কেন পুরুষের বেতন নারীর চেয়ে বেশি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কেন পুরুষের বেতন নারীর চেয়ে বেশি?
প্রতীকী ছবি

মার্কিন লেখক আর্সালা কে. লে গুইনের সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস ‘দ্য লেফট হ্যান্ড অফ ডার্কনেস’-এ ‘উইন্টার’ নামক এক কাল্পনিক গ্রহের কথা বলা হয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা মূলত উভলিঙ্গ। তারা মাসে মাত্র কয়েকদিনের জন্য দৈবচয়ন ভিত্তিতে নারী অথবা পুরুষ যেকোনো একটি লিঙ্গের বৈশিষ্ট্য পায়। লে গুইন লিখেছেন, মানব সভ্যতার চিরন্তন দ্বৈতবাদ যেমন রক্ষক ও রক্ষিত, কিংবা আধিপত্য বিস্তারকারী ও অনুগত এর কোনো অস্তিত্ব উইন্টার গ্রহে নেই। কারণ সেখানকার যেকোনো মানুষই গর্ভধারণ করতে পারেন।

উইন্টার গ্রহের এই সামাজিক কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়, কেন আমাদের পৃথিবীতে পুরুষরা নারীদের তুলনায় বেশি আয় করেন?

সাধারণত মনে করা হয়, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের আধিপত্যকামী স্বভাব বা নারীর নমনীয়তাই এই মজুরি বৈষম্যের কারণ। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৩ সালে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী হার্ভার্ডের অধ্যাপক ক্লডিয়া গোল্ডিন দেখিয়েছেন, এই মজুরি বৈষম্যের সিংহভাগই ব্যাখ্যা করা সম্ভব ‘মাতৃত্ব’ বা সন্তান লালন-পালনের দায়ভার দিয়ে।

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এই বিতর্ক আরও স্পষ্ট হয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর স্বাস্থ্য ও আয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদরা এক অনন্য ‘ন্যাচারাল এক্সপেরিমেন্ট’ পরিচালনা করেন। তারা প্রজনন প্রযুক্তি ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) গ্রহণকারী নারীদের দীর্ঘমেয়াদী আয় পর্যবেক্ষণ করেছেন। দেখা গেছে, মা হওয়ার ১০-১৫ বছর পর আয়ের ব্যবধান অনেকটা কমে এলেও সূচনালগ্নে মায়েদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের কামিল লান্দাই এবং তার সহযোগীরা এই গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। তারা ‘মেয়ার-রোকিটানস্কি-কুস্টার-হাউসার’ (এমআরকেএইচ) সিনড্রোমে আক্রান্ত নারীদের ওপর নজর দেন। এটি এমন একটি বিরল শারীরিক অবস্থা, যেখানে একজন নারী জরায়ু ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেন, অর্থাৎ তিনি সন্তান ধারণে সক্ষম নন।

এই নারীরা জীবনের শুরুতেই জানেন যে তাদের মা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই সচেতনতা তাদের ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে।

বিনিয়োগ: যারা মা হবেন না বলে জানেন, তারা শিক্ষাক্ষেত্রে এবং ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় পুরুষদের মতোই সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করেন।

আয়ের গতিপথ: গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে যখন সাধারণ নারী ও পুরুষের আয়ের ব্যবধান বা ‘ওয়েজ গ্যাপ’ দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন এমআরকেএইচ আক্রান্ত নারীদের আয়ের গ্রাফ পুরুষদের প্রায় সমান থাকে।

সহজ কথায়, মাতৃত্ব এবং মা হওয়ার প্রত্যাশায় নারীরা ক্যারিয়ার নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেন এই দুটি বিষয়কে যদি সমীকরণ থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে নারী-পুরুষের আয়ের ব্যবধান প্রায় থাকে না বললেই চলে। সন্তান ধারণের প্রভাবকে আলাদা করে আয়ের ওপর তার প্রভাব বোঝার জন্য এর চেয়ে বাস্তবসম্মত প্রমাণ এই গ্রহে অন্তত আর নেই।

পরিশেষে বলা যায়, মজুরি বৈষম্যের এই সংকট যতটা না লিঙ্গভিত্তিক, তার চেয়ে বেশি ‘প্যারেন্টহুড পেনাল্টি’ বা মাতৃত্বকালীন সীমাবদ্ধতার ফল। আধুনিক শ্রমবাজার এখনো এমনভাবে নকশা করা, যেখানে দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করা এবং কর্মক্ষেত্রে সবসময় উপস্থিত থাকাকেই সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হয়। সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের প্রাকৃতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে নারীরা এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।

তবে আশার কথা হলো, উইন্টার গ্রহের কল্পকাহিনী আমাদের এক নতুন বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। যদি সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো এমন হয় যেখানে সন্তান লালন-পালন কেবল নারীর একার দায় নয়, বরং যৌথ দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হবে তবেই এই আয়ের ব্যবধান ঘোচানো সম্ভব। কর্মক্ষেত্রে নমনীয় সময়সূচী এবং পিতৃত্বকালীন ছুটির মতো সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করলে হয়তো একদিন আমাদের পৃথিবীর নারীরাও উইন্টার গ্রহের বাসিন্দাদের মতো সমান অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবেন। তখন বেতন নির্ধারণে লিঙ্গ নয়, বরং দক্ষতাই হবে একমাত্র পরিচয়।

সম্পর্কিত