যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পারমাণবিক আলোচনা আপাতত ভালোই এগোচ্ছে–অন্তত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ধারাবাহিক জনসম্মুখে দেওয়া বক্তব্য থেকে তেমনটাই বোঝা যায়। তারপরেও যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে ও ইরানের চারপাশে সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে যে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে রেখেই যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে হামলা চালাতে পারে। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জোরালো ও স্বল্পমেয়াদী হামলার মাধ্যমে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নতজানু করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। সেটা হলে যেকোনো চুক্তিতে সই তেহেরানকে সই করাতে পারবে তারা। আর এর সবটারই মূল লক্ষ্য ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দফার আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয় তারা একটি চুক্তি করতে চায়।” ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচাই আলোচনার ‘নির্দেশক নীতিমালা’ নিয়ে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন।
এর আগে এ মাসের শুরুতে ওমানে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক আলোচনায় একই ধরনের আশাবাদ দেখা গিয়েছিল।
কিন্তু দুই দশক ধরে অস্ত্র বিস্তার রোধ (nonproliferation) ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টে পারমাণবিক কূটনীতিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, এমন পরিস্থিতি আমরা আগেও দেখেছি।
২০২৫ সালের বসন্তেও আশাবাদ ছিল। তখন পাঁচ দফা পরোক্ষ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের বৃহত্তর সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে বোমা হামলা চালায়। উল্লেখ্য, ইরান ফেব্রুয়ারিতে বলেছিল, সেই হামলার ফলে সৃষ্ট অবিশ্বাসের আবহ এখনকার আলোচনার ওপরও ছায়া ফেলছে।
বর্তমান হতাশার আরেকটি কারণ হলো: আলোচনার পটভূমিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ, যার মধ্যে সরাসরি গোলাবর্ষণ মহড়ার জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করাও রয়েছে।
রেড লাইন
তবে শুধু অবিশ্বাস কাটালেই হবে না। ২০১৮ সালের ৮ মে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন যখন ওবামা আমলের ইরানের সাথে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে– সেই সময় থেকে দুই দেশের অবস্থান আরও কঠোর হয়ে গেছে।
ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে অনিচ্ছুক। এটি তাদের জন্য স্পষ্ট ‘রেড লাইন’।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায়, পারমাণবিক আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং ২০১৫ সালের চুক্তিতে অনুমোদিত বেসামরিক স্তরের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ সব ধরনের সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা অন্তর্ভুক্ত হোক।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন তথাকথিত ‘অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ যুগ’-এর অবসান ঘটছে। ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকা নিউ স্ট্যাট্র (New START) চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ও অবস্থান সীমিত রাখত এবং শক্তিশালী যাচাইকরণ ব্যবস্থা বজায় রাখত। এর মেয়াদ শেষ হওয়া এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি, কূটনীতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সামরিক চাপের কৌশল
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য আশাবাদ কেন? ট্রাম্প মনে করেন, তার প্রথম মেয়াদের তুলনায় এখন ইরান দুর্বল অবস্থানে আছে। ইসরায়েলের সফল হামলায় ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলো এবং ইরান নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরানের সমর্থিত দুই প্রধান গোষ্ঠী– হামাস ও হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি অভিযানের ফলে দুর্বল হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’-এ ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো নিজেকে শক্ত অবস্থানে মনে করছে। এই হামলা হয় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, যেখানে বলা হয়েছিল, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রমানের কাছাকাছি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এর পাশাপাশি, ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের ঘটনাও আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
জানুয়ারিতে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইরানের উপকূলের কাছে মোতায়েন করা হয়, যা প্রতিবাদকারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, সফল আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরেও বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। যেমন ‘নিজ দেশের জনগণের প্রতি আচরণ’।
ট্রাম্প সামরিক বিকল্প খোলা রেখেছেন এবং সতর্ক করেছেন এই বলে যে, “তারা যদি চুক্তি না করে, পরিণতি খুবই কঠোর হবে।” তবে ওয়াশিংটন হয়তো তার অবস্থানকে অতিমূল্যায়ন করছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করলেও যে জুনের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘ধ্বংস’ হয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে– ইরান তার কর্মসূচি পুনরুদ্ধারের কাজ করছে। গাজা ও লেবাননে ছায়া যোদ্ধারা দুর্বল হলেও, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া– যেমন কাতায়েব হিজবুল্লাহ যুদ্ধ প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। হুথি বিদ্রোহীরাও যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসার হুমকি দিয়েছে।
এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রতি তাদের অঙ্গীকার আগের চেয়ে শক্তিশালী, এবং অপারেশন রাইজিং লায়নের পর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর বড় অংশ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
২০১৫ সালের চুক্তিতে ফেরা সম্ভব নয়
ইরান বলছে, আলোচনা কেবল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বেসামরিক উদ্দেশ্য নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক প্রক্সি বা মানবাধিকার প্রশ্ন আলোচ্য নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই মতপার্থক্যই বাইডেন প্রশাসনের সময় ২০১৫ সালের চুক্তি পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে। চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) চুক্তি অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করবে এবং বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি ইস্যু এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
চুক্তির পক্ষগুলো মনে করেছিল- কোনো চুক্তি না থাকার চেয়ে একটি সীমিত চুক্তি ভালো। কিন্তু ২০২২ সালে ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার নজরদারি ব্যবস্থা সরিয়ে দেয় এবং অস্ত্রমানের কাছাকাছি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। ফলে সেই সুযোগের জানালা বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে ইরান কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে একটি পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে–২০১৫ সালের চুক্তির সময় যা এক বছরের বেশি লাগত।
আজকের আলোচনা
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরান এখনো বোমা তৈরির পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করেনি। তবে তাদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২০১৫ সালের চুক্তিতে ফেরার মূল্য কমিয়ে দিয়েছে। জ্ঞানকে আবার ‘প্যান্ডোরার বাক্সে’ ভরা যায় না। তবে আলোচনার উদ্দেশ্য সবসময় চূড়ান্ত চুক্তি নাও হতে পারে।
সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আলোচনা দুই পক্ষকে সংঘাতের কিনারা থেকে সরিয়ে আনতে, আস্থা গড়তে এবং সম্পর্ক উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। এতে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে। ইরান অর্থনৈতিকভাবে, আর যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সময়সীমা বাড়িয়ে।
কিছুই নিশ্চিত নয়
২০০৯ সালে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছয় বছর ধরে চলা আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল। তার ফল, আরও অস্থিতিশীল পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নতুন আগ্রহ। একই ধরনের অবস্থা এখানেও দেখা যাচ্ছে। সময় যত যাচ্ছে, চুক্তির সম্ভাবনা তত কঠিন হচ্ছে।
সামরিক উত্তেজনা হয়তো ইরানকে আপসে রাজি করাতে পারে। অথবা উল্টোভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবু, আলোচনা ব্যর্থ হলেও উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখাটি দ্য কনভারসেশনে-র সৌজন্যে প্রকাশিত)