ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য উইক-কে মাহফুজ আলম
চরচা ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, জুলাই আন্দোলনের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক। গুরুত্ব বিবেচনায় পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করছে চরচা।
দ্য উইক: অধ্যাপক ইউনূস আপনাকে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মস্তিষ্ক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং আপনি অন্তর্বর্তী সরকারেরও অংশ ছিলেন। দেড় বছরে কোন কোন ঘাটতি রয়ে গেছে, যার ফলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি?
মাহফুজ আলম: আপনি যদি জুলাইয়ের সঙ্গে আবেগ দিয়ে যুক্ত থাকেন–যেমন আমরা অনেকেই ছিলাম, তাহলে সত্যিই মনে হয়েছিল, এবার নতুন কিছু জন্ম নেবে। ৮ আগস্টের পর মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছিল যে ব্যবস্থার ভেতর থেকেই উঠে আসা নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা দেশকে নতুন কোনো পথে নিয়ে যেতে পারবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা হয়েছিল।
কিন্তু জুলাইয়ের পর, বিশেষ করে ৮ আগস্টের পর–যা ঘটেছে, বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক দলগুলো এবং যাকে আমি ‘পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বলি, তারা আবার সংগঠিত হয়ে ওঠে। এই বন্দোবস্তের মধ্যে রয়েছে বেসামরিক ও সামরিক শক্তি, ব্যবসায়ী অলিগার্করা, গণমাধ্যমের একটি অংশ এবং নাগরিক সমাজের কিছু অংশ–অর্থাৎ আগের শাসনব্যবস্থার অবশিষ্ট শক্তিগুলো। এই সব শক্তি একত্র হয়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে কার্যত শ্বাসরোধ করে ফেলে।
দ্য উইক: এর জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন?
মাহফুজ আলম: আজ বাংলাদেশ একটি পরিচিত চক্রে আটকে গেছে–সবাই কাউকে না কাউকে দোষী খুঁজছে। গণঅভ্যুত্থানের পর পৃথিবীর সর্বত্রই এমনটা ঘটে। আমি ২৮ আগস্ট সরকারের সঙ্গে যুক্ত হই, অর্থাৎ প্রায় ২৩ দিন পর। শুরুতে কী ঘটেছিল, তা খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেশের নানা জায়গায় গেছি, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছি। তাদের আশ্বস্ত করতে হয়েছিল যে জুলাই-সমর্থিত, ছাত্রসমর্থিত সরকারের অধীনে তারা নিরাপদ থাকবেন।
কিন্তু সংস্কারের বদলে আমরা প্রথম কয়েক মাস কাটিয়েছি আগুন নেভাতে। সময়টা ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির। সরকারের ভেতর থেকেই আমি বুঝেছি–পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের শক্তিগুলো প্রকৃত পরিবর্তন চায় না। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
দ্য উইক: আপনি যখন ‘ক্ষমতার বলয়’ বলছেন, তখন কি শুধু আওয়ামী লীগকেই বোঝাচ্ছেন, নাকি বিএনপি ও জামায়াতকেও?
মাহফুজ আলম: সবাইকেই। প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্য নেই। আমি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এমন লোকজনের সঙ্গে দেখা করেছি, যাদের কেউ কেউ জামায়াত-বিএনপি পটভূমি থেকে এসেছেন–যারা এই বন্দোবস্তের অংশ। আপনি যখন একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতার স্তরে পৌঁছে যান, তখন আর পরিবর্তন চাইতে ইচ্ছে করে না। তখন মনে হয়, আমরা তো পৌঁছে গেছি, সংস্কারের দায়িত্ব পরের সরকারের।
দ্য উইক: কিন্তু এরা তো জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাস্তায়ও ছিল। তাহলে কারা সত্যিকারের পরিবর্তন চেয়েছিল?
