ইউয়ান ধীরে ধীরে এমন এক বিকল্পে পরিণত হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের অনিশ্চিত ব্যবস্থাপনায় উদ্বিগ্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে কিছুটা স্বস্তির উৎস হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
চরচা ডেস্ক

মানুষ যখন কোনো কারণে খুব ঝামেলায় থাকে বা মানসিক অস্বস্তিতে ভোগেন, তখন ‘কমফোর্ট ফুড’ খেয়ে একটুখানি স্বস্তি খোঁজে। অর্থনীতিতে এই কাজটা করে বিকল্প মুদ্রা। বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন চাপ তৈরি হয়, তখন কিছু দেশের জন্য ভরসা হয়ে ওঠে বিকল্প মুদ্রা।
সম্প্রতি হংকংয়ের একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়ার পর বিল পরিশোধ করতে দেখা যায় হংকং ডলার বা চীনের মুদ্রা ইউয়ানে। এমনকি চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যু করা ডিজিটাল মুদ্রাও নেওয়া হয়। যদিও এর ব্যবহার খুব কমই করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে ইউয়ানের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে দেশটির সরকার। আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহী। যদিও অগ্রগতি ছিল অসম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন নিজস্ব প্রচলিত ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, যা ডলারনির্ভর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণগ্রহীতার ঘাটতির কারণে বিদেশি অংশীদারদের তুলনামূলক কম সুদে অর্থায়নের সুযোগও দিচ্ছে বেইজিং।
সীমান্তের বাইরে ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ‘এমব্রিজ’ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন স্টান্ডার্ড চার্টার্ডে ব্যাংকের কর্মকর্তা কারেন এনজি
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং বলেছেন, দেশের একটি ‘শক্তিশালী’ মুদ্রা থাকা প্রয়োজন। যদিও ইউয়ান এখনো সেই অবস্থানে পৌঁছায়নি। তবে এটি ধীরে ধীরে এমন এক বিকল্পে পরিণত হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের অনিশ্চিত ব্যবস্থাপনায় উদ্বিগ্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে কিছুটা স্বস্তির উৎস হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের থিংক-ট্যাংকের আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ডিরেক্টর জোশ লিপস্কি জানিয়েছেন, ইউয়ানকে বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চীন অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে আগেভাগেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী বক্তব্য দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে শুরু করেছে।

জোশ লিপস্কির ভাষ্য, গত ছয়-সাত সপ্তাহে বিশ্ব বাজারে ইউয়ান ব্যবহারের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। চীনের বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামো ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)-এ লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯২০ বিলিয়ন ইউয়ান (১৩৪ বিলিয়ন ডলার) লেনদেন হয়েছে, যেখানে গত বছরের দৈনিক গড় ছিল ৬৮০ বিলিয়ন ইউয়ান। ২ এপ্রিল এই অঙ্ক ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়।
চীনা ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চে সীমান্তের বাইরের বন্ড, শেয়ার ও অন্যান্য পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১২ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের গড়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি।
এই পরিবর্তনের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট নয়। ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হওয়া নতুন কিছু বিধি সিআইপিএসকে আরও নমনীয় করেছে। তবে সময়কাল বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লিপস্কির মতে, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সংকটকালীন সময়ের সঙ্গে সরাসরি মিলছে, যা কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এনজির ভাষ্য, এসব লেনদেন অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়, কখনো ৭ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ডলারনির্ভর বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থার তুলনায় চীনের বিকল্প প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো অনেক ছোট পরিসরের। সিআইপিএস ও এমব্রিজ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিপস বা সিএইচআইপিএস নেটওয়ার্কের তুলনায় পিছিয়ে। ২০২৫ সালে সিএইচআইপিস প্রতিদিন ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক ব্যাংক মেসেজিং নেটওয়ার্ক সুইফটে ১১ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলেও সিআইপিএসে রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৯১টি।
তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের জেরে রুশ ব্যাংকগুলোকে সুইফট থেকে বহিষ্কারের পর অনেক দেশ বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করে। ব্যাংকারদের মতে, একক প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ইউয়ান ব্যবহারের প্রস্তুতি নিয়েছিল। ইরান সংকট সেই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিশ্ববাজারে ইউয়ানের আরেকটি আকর্ষণ হলো এর নিম্ন সুদের হার। চীনে কম ঋণগ্রহণ ও ভোগব্যয়ের কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদহার কমিয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দুই শতাংশেরও বেশি কম। পাশাপাশি মূল্যপতনের (ডিফ্লেশন) আশঙ্কা দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফাও কমিয়ে দিয়েছে।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে বিদেশি সরকার ও কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসছে। কেউ চীনের মূল ভূখণ্ডে ইউয়ানভিত্তিক ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যু করছে, আবার কেউ হংকংয়ে ‘ডিম সাম বন্ড’ বিক্রি করছে। উদাহরণ হিসেবে, ইন্দোনেশিয়া সরকার ফেব্রুয়ারিতে হংকংয়ে ৯ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি সংগ্রহ করেছে। চলতি মাসে পর্তুগাল ইউরোজোনের প্রথম দেশ হিসেবে ডিম সাম বন্ড ইস্যু করে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহ করেছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই তাদের তেলের বিনিময়ে ইউয়ানে অর্থ গ্রহণে আগ্রহী, যার বড় অংশ চীনের স্বাধীন ‘টিপট’ রিফাইনারিগুলোতে সরবরাহ করা হয়। যদিও রপ্তানির পরিমাণ কমেছে, তবে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আয় বেড়েছে। পাশাপাশি ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়েও ইরান ইউয়ান গ্রহণ করছে।
চলতি মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বৈঠকে উপস্থিত আর্থিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে একটি মতৈক্য দেখা গেছে। তারা জানিয়েছে, তেহরানের এই আয়ের বেশিরভাগই ক্রিপ্টোকারেন্সির পরিবর্তে ইউয়ানে হচ্ছে। তবে সিআইপিএসে লেনদেন বাড়ার পরিমাণ এত বেশি যে, শুধু তেল ও প্রণালির আয় দিয়ে তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কিছু মূলধন স্থানান্তরও থাকতে পারে, যার একটি অংশ চীনা বিনিয়োগ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতাও এতে ভূমিকা রেখেছে।

