২০২৬ সালে এসে পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যপন্থী উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলো একঘরে হয়ে পড়ার এক গভীর আশঙ্কা করছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকার কাছ থেকে আসা ক্রমাগত হুমকি ও বিদ্রূপ তাদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকেও তারা বিকল্প বন্ধু হিসেবে সম্পূর্ণ আস্থা নিতে পারছে না। ফলে এক চরম নিঃসঙ্গতার চোরাস্রোতে ঘুরপাক খাচ্ছে পশ্চিমের এই রাষ্ট্রগুলো।
সম্প্রতি ২০ জানুয়ারি দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র জোট গড়ার আহ্বান জানান। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্নি তার বক্তৃতায় বলেন, “আমরা কোনো রূপান্তরের মধ্যে নেই, বরং আমরা আছি এক গভীর ফাটলের মাঝখানে।” তিনি অভিযোগ করেন যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো বর্তমানে অর্থনৈতিক, আর্থিক ও সরবরাহ-শৃঙ্খলগত নির্ভরশীলতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
কার্নির মতে, মহাশক্তিদের এই দ্বন্দ্বে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা দেশগুলোর সামনে এখন দুটি পথ খোলা: হয় নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, অথবা অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী সুরক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোট গড়ে তোলা। তিনি আমেরিকার ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও কাতারের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রতি ইঙ্গিত দেন। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে, চীন আমেরিকার বিকল্প হতে পারে না। কারণ চীনের স্বার্থতাড়িত আচরণ কিছু অঞ্চলের জন্য আকর্ষণীয় হলেও, যারা মানবাধিকার ও মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়, তাদের জন্য চীন দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্সগত ১৪ থেকে ১৭ জানুয়ারি চীন সফরকালে কার্নি ঘোষণা করেন যে, কানাডা বিশেষ সুবিধাজনক শর্তে চীন থেকে ৪৯ হাজার বৈদ্যুতিক যান আমদানি করবে।
উল্লেখ্য, উত্তর আমেরিকায় চীনা বৈদ্যুতিক যানের প্রবেশ ঠেকাতে আমেরিকা ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। ২০২৪ সালে কানাডা এই নীতিতে সমর্থন দিলেও এখন তারা এর বিপরীত অবস্থান নিচ্ছে, যা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কানাডার দুই-তৃতীয়াংশ রপ্তানিই যায় আমেরিকায়। এই প্রস্তাবের বিনিময়ে চীন কানাডার কৃষিপণ্য ও জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা দুই দেশের শীতল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উষ্ণতার আভাস দিচ্ছে। তবে আমেরিকার রক্ষণশীল মহল অভিযোগ করছে যে, কার্নি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চীনের পক্ষ নিচ্ছেন। যদিও বেইজিংয়ে কার্নিকে দেওয়া অভ্যর্থনায় বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত ছিল না, সি চিনপিং কেবল ‘পারস্পরিক সম্মানের’ ভিত্তিতে সম্পর্কের উপদেশ দিয়েছেন।
জানুয়ারির শেষ দিকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার চীন সফরে যাচ্ছেন। বিগত আট বছরের মধ্যে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এটিই প্রথম চীন সফর। তবে ডাউনিং স্ট্রিট বা হোয়াইটহল এই সফর নিয়ে খুব বেশি উচ্চাশা দেখাচ্ছে না। মূলত স্কটিশ হুইস্কি, স্যামন মাছ এবং জীববিজ্ঞান ও সবুজ প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোই এই সফরের মূল লক্ষ্য।
এদিকে, লন্ডনে টাওয়ার অব লন্ডনের কাছে চীনের একটি বিশাল দূতাবাস নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া নিয়ে ব্রিটেনে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। বিরোধী দলগুলো একে ‘সরকারের আত্মসমর্পণ’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের আশঙ্কা, এই দূতাবাস থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারি চালানো হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গুপ্তচরবৃত্তির জন্য এত বিশাল অট্টালিকার প্রয়োজন নেই, সাধারণ গুদাম ঘর থেকেও তা সম্ভব। তাই একটি পরাশক্তিকে দূতাবাস নির্মাণের অনুমতি দেওয়াকে আত্মসমর্পণ নয়, বরং কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাস হিসেবেই দেখা উচিত। ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটেন নাৎসি জার্মানিকেও রাজকীয় দূতাবাস ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াচীনে স্যার কিয়ার স্টারমারের সংযত কর্মসূচি বা কম প্রত্যাশার পিছনে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কিছু কাঠামোগত কারণও আছে। ব্রিটেন যদি আমেরিকার চাপের বিরুদ্ধে নিজেকে আড়াল করতে চায়, তবে চীন তেমন কোনো সহায়তা দিতে পারবে না। পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান এবং ক্লাউড কম্পিউটিংসহ ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে ব্রিটেন আমেরিকার ওপর নির্ভর করে। ব্রিটেনসহ অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি চীনা অস্ত্র বা তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা কেনার কথা ভাবছে না। এছাড়া চীনের অতীত রেকর্ড বলে, আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের ওপর নির্ভর হওয়া খুব একটা স্বস্তির বিষয় নয়।
এখন দেখার বিষয়, পশ্চিমা উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো আমেরিকার প্রভাব অগ্রাহ্য করে চীনের সঙ্গে আরও ভূরাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে পারে কি না? বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, পশ্চিমা নেতারা নিজেদের আমেরিকার প্রভাব থেকে স্বাধীন দাবি করলেও ওয়াশিংটন গর্জন করলেই তারা চুপ করে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা নেতাদের কাছে এখন সি চিনপিং বা ট্রাম্পের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমেরিকার এক সময়ের মিত্র মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক এই দেশগুলোর নিঃসঙ্গ সময়ে চীন এখনো কোনো উদ্ধারকর্তা নয়।