মাহফুজ আলম: এটাই মূল সমস্যা। তরুণ প্রজন্ম, যারা জুলাইয়ের প্রকৃত চালিকাশক্তি–তারা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বড় ব্যবসা বা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে না। তাদের হাতে নেই বড় করপোরেশন বা প্রতিষ্ঠান। যেমন এনসিপি–এটি মূলত আট থেকে ১০ মাসের জন্য গড়ে ওঠা তরুণদের একটি অস্থায়ী সম্মিলন। তারা তরুণদের কণ্ঠস্বর, নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের প্রশাসক নেই, সামরিক পেশাজীবী নেই, বড় ব্যবসায়ী নেই, গণমাধ্যমের মালিকানা নেই। প্রায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিই তাদের নেই।
দ্য উইক: এই তরুণ গোষ্ঠীগুলোর তো আপনার সমর্থন দরকার ছিল। আপনি কেন এনসিপিতে যোগ দেননি বা সমর্থন করেননি?
মাহফুজ আলম: আমি নিজেও সেই একই প্রজন্মের অংশ। কিন্তু এনসিপির আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি। আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সুসংহত ধারণা হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছি–যেমন দায়িত্ব ও সহমর্মিতার ওপর দাঁড়ানো একটি সমাজের ধারণা।
এর বদলে জামায়াতের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও একটি দ্বিমুখী বিভাজনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে–ধর্মনিরপেক্ষ বনাম ইসলামপন্থী। আমরা এর বাইরে যেতে চেয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক যুদ্ধ নয়, বরং জাতি গঠন। আজ রাজনীতি আবারও ১৯৭১-কেন্দ্রিক বৃত্তে আবদ্ধ। ২০২৪ সালের আকাঙ্ক্ষার কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না।
দ্য উইক: শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আপনি কি এটিকে একটি মোড়বদলের ঘটনা হিসেবে দেখেন?
মাহফুজ আলম: এটি একটি আবেগঘন স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু এটি কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিবর্তনে রূপ নেবে না। জুলাই মাসে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু পরও সমাজের কাঠামো বদলায়নি। হাদির ছিল স্পষ্টতা ও দূরদৃষ্টি–যা হয়তো কিছু আলোচনার জন্ম দেবে। কিন্তু সেটিও ম্লান হয়ে যাবে। আজও পরিবারগুলো ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারছে জুলাইয়ে নিখোঁজ হওয়া তাদের স্বজনেরা গণকবরে শায়িত। আবেগ দিয়ে পরিবর্তন আসে না। আসে ক্ষমতার কাঠামো বদলালে।
দ্য উইক: আপনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কেন?
মাহফুজ আলম: খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ, হয়তো এক বা দুই শতাংশ–অনিয়মে জড়িত ছিল। কিন্তু গণমাধ্যমের বর্ণনায় পুরো প্রজন্মকে সহিংস, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং দেশ লুটের জন্য দায়ী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। মানুষ স্বভাবতই এটা বিশ্বাস করে না। কিন্তু বারবার একই বার্তা প্রচার হলে একটি ধারণা তৈরি হয়। এদিকে বিএনপি ও জামায়াত ক্ষমতায় না থেকেও প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্দখল করে নিয়েছে। আমি সরকারের ভেতর থেকেই এটি দেখেছি।
দ্য উইক: আপনি তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। সরকার কি বয়ান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে?
মাহফুজ আলম: যেটার মালিকানা আপনার নেই, সেটাকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বাংলাদেশের গণমাধ্যম অলিগার্কদের মালিকানায়। সরকার কি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে? না। কারণ বেসামরিক-সামরিক স্বার্থ তাদের রক্ষা করে। আগের শাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতিকে যেসব কাঠামো টিকিয়ে রেখেছিল সেগুলো অক্ষতই আছে। তারাই এখনো রাজনীতি ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছে।
দ্য উইক: প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলাকে আপনি কীভাবে দেখেন? এটি কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়?
মাহফুজ আলম: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি সেদিন রাতে সেখানে গিয়েছিলাম এবং সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু এটি কোনো সরল উগ্রবাদী হামলা ছিল না। এখানে বহু স্তর জড়িত ছিল। কিছু শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তারা মূল চালক ছিল না। বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সরকার–বাইরের নানা পক্ষ এতে ভূমিকা রেখেছে। অনেক হামলাকারী ঢাকারও ছিল না। প্রশ্ন হলো, তাদের আনা হলো কেন?
