Advertisement Banner

পেস বোলিংই কি বাংলাদেশের মূল শক্তি?

পেস বোলিংই কি বাংলাদেশের মূল শক্তি?
বাংলাদেশ দলের দুই কার্যকরী অস্ত্র নাহিদ রানা ও মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি: বিসিবি

“আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখনও এমন একটা সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি যে, তারা মেনে নেবে ফাস্ট বোলিংই তাদের শক্তির জায়গা। অনেকেই এটা জানে, আমরাও জানি। তবে লোকেরা এটা এখনও মেনে নিতে প্রস্তুত না।”–নিউজিল্যান্ডকে ওয়ানডে সিরিজে হারানোর পর ইএসপিএনক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ শন টেইট।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই পেসার যা বলেছেন, সেটার সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ আছে সামান্যই। গত পাঁচ-ছয় বছরে একটা পেস বিপ্লব যে হয়ে গেছে, সেটার সুফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। তবে চিরায়ত স্পিনকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার কারণেই হয়তো এখনও পেস বোলারদের রাজত্ব নিয়ে মাতামাতি কমই হচ্ছে।

ঐতিহ্যগতভাবেই বাংলাদেশের কন্ডিশনে স্পিনাররাই বাড়তি সুবিধা পেয়ে এসেছেন। অন্যদিকে বিশ্বমানের পেসার সেভাবে উঠে না আসায় স্পিনারদের প্রতি বরাবরই নির্ভরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। কালেভদ্রে পেসাররা দারুণ কিছু পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন।

তবে বাংলাদেশের বোলিং মানেই এনামুল হক মনি, নাইমুর রহমান দুর্জয়, মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসান, তাইজুল ইসলামরাই ছিলেন অগ্রভাগে। স্পিনারদের দাপটের কারণে দেশের মাটিতে ভালো করলেও যুগ যুগ ধরে বিদেশের মাটিতে নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

সেখান থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সরে আসার শুরুটা হয় ২০১৫ সালে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজে একাদশ সাজানো হয় চার পেসার–মাশরাফি, মুস্তাফিজুর, রুবেল, তাসকিনকে দিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটাই ছিল প্রথমবার দেশের মাটিতে একটি ম্যাচে চার পেসার খেলানোর ঘটনা।

এই চর্চাটা সেই সময়ে সীমাবদ্ধ ছিল কেবল সাদা বলের ক্রিকেটেই। টেস্টে সফলতার জন্য টার্নিং উইকেট বানিয়ে তিন থেকে চার স্পিনার নিয়েও খেলতে নেমে গেছে বাংলাদেশ। ফলও মিলেছে তাতে। জয় ধরা দেয় ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে।

পেস বোলিং কোচ শন টেইটের সঙ্গে পেস ইউনিটের একটি অংশ। ছবি: ফেসবুক
পেস বোলিং কোচ শন টেইটের সঙ্গে পেস ইউনিটের একটি অংশ। ছবি: ফেসবুক

তবে এই ‘শর্টকাট’ পদ্ধতি দিয়ে দেশের বাইরে সব ফরম্যাটেই ভুগতে হয়েছে বাংলাদেশকে। কারণ, দেশের বাইরে ওয়ানডে হোক বা টেস্ট–জিততে হলে পেসারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লাগবেই। শুরুটা হয় তাসকিনের বদলে যাওয়া দিয়েই। একটা সময়ে অনিয়মিত হয়ে পড়া নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করেন ২০২০ সালের কোভিডের বিরতির সময়ে। তিন ফরম্যাটে নিজেকে নতুনভাবে মেলে ধরেন। সঙ্গে আগে থেকেই ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

আরও যুক্ত হন আবু জায়েদ রাহি, ইবাদত হোসেন, খালেদ আহমেদ, শরীফুল ইসলাম, তানজিম হাসান সাকিব, হাসান মাহমুদরা। অন্য দুই ফরম্যাটে সেভাবে না হলেও টেস্ট ক্রিকেটে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে অল্প সময়ের মধ্যে। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে ইতিহাস গড়া টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ, যা আসে ইবাদতের দুর্দান্ত এক স্পেলের বদৌলতে।

বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহ মনে করেন, শুধু বোলিং নয়, পেসাররা এখন সব ফরম্যাটেই বাংলাদেশের শক্তির জায়গা। চরচাকে তিনি বলেন, “আমরা যখন খেলতাম, তখনও পেসাররা ভালো করতেন। তবে ধারাবাহিকতা ছিল না। আর অধিনায়করাও স্পিনারদের ওপরই বেশি নির্ভর করতেন। এখন কিন্তু উল্টোটা হচ্ছে। পেসারদের জায়গা করে দিতে বাংলাদেশ এখন স্পিনার কম খেলাচ্ছে। এটা অনেক ইতিবাচক দিক।”

টেইটের বাংলাদেশের পেস বিপ্লব সম্পর্কে মন্তব্যটি এখানেই প্রাসঙ্গিক। একটা দেশে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে পেসার উঠে আসে, তার মানে হচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়েও পেস বোলিং নিয়ে বাড়তি রোমাঞ্চ ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলে একের পর এক প্রতিভাবান পেসার পাচ্ছে বাংলাদেশ। যার জ্বলন্ত উদাহরণ নাহিদ রানা।

বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং ইউনিট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিশ্বমঞ্চে। ছবি: ফেসবুক
বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং ইউনিট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিশ্বমঞ্চে। ছবি: ফেসবুক

২১ বছর বয়সী এই পেসার সম্প্রতি খেলে এসেছেন পাকিস্তানের পিএসএলে। ফাস্ট বোলিংয়ের জন্য বিখ্যাত দেশটিতে গতির ঝড়ে তিনি রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছেন। দেড় বছর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়েও ছিল তার বড় অবদান। নাহিদ এখন কেবল বাংলাদেশেরই নন, গোটা ক্রিকেট বিশ্বের কাছেই একজন সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

সেই নাহিদ যে শুধু টেস্টেই ভালো করছেন, তা নয়। পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজেও নিয়েছেন ইনিংসে পাঁচ উইকেট। হয়েছেন টানা দুইবার সিরিজ সেরাও।

মুস্তাফিজুর, শরীফুলরাও আছেন ছন্দে। আপাতত দলের বাইরে থাকা তানজিম হাসান, হাসান মাহমুদরা অপেক্ষায় আছেন সুযোগের। এতে করে তাসকিন আহমেদ যেন অনেকটা আড়ালেই চলে গেছেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে তার অনুপস্থিতি টেরই পায়নি বাংলাদেশ দল!

ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম সফল কোচ হান্নান সরকার বেশ উচ্ছ্বসিত পেসারদের উত্থানে। চরচাকে তিনি জানিয়েছেন এই প্রসঙ্গে তার মতামত, “বাংলাদেশ হয়তো এখনই নাম্বার ওয়ান বা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়নি। তবে এই পেসারদের হাত ধরে দীর্ঘমেয়াদে অনেক সাফল্যের দেখা পাওয়া যাবে। বিসিবি অনেকদিন ধরেই পেসারদের ওপর বিনিয়োগ করেছে, তারই সুফল আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।”

হান্নানের হাত ধরে গত বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। সেই দলের সাফল্যের দুই রূপকার পেসার রিপন মণ্ডল ও আব্দুল গাফফার সাকলাইন ডাক পেয়েছেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলেও। রিপনকে অনেকেই ডেথ ওভারে দেশের অন্যতম সেরা বোলার হিসেবেই মানছেন। আর সাকলাইন হতে পারেন সাদা বলের ক্রিকেটে একজন আদর্শ পেস বোলিং অলরাউন্ডার প্যাকেজ।

তাই তিন ফরম্যাটের চিত্রটা যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো, এই মুহূর্তে পেস বোলিংই বাংলাদেশের শক্তির জায়গা। অধিকাংশ ম্যাচ জেতাচ্ছেন তারাই। কাকে রেখে কাকে খেলাবেন, সেই মধুর বিড়ম্বনায় তাই প্রায়ই পড়তে হচ্ছে নির্বাচকদের। আর এভাবেই বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট।

সম্পর্কিত