দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ভারত কি ফেরত দেবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ভারত কি ফেরত দেবে?
শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।

৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি ওঠে।

নতুন বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনমন ঘটে। এমনকি দুই দেশের পতাকা অবমাননার মতো ঘটনাও ঘটে। সঙ্গে ছিল সংবাদমাধ্যমে প্রচার-পাল্টাপ্রচার।

দুই দেশের সরকার তরফেও পাল্টাপাল্টি কথা চালাচালি হয়েছে।

এই সবকিছুর মধ্যে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার বিষয়টি।

এরই সূত্র ধরে ভারত-বাংলাদেশ বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়টি সামনে এসেছে।

কী আছে?

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে নোট ভারবাল পাঠায়। সে সময় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস ভারতের সঙ্গে থাকা বাংলাদেশের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি ও এ সম্পর্কিত আইনি বিধান ও বাধ্যবাধকতা ব্যাখ্যা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে এ চুক্তি সই হয়, যা ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়। এ চুক্তি দুই দেশের মধ্যে পলাতক আসামিদের দ্রুত এবং সহজে বিনিময়ের জন্য করা হয়েছে।

ঢাকা এই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বিচারের সম্মুখীন করতে ফেরত চায়। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা হয়েছে। মোট পাঁচটি অভিযোগে চলা একটি মামলার রায় আজ ঘোষণা হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে দুটিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

এই চুক্তি অনুযায়ী, ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের মামলা’য় অভিযুক্ত বা ফেরার আসামি ও বন্দিদের একে অপরের কাছে হস্তান্তর করবে ভারত ও বাংলাদেশ।

চুক্তির ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারত শুধু সেসব ব্যক্তিদেরই নিজ ভূখণ্ড থেকে প্রত্যর্পণ করবে না যারা প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ (বাংলাদেশ ও ভারতের আইনের অধীনে কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ) করার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এটি সেসব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের আদালতে দোষী প্রমাণিত না হলেও হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা যেতে পারে। অপরাধের জন্য তাকে অভিযুক্ত করাই ভারত থেকে তার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য যথেষ্ট।

এ ছাড়া, ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির ১০ (৩) অনুচ্ছেদের অধীনে, বন্দিকে প্রত্যর্পণের জন্য আবেদনকারী রাষ্ট্রের পক্ষে যথাযথ কর্তৃপক্ষের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পেশ করাই যথেষ্ট। যে রাষ্ট্রকে অনুরোধ করা হয়েছে, তাকে সংঘটিত অপরাধের প্রমাণ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। চুক্তিতে ২০১৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান রাখা হয়। মূল চুক্তিতে অনুরোধকারী রাষ্ট্রকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ প্রমাণ অনুরোধকৃত রাষ্ট্রকে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণকে দ্রুততর ও সহজ করতে ২০১৬ সালের সংশোধনীতে অপরাধের প্রমাণ দেওয়ার বিধান বাদ দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের অনুরোধে হাসিনাকে ফেরত দিতে আইনিভাবে বাধ্য ভারত। তবে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না বলে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। যেমন ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কারো অপরাধ যদি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়-তবে তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ খারিজ করতে পারবে অনুরোধ পাওয়া রাষ্ট্র। ১৯৬২ সনের প্রত্যর্পণ আইনের ৩১ (১) ধারায়ও এই রাজনৈতিক ব্যতিক্রমের বিধান রয়েছে। তাহলে ভারত কি এই বিধানের ওপর নির্ভর করে হাসিনাকে ফেরত দেওয়া অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পাচ্ছে? উত্তর হলো, না, কারণ চুক্তির ৬ (২) অনুচ্ছেদে, এ ধরনের ব্যতিক্রমের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে হত্যা এবং অন্যান্য অপরাধকে বাদ দেওয়া হয়েছে-যেগুলো আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে নয়।

চুক্তির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যদি অপরাধের জন্য যে দেশে তিনি অবস্থান করছেন সেখানে বিচার করা হয়, তাহলেও তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ খারিজ করা যেতে পারে। তবে এই বিধানটি শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, কারণ ভারতীয় আদালতে তিনি কোনো ধরনের বিচারের সম্মুখীন হবেন- এমনটা দেখানো যাচ্ছে না।

তৃতীয়ত চুক্তির অনুচ্ছেদ ৮ (১) (ক) (iii) এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা যাবে না যদি ‘তিনি অনুরোধকৃত রাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হন যে এসব প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও তাকে প্রত্যর্পণ করা অন্যায্য বা নিপীড়নমূলক হবে’ কারণ ‘তার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে অভিযোগ আনীত হয়নি।’ ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনের ২৯ ধারায় একই নীতি প্রতিফলিত হয়েছে। এই বিধানটি শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করতে পারে নয়াদিল্লি।

হাসিনা যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন সেই প্রেক্ষাপট, এবং তার রাজনৈতিক বিরোধীদের দ্বারা বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে–এ কথা জানিয়ে ভারত বলতে পারে, ফেরত পাঠানো হলে তার (হাসিনার) ন্যায়বিচার না পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, রাজনৈতিক বিরোধীরা এই বিচারের মাধ্যমে ‘বদলা’ চাইছে। বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক শত্রুতা ও অভিসন্ধি কাজ করছে–এমন কথা উল্লেখ করে নয়াদিল্লি দাবি করতে পারে, এই অবস্থায় হাসিনাকে প্রত্যর্পণ হবে অন্যায্য ও পীড়নমূলক।

সঙ্গতকারণেই, আইনি এ যুক্তিতে সন্তুষ্ট হবে না বাংলাদেশের সরকার। কারণ, তারা স্বৈরাচারী শাসক হাসিনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দরকার বলে মনে করেন। কিন্তু, এক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কোনো বাধ্যতামূলক বিচার ব্যবস্থার ব্যবস্থা না থাকায়-উভয়পক্ষই ৮ (১) (ক) (iii) অনুচ্ছেদের আইনি ব্যাখ্যায় অটল থাকতে পারে, যেহেতু কোনো পক্ষের ব্যাখ্যা সঠিক, তা নির্ধারণে বিরোধ নিষ্পত্তিকারী কোনো সংস্থাও নেই।

ভারতের আরেকটি আইনি উপায় রয়েছে, যা খুবই কঠোর। চুক্তির অনুচ্ছেদ ২১ (৩) এর অধীনে যেকোনো সময় এই চুক্তিটি বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ভারতকে। চুক্তি বাতিলের নোটিশ প্রদানের ছয় মাসের মধ্যেই এটি অকার্যকর হয়ে যাবে। চুক্তিতে এমন কিছুই বলা হয়নি, যার আওতায় এটি বাতিলের আগে পাওয়া অনুরোধ বাতিলের পরেও মানতে হবে।

হাসিনাকে ভারত কতটা মূল্যবান মনে করে তার ওপরই নির্ভর করছে-নয়াদিল্লি বাতিলের উপায়টি গ্রহণ করবে কি না। হাসিনা ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তাই নয়াদিল্লি এভাবেও তার পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু, চুক্তি বাতিল হলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা চরম রূপ নেবে-যা আঞ্চলিক, ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এই মুহূর্তে যা ভারতের জন্য আরও সমস্যার সৃষ্টি করবে।

সম্পর্কিত