চীনা ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চে সীমান্তের বাইরের বন্ড, শেয়ার ও অন্যান্য পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১২ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের গড়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এসব লেনদেনের সবগুলো ইউয়ানে নিষ্পত্তি না হলেও, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সেবা ও সম্পদ লেনদেন মিলিয়ে চীনের মোট বৈদেশিক লেনদেনে ইউয়ানের অংশ মার্চে ৫৬ শতাংশের বেশি হয়েছে।
আবার সিআইপিএস ছাড়াও অন্যান্য পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মেও লেনদেন বাড়ছে। সীমান্তের বাইরে ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ‘এমব্রিজ’ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন স্টান্ডার্ড চার্টার্ডে ব্যাংকের কর্মকর্তা কারেন এনজি। গত নভেম্বর পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মে ৪ হাজার ৪৭টি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ৫৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ স্থানান্তর হয়েছে। সৌদি আরব, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতে যুক্ত থাকলেও ৯৫ শতাংশের বেশি লেনদেন হয়েছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যু করা ডিজিটাল মুদ্রা ই-সিএনওয়াইতে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, শুধু সরকার নয়, লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থানের হেজ ফান্ডগুলোকেও (এক ধরনের বিকল্প বিনিয়োগ পদ্ধতি) নতুন অর্থায়ন মুদ্রা খুঁজতে হচ্ছে। ফরাসি ব্যাংক নাটিকসিসের এর বিশ্লেষকদের মতে, জাপানি ইয়েন দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে চীনের সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ভাবছে, তাদের ক্রেতা ও সরবরাহকারীরা যে মুদ্রা ব্যবহার করে, সেই ইউয়ানেই ঋণ নেওয়া উচিত কি না।

হংকংয়ের মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষ বিদেশি কোম্পানিগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে ২০০ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি তহবিল গঠন করেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো ব্যাংকগুলো এই অর্থ হংকংয়ের বাইরে তাদের শাখাগুলোতেও ছড়িয়ে দিতে পারছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ভূমিকা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। সুইফটের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে বৈশ্বিক বাণিজ্য অর্থায়নের ৮ শতাংশের বেশি ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে, যদিও ৮০ শতাংশের বেশি নিয়ে ডলার এখনো শীর্ষে রয়েছে।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ঝৌ শিয়াওচুয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তারের জন্য ইউয়ানের এখন একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই মত দিয়েছে চীনা মার্চেন্ট সিকিউরিটিস। তারা এটিকে মুদ্রাটির জন্য ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে দেখছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে। তবুও ইউয়ানকে ডলারের সমকক্ষ হতে হবে না, বিকল্প হিসেবে উপস্থিত থাকলেই তা ডলারের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে। ফলে যারা ডলারের আধিপত্যে অস্বস্তি বোধ করছে, তাদের জন্য ইউয়ান একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।