এর উদ্দেশ্য ছিল মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া–হাদির হত্যাকাণ্ড ও গভীর রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে ‘সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা’ নামের একটি বয়ানের দিকে। বাংলাদেশে কেউই গণমাধ্যমে হামলা সমর্থন করে না। শিক্ষার্থীরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, যদিও অতীতে স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করা কিছু মিডিয়া হাউস নিয়ে তাদের দ্বিধা আছে।
দ্য উইক: আপনি বলছেন, ১৯৭১ আবার রাজনীতিতে আধিপত্য করছে। আপনি কি ১৯৭১-কে অস্বীকার করছেন?
মাহফুজ আলম: একদমই না। ১৯৭১ আমাদের প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি। ১৯৭১ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান একজন জাতীয় বীর। আমরা যে বিষয়ের বিরোধিতা করি, তা হলো ১৯৭১-এর ‘এসেনশিয়ালাইজেশন’-অর্থাৎ এটিকে একটি পরিবারের বা একটি দলের একক বয়ানে পরিণত করা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের সংগ্রাম–কোনো একক দল বা পরিবারের নয়। লাখ লাখ মানুষ এতে ভুগেছে। ইতিহাসকে সেটাই প্রতিফলিত করতে হবে।
দ্য উইক: পরবর্তী সরকার পাঠ্যবই ও বয়ানে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তনগুলো বাতিল করে দেবে–এই আশঙ্কা আছে কি?
মাহফুজ আলম: শেখ মুজিবকে পাঠ্যবই থেকে সরানো হয়নি। ছয় দফা আন্দোলনও বহাল আছে। আমরা প্রশ্ন তুলেছি–কীভাবে দলীয় বয়ানকে সংবিধানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, কীভাবে একটি পরিবারকে সামষ্টিক সংগ্রামের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে। ভবিষ্যৎ যেকোনো সরকার মুছে ফেলবে না–সংস্কার করবে।
দ্য উইক: আপনি যদি জামায়াত নিয়ে হতাশ হন এবং এনসিপিতেও আশ্বস্ত না হন, তাহলে জনগণের প্রকৃত আশা কার মধ্যে দেখেন?
মাহফুজ আলম: বিএনপি ও জামায়াত–দুটোরই বিশ্বাসযোগ্যতা ও দুর্বলতা আছে। আসল প্রশ্ন দল নয়–পরিবর্তন বাস্তবায়ন। এনসিপির বাইরে জুলাই থেকে জন্ম নেওয়া একাধিক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। আমরা সবাই একই চেতনা বহন করি। কোনো দলে যাই বা না যাই, আমরা রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব। এই সংগ্রাম আমাদের সারাজীবন চলবে।
দ্য উইক: আপনার এলাকা বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হওয়া সত্ত্বেও আপনি বিএনপিতে যোগ দেননি কেন?
মাহফুজ আলম: আমি পুরনো দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বদলে নতুন শক্তিগুলোর একটি বৃহত্তর জোটের অপেক্ষায় ছিলাম। এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন আমার কাছে স্পষ্ট হলো–তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। যেকোনো এমন জোটে শেষ পর্যন্ত জামায়াতই প্রভাব বিস্তার করত। এরপর পদত্যাগের পর আমি বিএনপির সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু ততদিনে তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
দ্য উইক: সবশেষে, আজ বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু কারা? এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে গড়তে কী করা উচিত?
মাহফুজ আলম: পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্ব কখনো স্থায়ী নয়। স্বার্থ বদলায়। ভারতকে জুলাই অভ্যুত্থানকে একটি প্রকৃত গণআন্দোলন হিসেবে স্বীকার করতে হবে। এটিকে ‘জুলাই-আগস্টের ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। পাকিস্তানের ইতিহাস দেখায়–অস্বীকার কোনো সমাধান নয়।
ভারতকে কেবল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নয়, জনগণের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তারা এখনো ষাট ও সত্তরের দশকের কণ্ঠগুলোর সঙ্গেই কথা বলে, নতুন প্রজন্মকে উপেক্ষা করে। আর ভারতীয় গণমাধ্যমকে বাংলাদেশকে প্রচারণার বিষয় হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। এখানে আসুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। বাস্তবতা তুলে ধরুন। এই তিনটি বিষয়: স্বীকৃতি, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম– অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য উইকের দিল্লি ব্যুরোর প্রধান নম্রতা বিজি আহুজা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, জুলাই আন্দোলনের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক। গুরুত্ব বিবেচনায় পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করছে চরচা।
দ্য উইক: অধ্যাপক ইউনূস আপনাকে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মস্তিষ্ক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং আপনি অন্তর্বর্তী সরকারেরও অংশ ছিলেন। দেড় বছরে কোন কোন ঘাটতি রয়ে গেছে, যার ফলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি?
