঅ্যাক্টর কুলিং সক্ষমতা
৩. Emergency Core Cooling System: অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
৪. Seismic and External Hazard Protection: ভূমিকম্প, বন্যা ও বিমান দুর্ঘটনা বিবেচনায় ডিজাইন
পরমাণু বিজ্ঞানী শৌকত আকবর বলেন, “VVER-1200 প্রযুক্তি মূলত Generation III+ রিঅ্যাক্টর, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা “fail-safe” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে।”
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও প্রচারের অভাব
যে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। যে প্রকল্প ঘিরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতির স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ; সেই প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয়দের অন্ধকারে রাখার বিষয়টি কতটা গ্রহণযোগ্য? এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘হতাশাজনক’’। তিনি বলেন, ‘‘স্থানীয়দের সচেতন করার প্রধান দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের, কিন্তু তারা এই ১৫ বছরে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছাড়া এত বড় একটি প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করা কঠিন।’’
এই পরমাণু বিজ্ঞানী বলেন, যদি কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের প্ল্যান্টটি ঘুরিয়ে দেখাত এবং এর উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিত, তবে তাদের মধ্যে এই ভীতি থাকত না। প্রকল্পের সফলতার জন্য জনগণের সঠিক তথ্য পাওয়া এবং তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা অপরিহার্য। সঠিক প্রচারের মাধ্যমেই কেবল এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। এখনো সেই সময় শেষ হয়ে যায়নি বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ভৌতিক আতঙ্ক না, রূপপুর আলো ছড়াক
দূর থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঝাপসা কুলিং টাওয়ারগুলো দেখলে মাঝে মাঝে দানব কিংবা রাক্ষসের মতো লাগে পদ্মার ওই পাড়ে কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে। মাঝে মাঝেই তাদের অনেকের কাছে মনে হয় কেন্দ্র থেকে গরম হাওয়া নদী পার হয়ে তাদের গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্র চালু হওয়ার আগে কয়েক মাইল দূরে শরীর ছুঁয়ে যাওয়া গরম হাওয়া আতঙ্কের থেকে সৃষ্ট নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আর এই আতঙ্ক পুরোটাই সৃষ্ট তথ্যের অভাবে।
পরমাণু বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রূপপুর টানা ৬০ বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেবে, এটা বাস্তব। কিন্তু আতঙ্ক নিয়ে ৬০ বছর এই কেন্দ্রের পাশে বসবাস! সেটা অবাস্তব। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখনো শেষ হয়ে যায়নি সময়। আন্তরিকতা থাকলে, আর দ্বায়িত্বশীল হলে এখনো স্থানীয়দের আস্থা অর্জন সম্ভব।

২০১১ সালের পর থেকে মাঝে মাঝেই বাংলাদেশের জনপরিসরে আলোচনায় উঠে আসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেউ কেউ একে মাইলস্টোন প্রকল্প বলে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। কারো আপত্তি আছে বিশাল টাকার অঙ্কে। কারো কারো চিন্তার বিষয় পরিবেশ-প্রতিবেশ।
নানামাত্রিক প্রচার আর অপপ্রচারে সয়লাব হয়ে যায় মূলধারার গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে আসলেই কতটা ঝুঁকি আছে, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব নিয়ে আলাপগুলো ঠিক দিশা দিতে পারে কি?