মানুষ যখন কোনো কারণে খুব ঝামেলায় থাকে বা মানসিক অস্বস্তিতে ভোগেন, তখন ‘কমফোর্ট ফুড’ খেয়ে একটুখানি স্বস্তি খোঁজে। অর্থনীতিতে এই কাজটা করে বিকল্প মুদ্রা। বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন চাপ তৈরি হয়, তখন কিছু দেশের জন্য ভরসা হয়ে ওঠে বিকল্প মুদ্রা।
সম্প্রতি হংকংয়ের একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়ার পর বিল পরিশোধ করতে দেখা যায় হংকং ডলার বা চীনের মুদ্রা ইউয়ানে। এমনকি চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যু করা ডিজিটাল মুদ্রাও নেওয়া হয়। যদিও এর ব্যবহার খুব কমই করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে ইউয়ানের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে দেশটির সরকার। আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহী। যদিও অগ্রগতি ছিল অসম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন নিজস্ব প্রচলিত ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, যা ডলারনির্ভর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণগ্রহীতার ঘাটতির কারণে বিদেশি অংশীদারদের তুলনামূলক কম সুদে অর্থায়নের সুযোগও দিচ্ছে বেইজিং।
সীমান্তের বাইরে ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ‘এমব্রিজ’ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন স্টান্ডার্ড চার্টার্ডে ব্যাংকের কর্মকর্তা কারেন এনজি
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং বলেছেন, দেশের একটি ‘শক্তিশালী’ মুদ্রা থাকা প্রয়োজন। যদিও ইউয়ান এখনো সেই অবস্থানে পৌঁছায়নি। তবে এটি ধীরে ধীরে এমন এক বিকল্পে পরিণত হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের অনিশ্চিত ব্যবস্থাপনায় উদ্বিগ্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে কিছুটা স্বস্তির উৎস হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের থিংক-ট্যাংকের আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ডিরেক্টর জোশ লিপস্কি জানিয়েছেন, ইউয়ানকে বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চীন অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে আগেভাগেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী বক্তব্য দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে শুরু করেছে।

জোশ লিপস্কির ভাষ্য, গত ছয়-সাত সপ্তাহে বিশ্ব বাজারে ইউয়ান ব্যবহারের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। চীনের বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামো ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)-এ লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯২০ বিলিয়ন ইউয়ান (১৩৪ বিলিয়ন ডলার) লেনদেন হয়েছে, যেখানে গত বছরের দৈনিক গড় ছিল ৬৮০ বিলিয়ন ইউয়ান। ২ এপ্রিল এই অঙ্ক ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়।
চীনা ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চে সীমান্তের বাইরের বন্ড, শেয়ার ও অন্যান্য পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১২ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের গড়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি।
এই পরিবর্তনের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট নয়। ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হওয়া নতুন কিছু বিধি সিআইপিএসকে আরও নমনীয় করেছে। তবে সময়কাল বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লিপস্কির মতে, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সংকটকালীন সময়ের সঙ্গে সরাসরি মিলছে, যা কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এনজির ভাষ্য, এসব লেনদেন অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়, কখনো ৭ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ডলারনির্ভর বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থার তুলনায় চীনের বিকল্প প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো অনেক ছোট পরিসরের। সিআইপিএস ও এমব্রিজ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিপস বা সিএইচআইপিএস নেটওয়ার্কের তুলনায় পিছিয়ে। ২০২৫ সালে সিএইচআইপিস প্রতিদিন ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক ব্যাংক মেসেজিং নেটওয়ার্ক সুইফটে ১১ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলেও সিআইপিএসে রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৯১টি।
তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের জেরে রুশ ব্যাংকগুলোকে সুইফট থেকে বহিষ্কারের পর অনেক দেশ বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করে। ব্যাংকারদের মতে, একক প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ইউয়ান ব্যবহারের প্রস্তুতি নিয়েছিল। ইরান সংকট সেই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিশ্ববাজারে ইউয়ানের আরেকটি আকর্ষণ হলো এর নিম্ন সুদের হার। চীনে কম ঋণগ্রহণ ও ভোগব্যয়ের কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদহার কমিয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দুই শতাংশেরও বেশি কম। পাশাপাশি মূল্যপতনের (ডিফ্লেশন) আশঙ্কা দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফাও কমিয়ে দিয়েছে।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে বিদেশি সরকার ও কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসছে। কেউ চীনের মূল ভূখণ্ডে ইউয়ানভিত্তিক ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যু করছে, আবার কেউ হংকংয়ে ‘ডিম সাম বন্ড’ বিক্রি করছে। উদাহরণ হিসেবে, ইন্দোনেশিয়া সরকার ফেব্রুয়ারিতে হংকংয়ে ৯ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি সংগ্রহ করেছে। চলতি মাসে পর্তুগাল ইউরোজোনের প্রথম দেশ হিসেবে ডিম সাম বন্ড ইস্যু করে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহ করেছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই তাদের তেলের বিনিময়ে ইউয়ানে অর্থ গ্রহণে আগ্রহী, যার বড় অংশ চীনের স্বাধীন ‘টিপট’ রিফাইনারিগুলোতে সরবরাহ করা হয়। যদিও রপ্তানির পরিমাণ কমেছে, তবে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আয় বেড়েছে। পাশাপাশি ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়েও ইরান ইউয়ান গ্রহণ করছে।
চলতি মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বৈঠকে উপস্থিত আর্থিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে একটি মতৈক্য দেখা গেছে। তারা জানিয়েছে, তেহরানের এই আয়ের বেশিরভাগই ক্রিপ্টোকারেন্সির পরিবর্তে ইউয়ানে হচ্ছে। তবে সিআইপিএসে লেনদেন বাড়ার পরিমাণ এত বেশি যে, শুধু তেল ও প্রণালির আয় দিয়ে তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কিছু মূলধন স্থানান্তরও থাকতে পারে, যার একটি অংশ চীনা বিনিয়োগ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতাও এতে ভূমিকা রেখেছে।

