Advertisement Banner

শিরীন শারমিন কারাগারে: অন্তত ৭টি সাপ মারল সরকার, লাঠিও ভাঙল না

শিরীন শারমিন কারাগারে: অন্তত ৭টি সাপ মারল সরকার, লাঠিও ভাঙল না
গ্রেপ্তারের পর গতকাল মঙ্গলবারই আদালতে নেওয়া হয় শিরীন শারমিনকে। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশ এই সাবেক স্পিকারকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করলেও আদালত তা খারিজ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায়, জামিন না হওয়া পর্যন্ত সাবেক এই সংসদ সদস্যকে কারাগারেই থাকতে হবে। তবে পুলিশ তাকে হেফাজতে না পাওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারছে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্পিকার শিরীন শারমিনের খোঁজ কেউ দিতে পারেননি। তিনি বিদেশে পালিয়ে যাননি—এটি বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহল থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু কেন তাকে সামনে আনা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছ থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কেন শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তার করেনি, কেন বিএনপি সরকার তাকে গ্রেপ্তার করল বা এখন কেন করল—এমন অনেক প্রশ্ন রাজনীতিবিদদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

বিএনপির একজন নেতা ও মন্ত্রী বলেন, এক ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল—শিরীন শারমিনকে কি গুম করা হয়েছে? বিদেশি কয়েকজন রাষ্ট্রদূতও তার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে সরকার মনে করেছে, তাকে প্রকাশ্যে আনা উচিত। এ কারণেই গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীকে যদি গ্রেপ্তার না করে তার অবস্থান জানানো হতো, তাহলে প্রশ্ন উঠত—সরকার কি আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় আচরণ শুরু করেছে? তাছাড়া বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এ নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে পারত। এসব কিছু সামাল দিতেই শিরীন শারমিনকে কারাগারে রাখা হয়েছে। তার মতে, কারাগারে সাবেক স্পিকার যেন যতটা সম্ভব ভালো থাকেন, সে বিষয়ে সরকার সংশ্লিষ্টদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

শিরীন শারমিন প্রসঙ্গটি আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে কিছুটা পেছনে ফিরতে হবে। বিএনপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতারা কিছুটা প্রকাশ্যে আসছেন, কোথাও কোথাও কার্যালয় খুলছেন—এমন ঘটনাও ঘটছে। এটি নিয়ে বিরোধীদল সরকারকে খানিকটা চাপে রেখেছে।

এ ছাড়া গণভোটসহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে দূরত্ব, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে সরকার চাপে রয়েছে।

সরকার চাইছে না, এর মধ্যে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল করুক। আপাতত সরকারের অবস্থান—আওয়ামী লীগকে কোনঠাসা করে রাখা। এজন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, এই সরকার তা বলবৎ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও সরকারের মধ্যে এমন মতও রয়েছে—দীর্ঘমেয়াদে দলটিকে পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে রাখা যাবে না।

মূলত শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সরকার রাজনীতিতে বেশ কিছু বার্তা দিয়েছে। আগামীর রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা এই বার্তার মাধ্যমে রাজনীতিবোদ্ধারা সহজেই বুঝতে পারবেন।

১. সরকার জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে আশ্বস্ত করতে চায় যে আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়া হবে না।

২. আওয়ামী লীগকে এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে—সরকার খুব কঠোরও হবে না, আবার একেবারে নমনীয়ও থাকবে না। বিএনপি ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করে দেবে—এমনটা যেন দলটি না ভাবে। আওয়ামী লীগ যদি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামার চেষ্টা করে, তা সরকার মেনে নেবে না। আবার সরকার অযথা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে লেগেও থাকবে না।

৩. সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনকে আশ্বস্ত করা—আওয়ামী লীগকে এখনই রাজনীতিতে ফেরানো হবে না।

৪. বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করা।

৫. জুলাই সনদ ও গণভোটের ফল বাস্তবায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে জায়গা দেওয়া হবে না।

৬. আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থক নেতাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার বার্তাও দেওয়া হয়েছে এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে।

৭. গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে, এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সেটিও অনেকটা চাপা পড়েছে। সরকার বার্তা দিয়েছে কাউকে গুম করে রাখা হবে না।

লেখক: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জিআইজেএনের (GIJN) বাংলা বিভাগের সম্পাদক

লেখা: রোকেয়া কালেকটিভ থেকে নেওয়া

সম্পর্কিত