পদ্মাপাড়ে রূপপুরের চারপাশের মানুষ দানবীয় চার কুলিং টাওয়ার আর দুটি রিঅ্যাক্টর ভবনের অবকাঠামো অবাক বিস্ময়ে দেখেন; তবে বুঝতে পারেন না প্রতিক্রিয়াটি ঠিক কী হবে! বাপ-দাদার আমল থেকে রূপপুরের বিশাল প্রকল্প এলাকা খালি পড়ে থাকতে দেখেছেন তারা। ঘরোয়া আড্ডায় তারা জেনেছেন–এখানে হবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই সময় গণমাধ্যমে দেখেছেন চেরনোবিল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা, দেখেছেন ফুকুশিমাকে ঘিরে জাপানের দুর্ভোগের খবর। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ২০১১ সালে প্রকল্পের শুরু থেকে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু আতঙ্ক থাকলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের প্রতীক পারমাণবিক বিদ্যুৎকে অস্বীকার করেনি পাবনার মানুষ। তৈরি করেনি কোনো প্রতিবন্ধকতা। অথচ, তাদের অজ্ঞতার অন্ধকারে রেখেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে রূপপুর।
সরেজমিনে প্রকল্পের চারপাশের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল, নির্মাণকাজ শুরুর ১৫ বছর পর যখন রূপপুরের রিঅ্যাক্টর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে পা বাড়িয়েছে, তখনো এই আতঙ্ক রয়েই গেছে! এত বড় একটা প্রকল্প ঘিরে এ ধরনের আচরণকে ব্যর্থতা বলতে অবশ্য নারাজ পরমাণু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তারা একে বলছেন ‘অপরাধ’!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয়দের সচেতন করার প্রধান দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের। কিন্তু তারা এই ১৫ বছরে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঈশ্বরদীতে যে তথ্যকেন্দ্রটি রয়েছে, সেটি রাশিয়ার পক্ষ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ এটি কমিশনের নিজস্ব উদ্যোগে হওয়া উচিত ছিল।”
এই অধ্যাপক বলেন, “একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে কমিশনের এই গা-ছাড়া ভাব রীতিমতো ‘অপরাধ’ এবং ‘বিশাল ব্যর্থতা’। কারণ, জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছাড়া এত বড় একটি প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করা কঠিন।”
স্থানীয়দের উদ্বেগ আর আস্থাহীনতার চিত্র
একটি জরিপ অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে ৯ জন স্থানীয় মানুষ মনে করেন, এই কেন্দ্রের কারণে তাদের ফসল নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ক্ষতি বা বিকলাঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ভয়ের প্রধান কারণ, স্থানীয়দের সাথে কর্তৃপক্ষের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকা। এবং তাদের কোনো সঠিক গাইডলাইন বা নির্দেশিকা দেওয়া হয়নি। এমনকি পাশের কুষ্টিয়া অঞ্চলের মানুষ, যারা তেজস্ক্রিয়তার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে, তাদের কাছেও কোনো তথ্য পৌঁছানো হয়নি।

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, রূপপুরের ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী ৬০০ মানুষের মধ্যে পাঁচ সদস্যের এক গবেষণা দলের চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশর প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সরেজমিনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখনো ইট-পাথরের অবকাঠামো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু না হলেও স্থানীয়দের অনেকের দাবি, তাদের গাছের ডাব ছোট হয়ে গেছে, তাপমাত্রা বেড়ে গেছে, পানির স্তর নিচে নেমে গেছে!
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লক্ষ-কোটি টাকার একটা প্রকল্প ঘিরে স্থানীয়দের এমন অনাস্থা বিরল। এই অবস্থা ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বলেও মনে করেন তারা।
জনঘনত্ব ও ঝুঁকি: নিরাপত্তার ভৌগোলিক প্রশ্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ
রূপপুরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্কগুলোর একটি হলো এর জনঘনত্ব প্রেক্ষাপট। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী এলাকায় প্রকল্পটি অবস্থিত, যেখানে আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ রয়েছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সাধারণত বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ৩০-৫০ কিলোমিটার রেডিয়াসের ইমারজেন্সি প্ল্যানিং জোন (ইপিজেড) বিবেচনা করা হয়। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, বিশ্বের অধিকাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তুলনামূলক কম জনঘনত্ব বা নিয়ন্ত্রিত নগর বিন্যাসে স্থাপিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি আলাদা, কেননা এখানে জনঘনত্ব বেশি, জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানান্তর ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ধাপে ধাপে গড়ে উঠছে।
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কেমন?
