Advertisement Banner

যুক্তরাষ্ট্রের সামনেই কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে ইরান-রাশিয়া রমরমা বাণিজ্য

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামনেই কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে ইরান-রাশিয়া রমরমা বাণিজ্য
আমেরিকা-ইরানের পতাকা। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত কাস্পিয়ান সাগর বর্তমানে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাণিজ্য পথে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন কঠোর নৌ-অবরোধ এবং যুদ্ধের এই সংকটকালে ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতা জোগাতে জলপথটি লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। গত ৯ মে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় নিকোলাস কুলিশ, নিল ম্যাকফারকুহার এবং জুলিয়ান ই. বার্নসের বিশ্লেষণধর্মী এই তথ্য উঠে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মার্চ মাসে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের বন্দর আনজালি-তে অবস্থিত নৌ-কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছিল। এই হামলাটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বন্দর আনজালি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগরে নয়, বরং তার থেকে শত শত মাইল উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত। ইসরায়েল এই হামলাকে অত্যন্ত সফল হিসেবে দাবি করলেও, এই ঘটনাটি বিশ্বের সামনে কাস্পিয়ান সাগরের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে উন্মোচিত করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা দুই মিত্র দেশ রাশিয়া এবং ইরান এই জলপথটিকে এখন তাদের প্রকাশ্য এবং গোপন বাণিজ্যের প্রধান করিডোর হিসেবে ব্যবহার করছে। এই করিডোরের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে ইরানকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার রসদ জোগাচ্ছে রাশিয়া।

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ পাঠাচ্ছে। সম্প্রতি যুদ্ধের ফলে ইরানের ড্রোন ভাণ্ডারের প্রায় ৬০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও রাশিয়ার এই সহায়তার ফলে তেহরান দ্রুত তাদের আক্রমণ ক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারছে। বিষয়টি কেবল সামরিক সাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশে মার্কিন নৌবাহিনী বর্তমানে পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরোধ করে রেখেছে, যার ফলে ইরানের বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে ইরান এখন রাশিয়ার সাহায্য নিতে কাস্পিয়ান সাগরকে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইরানের খাদ্য শিল্প সমিতির প্রধান মোহাম্মদ রেজা মোর্তজাভি দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবিকে জানিয়েছেন যে, গমের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী আমদানির জন্য ইরানের উত্তরের চারটি বন্দর এখন দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, আগে রাশিয়া থেকে যে ২ মিলিয়ন টন গম কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইরানে আসত, ইউক্রেনের হামলার আশঙ্কায় তা এখন কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। রুশ বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে কাস্পিয়ান রুটটি রাশিয়ার রপ্তানিকারকদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এবং চলতি বছরে এই পথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে।

কাস্পিয়ান সাগরের ভৌগোলিক অবস্থান একে নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে বাঁচার এক আদর্শ স্থানে পরিণত করেছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ এবং এর কোনো উন্মুক্ত সমুদ্রপথ নেই। ফলে, পারস্য উপসাগরের মতো এখানে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই কোনো জাহাজ আটক বা তল্লাশি করতে পারে না। কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত পাঁচটি দেশ– রাশিয়া, ইরান, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান ছাড়া অন্য কোনো দেশের এখানে সরাসরি প্রবেশাধিকার নেই।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো-এর অধ্যাপক নিকোল গ্রাজিউস্কি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর এবং নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার জন্য কাস্পিয়ান সাগর হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা। উপরন্তু, এই পথে চলাচলকারী জাহাজগুলো প্রায়ই তাদের ট্রান্সপন্ডার বা স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রাখে, যাকে ‘ডার্ক শিপিং’ বলা হয়। ফলে দূর থেকে এই বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও ইরান ও রাশিয়া খাদ্য বাণিজ্যের বিষয়টি প্রকাশ্যেই স্বীকার করে। তবে অস্ত্র বা সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এখন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। পূর্বে ইরান রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ড্রোন সরবরাহ করলেও, এখন রাশিয়া সেই ড্রোনের উন্নত সংস্করণ বা যন্ত্রাংশ ইরানে পাঠাচ্ছে। এমনকি রাশিয়ায় ইরানের লাইসেন্সে ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপিত হওয়ায় ইরানের ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা কমেছে, বরং রাশিয়া এখন ইরানকে প্রযুক্তির দিক থেকে সাহায্য করছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ব্যাপক ভিত্তিক সহযোগিতা চুক্তি এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, দুই দেশ এখন কেবল পণ্য বিনিময় নয়, বরং সামরিক কৌশল এবং প্রযুক্তিরও ভাগাভাগি করছে। তবে এই সহযোগিতা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পুতিন ইরানকে সমর্থন করতে চাইলেও সরাসরি বিশাল সামরিক সহায়তা পাঠিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কিংবা রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের অংশীদার আরব দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করতে চান না।

অন্যদিকে, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে কাস্পিয়ান সাগর দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ভূ-রাজনৈতিক ব্ল্যাক হোল’ বা অন্ধবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে। হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো লুক কফি মনে করেন, মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক কাঠামোতে কাস্পিয়ান সাগরকে গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়নি। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তিনটি আলাদা ব্যুরো এবং পেন্টাগনের দুটি আলাদা কমান্ড (ইউরোপীয় ও সেন্ট্রাল কমান্ড) এই অঞ্চলের দেশগুলোর দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ায় কাস্পিয়ান অঞ্চলে একটি সমন্বিত মার্কিন নীতির অভাব দেখা যায়। এই কূটনৈতিক ফাঁকটিকেই ইরান ও রাশিয়া তাদের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে গড়ে তোলা এই বাণিজ্য করিডোরটি রাশিয়ার বাল্টিক সাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মহাপরিকল্পনার অংশ, যা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য পথগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হচ্ছে। যদিও এই প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণে বিশাল সম্পদের প্রয়োজন এবং কাস্পিয়ান সাগরের নাব্যতার সংকট একটি বড় বাধা। তবুও যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আনা বোরশেভস্কায়া মনে করেন, ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের বন্দর আনজালি-তে বোমা হামলার প্রধান কারণই ছিল এই গোপন বাণিজ্য পথটির গুরুত্ব বুঝতে পারা। ইসরায়েলিরা বুঝতে পেরেছে যে, এই ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটটির মাধ্যমেই রাশিয়া ইরানকে টিকে থাকার রসদ এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারছে। যদিও কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে পরিচালিত এই বাণিজ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে হওয়া বিশাল তেল বাণিজ্যের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে দিতে পারবে না, তবুও এটি ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করছে।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয় যে, কাস্পিয়ান সাগর এখন আর কেবল একটি ভূমিবেষ্টিত জলভাগ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে যা ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশের টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সম্পর্কিত