মাহফুজ আলম: আপনি যদি জুলাইয়ের সঙ্গে আবেগ দিয়ে যুক্ত থাকেন–যেমন আমরা অনেকেই ছিলাম, তাহলে সত্যিই মনে হয়েছিল, এবার নতুন কিছু জন্ম নেবে। ৮ আগস্টের পর মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছিল যে ব্যবস্থার ভেতর থেকেই উঠে আসা নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা দেশকে নতুন কোনো পথে নিয়ে যেতে পারবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা হয়েছিল।
কিন্তু জুলাইয়ের পর, বিশেষ করে ৮ আগস্টের পর–যা ঘটেছে, বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক দলগুলো এবং যাকে আমি ‘পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বলি, তারা আবার সংগঠিত হয়ে ওঠে। এই বন্দোবস্তের মধ্যে রয়েছে বেসামরিক ও সামরিক শক্তি, ব্যবসায়ী অলিগার্করা, গণমাধ্যমের একটি অংশ এবং নাগরিক সমাজের কিছু অংশ–অর্থাৎ আগের শাসনব্যবস্থার অবশিষ্ট শক্তিগুলো। এই সব শক্তি একত্র হয়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে কার্যত শ্বাসরোধ করে ফেলে।
দ্য উইক: এর জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন?
মাহফুজ আলম: আজ বাংলাদেশ একটি পরিচিত চক্রে আটকে গেছে–সবাই কাউকে না কাউকে দোষী খুঁজছে। গণঅভ্যুত্থানের পর পৃথিবীর সর্বত্রই এমনটা ঘটে। আমি ২৮ আগস্ট সরকারের সঙ্গে যুক্ত হই, অর্থাৎ প্রায় ২৩ দিন পর। শুরুতে কী ঘটেছিল, তা খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেশের নানা জায়গায় গেছি, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছি। তাদের আশ্বস্ত করতে হয়েছিল যে জুলাই-সমর্থিত, ছাত্রসমর্থিত সরকারের অধীনে তারা নিরাপদ থাকবেন।
কিন্তু সংস্কারের বদলে আমরা প্রথম কয়েক মাস কাটিয়েছি আগুন নেভাতে। সময়টা ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির। সরকারের ভেতর থেকেই আমি বুঝেছি–পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের শক্তিগুলো প্রকৃত পরিবর্তন চায় না। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
দ্য উইক: আপনি যখন ‘ক্ষমতার বলয়’ বলছেন, তখন কি শুধু আওয়ামী লীগকেই বোঝাচ্ছেন, নাকি বিএনপি ও জামায়াতকেও?
মাহফুজ আলম: সবাইকেই। প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্য নেই। আমি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এমন লোকজনের সঙ্গে দেখা করেছি, যাদের কেউ কেউ জামায়াত-বিএনপি পটভূমি থেকে এসেছেন–যারা এই বন্দোবস্তের অংশ। আপনি যখন একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতার স্তরে পৌঁছে যান, তখন আর পরিবর্তন চাইতে ইচ্ছে করে না। তখন মনে হয়, আমরা তো পৌঁছে গেছি, সংস্কারের দায়িত্ব পরের সরকারের।
দ্য উইক: কিন্তু এরা তো জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাস্তায়ও ছিল। তাহলে কারা সত্যিকারের পরিবর্তন চেয়েছিল?