চীনা ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চে সীমান্তের বাইরের বন্ড, শেয়ার ও অন্যান্য পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১২ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের গড়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এসব লেনদেনের সবগুলো ইউয়ানে নিষ্পত্তি না হলেও, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সেবা ও সম্পদ লেনদেন মিলিয়ে চীনের মোট বৈদেশিক লেনদেনে ইউয়ানের অংশ মার্চে ৫৬ শতাংশের বেশি হয়েছে।
আবার সিআইপিএস ছাড়াও অন্যান্য পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মেও লেনদেন বাড়ছে। সীমান্তের বাইরে ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ‘এমব্রিজ’ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন স্টান্ডার্ড চার্টার্ডে ব্যাংকের কর্মকর্তা কারেন এনজি। গত নভেম্বর পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মে ৪ হাজার ৪৭টি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ৫৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ স্থানান্তর হয়েছে। সৌদি আরব, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতে যুক্ত থাকলেও ৯৫ শতাংশের বেশি লেনদেন হয়েছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যু করা ডিজিটাল মুদ্রা ই-সিএনওয়াইতে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, শুধু সরকার নয়, লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থানের হেজ ফান্ডগুলোকেও (এক ধরনের বিকল্প বিনিয়োগ পদ্ধতি) নতুন অর্থায়ন মুদ্রা খুঁজতে হচ্ছে। ফরাসি ব্যাংক নাটিকসিসের এর বিশ্লেষকদের মতে, জাপানি ইয়েন দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে চীনের সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ভাবছে, তাদের ক্রেতা ও সরবরাহকারীরা যে মুদ্রা ব্যবহার করে, সেই ইউয়ানেই ঋণ নেওয়া উচিত কি না।

হংকংয়ের মুদ্রানীতি কর্তৃপক্ষ বিদেশি কোম্পানিগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে ২০০ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি তহবিল গঠন করেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো ব্যাংকগুলো এই অর্থ হংকংয়ের বাইরে তাদের শাখাগুলোতেও ছড়িয়ে দিতে পারছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ভূমিকা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। সুইফটের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে বৈশ্বিক বাণিজ্য অর্থায়নের ৮ শতাংশের বেশি ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে, যদিও ৮০ শতাংশের বেশি নিয়ে ডলার এখনো শীর্ষে রয়েছে।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ঝৌ শিয়াওচুয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তারের জন্য ইউয়ানের এখন একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই মত দিয়েছে চীনা মার্চেন্ট সিকিউরিটিস। তারা এটিকে মুদ্রাটির জন্য ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে দেখছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে। তবুও ইউয়ানকে ডলারের সমকক্ষ হতে হবে না, বিকল্প হিসেবে উপস্থিত থাকলেই তা ডলারের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে। ফলে যারা ডলারের আধিপত্যে অস্বস্তি বোধ করছে, তাদের জন্য ইউয়ান একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।

তীব্র বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার জন্য ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের প্রতি আগ্রহী হয়। আলোচনার পর সে ঋণ পায়ও। এই ঋণগ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আইএমএফের নানা কিস্তির অর্থছাড় পর্যন্ত নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে। সংস্থাটির ন

রূপপুর সফলভাবে পরিচালিত হলে তা কেবল শিল্পের চাকাই সচল করবে না, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এটি কি বাংলাদেশের জ্বালানি স্বাধীনতার পথ দেখাবে, নাকি নতুন ধরনের বৈশ্বিক নির্ভরতা তৈরি করবে, তার উত্তর হয়তো দেবে আগামী কয়েক দশক।