আজ ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। আজকের দিনটি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হয়ে থাকতে পারে। আজই আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়াদ শেষ হচ্ছে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির। গত ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম বিশ্বের দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়া এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগারের ওপর কোনো আইনি সীমাবদ্ধতা নেই।
বিশ্ব কি তবে সেই স্নায়ুযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছে? যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, নিউ স্টার্ট চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল ‘পারস্পরিক ভারসাম্য’। ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল, রাশিয়া ও আমেরিকা প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০টির বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারবে না। অর্থাৎ, পরমাণু অস্ত্রেরও একটা সীমা রাখা হয়েছিল।
স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্যেও মস্কো ও ওয়াশিংটন এই একটি বিষয়ে একমত ছিল। আর তা হলো, পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে অনিয়ন্ত্রিত হতে দেওয়া যাবে না। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের পারমাণবিক ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করার সুযোগ পেত।
অর্থাৎ, কেউ লুকিয়ে কোনো অস্ত্র বানাচ্ছে কি না, তা সরাসরি দেখার অধিকার ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই পরিদর্শনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আরও ১২ মাসের জন্য বর্তমান শর্তগুলো মেনে চলতে, যাতে নতুন চুক্তির জন্য সময় পাওয়া যায়।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া দেয়নি। আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এই সময়ের সুযোগ নিয়ে তাদের নতুন কিছু ভয়ঙ্কর অস্ত্র তৈরি করছে। যেমন ‘ব্যুরভেস্টনিক’ ক্রুজ মিসাইল এবং ‘পসাইদন’ টর্পেডো, যা নিউ স্টার্ট চুক্তির আওতার বাইরে।
এ ব্যাপারে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে বলেন, “উত্তর না পাওয়াটাও এক ধরনের উত্তর।” তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বিশ্বে সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের হাতে কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকার যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে যাচ্ছে, তার জন্য মস্কো তৈরি।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন মনে করছে, রাশিয়া যদি পরিদর্শন বা ইন্সপেকশন করতে না দেয়, তবে কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। তাই তারা চুক্তিতে আসছে না।
তবে সংকট আরও জটিল। কারণ, এতে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে চীনের নাম জড়িয়ে আছে। বর্তমানে রাশিয়ার হাতে ওয়ারহেড আছে ৫ হাজার ৪৫৯টি এবং আমেরিকার হাতে ৫ হাজার ১৭৭টি। কিন্তু চীন এখন দ্রুত তাদের পারমাণবিক শক্তি বাড়াচ্ছে। বর্তমানে তাদের কাছে ৬০০টি ওয়ারহেড আছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছে পেন্টাগন।
ট্রাম্প প্রশাসন চায় নতুন যেকোনো চুক্তি হতে হবে ত্রিপক্ষীয়–রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে নিয়ে। কিন্তু বেইজিং সরাসরি বলে দিয়েছে, তাদের অস্ত্রাগার অনেক ছোট। তাই এখনই এই আলোচনায় বসার কোনো মানে হয় না। এই ত্রিভুজ সম্পর্কের টানাপোড়েনে আজ ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি মৃতপ্রায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, প্রবীণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রক নিকোলাই সোকভ একটি ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন। বর্তমানে কেবল মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি জরুরি হটলাইন আছে। কিন্তু ন্যাটোর সদর দপ্তর কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো রাজধানীর সঙ্গে রাশিয়ার কোনো সরাসরি জরুরি যোগাযোগের লাইন নেই।
যদি ভুলবশত কোনো মিসাইল ফায়ার হয়, তবে সেই ভুল শুধরে নেওয়ার মতো সময় বা সুযোগ কোনোটিই থাকবে না। এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত, পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো এবং বড় দেশগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।
নিউ স্টার্ট চুক্তি কেবল একটি কাগজ ছিল না, এটি ছিল এক প্রকার নিরাপত্তা কবজ। আজকের তারিখটি যদি বিশ্বনেতারা আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসার দিন হিসেবে বেছে নেন, তবে মানবজাতি এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে পা বাড়াবে। যেখানে বিজয়ী কেউ থাকবে না, থাকবে শুধু ধ্বংসস্তূপ।