মাহফুজ আলম: এটাই মূল সমস্যা। তরুণ প্রজন্ম, যারা জুলাইয়ের প্রকৃত চালিকাশক্তি–তারা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বড় ব্যবসা বা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে না। তাদের হাতে নেই বড় করপোরেশন বা প্রতিষ্ঠান। যেমন এনসিপি–এটি মূলত আট থেকে ১০ মাসের জন্য গড়ে ওঠা তরুণদের একটি অস্থায়ী সম্মিলন। তারা তরুণদের কণ্ঠস্বর, নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের প্রশাসক নেই, সামরিক পেশাজীবী নেই, বড় ব্যবসায়ী নেই, গণমাধ্যমের মালিকানা নেই। প্রায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিই তাদের নেই।
দ্য উইক: এই তরুণ গোষ্ঠীগুলোর তো আপনার সমর্থন দরকার ছিল। আপনি কেন এনসিপিতে যোগ দেননি বা সমর্থন করেননি?
মাহফুজ আলম: আমি নিজেও সেই একই প্রজন্মের অংশ। কিন্তু এনসিপির আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি। আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সুসংহত ধারণা হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছি–যেমন দায়িত্ব ও সহমর্মিতার ওপর দাঁড়ানো একটি সমাজের ধারণা।
এর বদলে জামায়াতের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও একটি দ্বিমুখী বিভাজনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে–ধর্মনিরপেক্ষ বনাম ইসলামপন্থী। আমরা এর বাইরে যেতে চেয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক যুদ্ধ নয়, বরং জাতি গঠন। আজ রাজনীতি আবারও ১৯৭১-কেন্দ্রিক বৃত্তে আবদ্ধ। ২০২৪ সালের আকাঙ্ক্ষার কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না।
দ্য উইক: শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আপনি কি এটিকে একটি মোড়বদলের ঘটনা হিসেবে দেখেন?
মাহফুজ আলম: এটি একটি আবেগঘন স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু এটি কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিবর্তনে রূপ নেবে না। জুলাই মাসে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু পরও সমাজের কাঠামো বদলায়নি। হাদির ছিল স্পষ্টতা ও দূরদৃষ্টি–যা হয়তো কিছু আলোচনার জন্ম দেবে। কিন্তু সেটিও ম্লান হয়ে যাবে। আজও পরিবারগুলো ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারছে জুলাইয়ে নিখোঁজ হওয়া তাদের স্বজনেরা গণকবরে শায়িত। আবেগ দিয়ে পরিবর্তন আসে না। আসে ক্ষমতার কাঠামো বদলালে।
দ্য উইক: আপনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কেন?
মাহফুজ আলম: খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ, হয়তো এক বা দুই শতাংশ–অনিয়মে জড়িত ছিল। কিন্তু গণমাধ্যমের বর্ণনায় পুরো প্রজন্মকে সহিংস, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং দেশ লুটের জন্য দায়ী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। মানুষ স্বভাবতই এটা বিশ্বাস করে না। কিন্তু বারবার একই বার্তা প্রচার হলে একটি ধারণা তৈরি হয়। এদিকে বিএনপি ও জামায়াত ক্ষমতায় না থেকেও প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্দখল করে নিয়েছে। আমি সরকারের ভেতর থেকেই এটি দেখেছি।
দ্য উইক: আপনি তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। সরকার কি বয়ান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে?
মাহফুজ আলম: যেটার মালিকানা আপনার নেই, সেটাকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বাংলাদেশের গণমাধ্যম অলিগার্কদের মালিকানায়। সরকার কি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে? না। কারণ বেসামরিক-সামরিক স্বার্থ তাদের রক্ষা করে। আগের শাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতিকে যেসব কাঠামো টিকিয়ে রেখেছিল সেগুলো অক্ষতই আছে। তারাই এখনো রাজনীতি ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছে।
দ্য উইক: প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলাকে আপনি কীভাবে দেখেন? এটি কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়?
মাহফুজ আলম: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি সেদিন রাতে সেখানে গিয়েছিলাম এবং সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু এটি কোনো সরল উগ্রবাদী হামলা ছিল না। এখানে বহু স্তর জড়িত ছিল। কিছু শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তারা মূল চালক ছিল না। বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সরকার–বাইরের নানা পক্ষ এতে ভূমিকা রেখেছে। অনেক হামলাকারী ঢাকারও ছিল না। প্রশ্ন হলো, তাদের আনা হলো কেন?