বাংলাদেশের রূপপুরের যে দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করা হচ্ছে, তার রেফারেন্স প্রকল্প হচ্ছে রাশিয়ার নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। নভভারোনেজ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই করেনি, বরং এটি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। মাত্র ত্রিশ হাজার মানুষের ওই শহরের রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল এবং বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়নে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সরাসরি বিনিয়োগ করেছে। এই প্ল্যান্টের পরিচালনা নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং নিয়মিত সেফটি রিভিউ করা হয়। কেবল তাই নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা জানার জন্য নির্দিষ্ট মহড়া ও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়। নিয়মিত তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রায় শতভাগ শিক্ষিত মানুষের জন্য এসব উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয়দের আত্মবিশ্বাস অর্জন ও ভীতি দূর করতে। একই উদ্যোগ নেওয়ার কথা রূপপুরের ক্ষেত্রেও।
এখানেই নভোভরোনেজের সঙ্গে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার ওই প্রকল্পে রোসাটম সরাসরি স্থানীয় শহরের সামাজিক অবকাঠামো–স্কুল, হাসপাতাল, পাবলিক স্পেস–উন্নয়নে দৃশ্যমান বিনিয়োগ করেছে, যা জনআস্থা তৈরির একটি কৌশলগত অংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশে জোর দেওয়া হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি নির্বাচন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্ল্যান্ট অপারেশনের ওপর।
অথচ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অনেক মেগা প্রকল্প নির্মাণ শেষ হলেও কেবল স্থানীয়দের অনাস্থার কারণে প্রকল্প চালু করা যায়নি, কিংবা দেরি করতে বাধ্য হয়েছে।
রূপপুরের নিরাপত্তা কাঠামো: কতটা নিরাপদ?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, রূপপুরের নিরাপত্তা নকশা তৈরি করা হয়েছে “defense-in-depth” নীতির ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, একটি ব্যর্থ হলে আরেকটি স্তর সেটিকে প্রতিহত করবে।

মূল নিরাপত্তা স্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে–
১. Reactor Containment Structure: শক্তিশালী ডাবল-ওয়াল কংক্রিট শেল, যা তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়ানো প্রতিরোধ করে;
২. Passive Safety Systems: বিদ্যুৎ বা মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই জরুরি অবস্থায় রিঅ্যাক্টর কুলিং সক্ষমতা
৩. Emergency Core Cooling System: অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
৪. Seismic and External Hazard Protection: ভূমিকম্প, বন্যা ও বিমান দুর্ঘটনা বিবেচনায় ডিজাইন
পরমাণু বিজ্ঞানী শৌকত আকবর বলেন, “VVER-1200 প্রযুক্তি মূলত Generation III+ রিঅ্যাক্টর, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা “fail-safe” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে।”
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও প্রচারের অভাব
যে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। যে প্রকল্প ঘিরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতির স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ; সেই প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয়দের অন্ধকারে রাখার বিষয়টি কতটা গ্রহণযোগ্য? এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘হতাশাজনক’’। তিনি বলেন, ‘‘স্থানীয়দের সচেতন করার প্রধান দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের, কিন্তু তারা এই ১৫ বছরে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছাড়া এত বড় একটি প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করা কঠিন।’’
এই পরমাণু বিজ্ঞানী বলেন, যদি কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের প্ল্যান্টটি ঘুরিয়ে দেখাত এবং এর উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিত, তবে তাদের মধ্যে এই ভীতি থাকত না। প্রকল্পের সফলতার জন্য জনগণের সঠিক তথ্য পাওয়া এবং তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা অপরিহার্য। সঠিক প্রচারের মাধ্যমেই কেবল এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। এখনো সেই সময় শেষ হয়ে যায়নি বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ভৌতিক আতঙ্ক না, রূপপুর আলো ছড়াক
দূর থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঝাপসা কুলিং টাওয়ারগুলো দেখলে মাঝে মাঝে দানব কিংবা রাক্ষসের মতো লাগে পদ্মার ওই পাড়ে কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে। মাঝে মাঝেই তাদের অনেকের কাছে মনে হয় কেন্দ্র থেকে গরম হাওয়া নদী পার হয়ে তাদের গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্র চালু হওয়ার আগে কয়েক মাইল দূরে শরীর ছুঁয়ে যাওয়া গরম হাওয়া আতঙ্কের থেকে সৃষ্ট নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আর এই আতঙ্ক পুরোটাই সৃষ্ট তথ্যের অভাবে।
পরমাণু বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রূপপুর টানা ৬০ বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেবে, এটা বাস্তব। কিন্তু আতঙ্ক নিয়ে ৬০ বছর এই কেন্দ্রের পাশে বসবাস! সেটা অবাস্তব। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখনো শেষ হয়ে যায়নি সময়। আন্তরিকতা থাকলে, আর দ্বায়িত্বশীল হলে এখনো স্থানীয়দের আস্থা অর্জন সম্ভব।

নিকো ল্যাঞ্জের মতে, ইরান যুদ্ধের ফলে মার্কিন অস্ত্রাগার কমে যাওয়া ইউরোপের জন্য বড় দ্বিধা তৈরি করেছে। কারণ ইউরোপের পুনরস্ত্রীকরণ এখনও ধীর গতির এবং তারা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক আলোচনায় দ্য ডেইলি স্টারের পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ যে মন্তব্য করেছেন ‘‘গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে’’, তা নিছক হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। এই সংকট কেবল সাংবাদিকতার নয়, গণতন্ত্রেরও। কারণ, বিশ্বাস