এর উদ্দেশ্য ছিল মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া–হাদির হত্যাকাণ্ড ও গভীর রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে ‘সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা’ নামের একটি বয়ানের দিকে। বাংলাদেশে কেউই গণমাধ্যমে হামলা সমর্থন করে না। শিক্ষার্থীরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, যদিও অতীতে স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করা কিছু মিডিয়া হাউস নিয়ে তাদের দ্বিধা আছে।
দ্য উইক: আপনি বলছেন, ১৯৭১ আবার রাজনীতিতে আধিপত্য করছে। আপনি কি ১৯৭১-কে অস্বীকার করছেন?
মাহফুজ আলম: একদমই না। ১৯৭১ আমাদের প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি। ১৯৭১ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান একজন জাতীয় বীর। আমরা যে বিষয়ের বিরোধিতা করি, তা হলো ১৯৭১-এর ‘এসেনশিয়ালাইজেশন’-অর্থাৎ এটিকে একটি পরিবারের বা একটি দলের একক বয়ানে পরিণত করা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের সংগ্রাম–কোনো একক দল বা পরিবারের নয়। লাখ লাখ মানুষ এতে ভুগেছে। ইতিহাসকে সেটাই প্রতিফলিত করতে হবে।
দ্য উইক: পরবর্তী সরকার পাঠ্যবই ও বয়ানে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তনগুলো বাতিল করে দেবে–এই আশঙ্কা আছে কি?
মাহফুজ আলম: শেখ মুজিবকে পাঠ্যবই থেকে সরানো হয়নি। ছয় দফা আন্দোলনও বহাল আছে। আমরা প্রশ্ন তুলেছি–কীভাবে দলীয় বয়ানকে সংবিধানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, কীভাবে একটি পরিবারকে সামষ্টিক সংগ্রামের ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে। ভবিষ্যৎ যেকোনো সরকার মুছে ফেলবে না–সংস্কার করবে।
দ্য উইক: আপনি যদি জামায়াত নিয়ে হতাশ হন এবং এনসিপিতেও আশ্বস্ত না হন, তাহলে জনগণের প্রকৃত আশা কার মধ্যে দেখেন?
মাহফুজ আলম: বিএনপি ও জামায়াত–দুটোরই বিশ্বাসযোগ্যতা ও দুর্বলতা আছে। আসল প্রশ্ন দল নয়–পরিবর্তন বাস্তবায়ন। এনসিপির বাইরে জুলাই থেকে জন্ম নেওয়া একাধিক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। আমরা সবাই একই চেতনা বহন করি। কোনো দলে যাই বা না যাই, আমরা রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব। এই সংগ্রাম আমাদের সারাজীবন চলবে।
দ্য উইক: আপনার এলাকা বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হওয়া সত্ত্বেও আপনি বিএনপিতে যোগ দেননি কেন?
মাহফুজ আলম: আমি পুরনো দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বদলে নতুন শক্তিগুলোর একটি বৃহত্তর জোটের অপেক্ষায় ছিলাম। এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন আমার কাছে স্পষ্ট হলো–তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। যেকোনো এমন জোটে শেষ পর্যন্ত জামায়াতই প্রভাব বিস্তার করত। এরপর পদত্যাগের পর আমি বিএনপির সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু ততদিনে তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
দ্য উইক: সবশেষে, আজ বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু কারা? এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে গড়তে কী করা উচিত?
মাহফুজ আলম: পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্ব কখনো স্থায়ী নয়। স্বার্থ বদলায়। ভারতকে জুলাই অভ্যুত্থানকে একটি প্রকৃত গণআন্দোলন হিসেবে স্বীকার করতে হবে। এটিকে ‘জুলাই-আগস্টের ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। পাকিস্তানের ইতিহাস দেখায়–অস্বীকার কোনো সমাধান নয়।
ভারতকে কেবল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নয়, জনগণের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তারা এখনো ষাট ও সত্তরের দশকের কণ্ঠগুলোর সঙ্গেই কথা বলে, নতুন প্রজন্মকে উপেক্ষা করে। আর ভারতীয় গণমাধ্যমকে বাংলাদেশকে প্রচারণার বিষয় হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। এখানে আসুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। বাস্তবতা তুলে ধরুন। এই তিনটি বিষয়: স্বীকৃতি, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম– অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য উইকের দিল্লি ব্যুরোর প্রধান নম্রতা বিজি আহুজা।

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট