অর্ণব সান্যাল

একজন বাবা দাঁড়িয়ে আছেন হাসপাতালে। বের করা হচ্ছে তার সন্তানের মরদেহ। বাবা কাঁদছেন। খুবই অসহায় সেই কান্না। একেবারে সব হারিয়ে ফেললে মানুষ যেভাবে কাঁদে, ঠিক সেভাবে। বেশিক্ষণ দেখা যায় না, চোখ কেমন জানি জ্বালা করে ওঠে!
তবু এমন সন্তানহারা বাবা-মায়ের কান্না আমরা দেখছি। দেখতে হচ্ছে। হামে শয়ে শয়ে শিশু এ পর্যন্ত মারা গেছে। এসব শিশুর সাথে জড়িয়ে শত শত পরিবার। হারানোর শোক তাই অনেক অনেক মানুষকে কাঁদতে বাধ্য করছে। সংবাদমাধ্যমগুলো এ নিয়ে প্রতিবেদন করছে ধারাবাহিকভাবে। সেসব ছবি, ভিডিও দেখতে দেখতে তাই হাম অনাক্রান্ত পরিবারেও ছড়িয়েছে আতঙ্ক। আর ওই চোখ জ্বালা করার বিষয়টি তো ন্যূনতম মানবিকতাসম্পন্ন মানুষের চোখকেও ভিজিয়ে দিতে সক্ষম।
হিসাব বলা যাক। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা) দেশে আরও সাত শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ছয় শিশুর। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৩৬৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭০ শিশু। মোট ৪৩৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৪ হাজার ৯৬৮ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৭ হাজার ৩০৫ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অর্থাৎ, হাজারে হাজারে শিশু হামে ভুগেছে এবং ভুগছে। শয়ে শয়ে শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। কারণ কী? হঠাৎ কেন হাম এতটা জীবনসংহারী হয়ে উঠল এই দেশে?
আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্স এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন করেছে সম্প্রতি। তাতে বলা হয়েছে, শিশুদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সিদ্ধান্তের পরই বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে সায়েন্স নামের জার্নালে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টিকার ব্যাপারে উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে–এমন সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও তাদের পরামর্শ আমলে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।
ফলাফল কী? ফল হলো–চার শরও বেশি শিশুর অকালমৃত্যু। এতগুলো বাচ্চা মরে গেল। শত শত বাবা-মায়ের কোল খালি হলো। বাবা-মায়ের তো সন্তান গেল। কারও গেল ভাগ্নে-ভাগ্নি, কারও ভাতিজা-ভাতিজি, কারও ভাই-বোন, কারও বা নাতি-নাতনি। তা এতগুলো মানুষের জীবনে শোক স্থায়ী রূপ পেল সরকারি কিছু ভুল ও অস্পষ্ট সিদ্ধান্তের কারণে। কারা ওই সময়ে সরকারে ছিলেন বা ছিলেন না, সেটি আসলে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তৎকালীন সরকারে থাকা তথাকথিত দায়িত্বশীলেরা ভুল করেছেন। সরকারে থেকে আসলে এতটা ‘কেয়ারলেস’ হওয়া যায় না। তা সেই সরকার রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক। এতগুলো শিশুর মৃত্যুর দায় কার? যদি সরকারের ভুল সিদ্ধান্তেরই হয়, তবে অবশ্যই তৎকালীন দায়িত্বশীলদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। তার আগে সঠিক ও পূর্ণ তদন্তও প্রয়োজন।
হাম নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এ কারণেই প্রয়োজন যে–আমাদের দেশে সরকারে থাকলেই যা খুশি তা-ই করে পার পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার অবসান হওয়া দরকার। এটি একটি দুষ্টচক্র। এ দেশের মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে উঠেছে যে, আমাদের বাংলাদেশে ক্ষমতাবানদের কোনো অন্যায়ের বিচার হয় না। একে সমর্থন করার মতো অসংখ্য ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি। ফলে আমাদের সমাজে বিচারহীনতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এর ব্যতিক্রমের উদাহরণ তৈরি করা না গেলে, এ দেশকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলাটাই একটা উপহাসের বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কারণ, শুধু ভোট দিতে পারাটাই গণতান্ত্রিক হওয়ার একমাত্র পূর্বশর্ত নয়। তাই নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে, শুধু ভোট দিতে পারলেই নাগরিকের মন সরকারের প্রতি আস্থায় গদগদ হয়ে উঠবে না।
অবশ্য এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি বলেছেন, বিগত সরকারেরর সময় হামের টিকার ব্যবস্থা না করার বিষয়ে যে তদন্তের কথা শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে বর্তমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্তে এখনও যায়নি। মন্ত্রী বলেছেন, “আমরা এখন ব্যস্ত দ্রুত সমস্যা (হামের টিকা) সমাধানে। চিকিৎসায় গুরুত্ব দেওয়া এখন বেশি জরুরি। বিগত সরকারের ভুলের বিষয়ে আমি এককভাবে কোনো চিন্তা করিনি। ভুলের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আমার মানুষকে, বাচ্চাদেরকে, মায়েদেরকে রক্ষা করাটা বেশি দরকার। ওইটাই আমি চেষ্টা করছি।”
তদন্তের বিষয়ে সরকার নজর দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, “তদন্ত করব না, সে কথা তো আমি বলিনি। সেটা হবে সংকট সমাধানের পর।”
ভালো কথা। সরকার সংকট মোকাবিলায় বেশি মনযোগ দিচ্ছে, এটি যে কোনো নাগরিককেই স্বস্তি দেবে কিছুটা হলেও। কিন্তু সংকট আসলেই কি ঠিকঠাকভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে? অন্তত চট্টগ্রামের সুমন জলদাসের বক্তব্যে তা মনে হচ্ছে না। দৈনিক প্রথম আলো’কে সুমন বলেছেন, “আমার মেয়ের হাম হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন তাকে আইসিইউতে ভর্তি করাতে হবে। সরকারি হাসপাতালে অনেক ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও আইসিইউ বেড খালি পাইনি। বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। এখন মেয়ে সুস্থ আছে, কিন্তু হাসপাতালের বিল অনেক বেশি এসেছে। স্ত্রীর সব গয়না বিক্রি করেও পুরো বিল হচ্ছে না। আমরা গরিব মানুষ, ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। তবু হাসপাতাল থেকে মেয়েকে ছাড়ছে না।”
মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা সুমন জলদাস এই দেশের অত্যন্ত সাধারণ একজন নাগরিক। এ সমাজে তিনি নিম্নবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি মেয়ের হামের চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে করাতে পারেননি। মেয়েটাকে বাঁচাতে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়েছেন। সেখানে তাকে অকাতরে অর্থ খরচ করতে হয়েছে। মেয়ের জীবন বলে কথা! কিন্তু বিত্তের হিসাবে এ দেশের একজন ‘গরিব’ মানুষ কতটা আর খরচ করতে পারেন? এখন মেয়ে সুস্থ হওয়ার পর সেই সুস্থ মেয়েটাকে তিনি বাড়ি নিয়ে যেতে পারছেন না। কারণ হাসপাতাল ছাড়ছে না, টাকা না পেলে সুস্থ বাচ্চাটাকেও ছাড়া হবে না!

একটি দেশে কোনো সংকট মোকাবিলায় সরকার পাসমার্ক পাচ্ছে কিনা, তা নির্ভর করে আসলে সুমন জলদাসদের মতো মানুষের পাশে সরকার কতটা আছে, তার ভিত্তিতে। কী মনে হয়? সুমনের পাশে সরকার বরাবরই আছে? থাকলে কি সুমনের সুস্থ মেয়েটাকে শুধু টাকার জন্যই আটকে রাখতে পারত কোনো হাসপাতাল? সুমন কি সরকারি হাসপাতালে বাচ্চাকে কম খরচে সুস্থ করে তোলার একটু সুযোগ পেত না?
সুমনকে পুরোপুরি নিঃস্ব করেও শান্তি দিচ্ছে না বর্তমান সরকারি ব্যবস্থাই। অসুস্থ অবস্থায় একজন মানুষ ও তার পরিবার সবচেয়ে ‘অসহায়’ অবস্থায় থাকে। সেই অসুস্থতা যদি পরিবারের কয়েক মাস বা বছরের শিশুর হয়, তাহলে সেই অসহায় অবস্থা কতটা তীব্র হয়ে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অথচ, তেমন পরিস্থিতিতে গিয়েই এখানে সন্তান হারানোর শোক পেতে হচ্ছে বাবা-মা’কে। সন্তান বেঁচে ফিরলে নিতে হচ্ছে অসহনীয় আর্থিক চাপ।
তা, এমন সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ বা পরিস্থিতি মোকাবিলা–সব ক্ষেত্রেই কি কেবল বাগাড়ম্বর দিয়ে পার পাওয়া যাবে? শুধু মুখের কথায় কি চিঁড়া ভিজবে? নাকি উন্নতির চেষ্টাকে দৃশ্যমান করাটা জরুরি?
কমনসেন্স শেষ বিষয়টাতেই জোর দিতে বলে। তবে এতদিনের নাগরিক অভিজ্ঞতা আবার ভরসা রাখতে না করে। তবে কি হামে সন্তানহারা বাবা-মা’কে শুধুই ‘স্যরি’ বলে দেওয়া হবে? সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব বাবা-মা’কে বলা হবে, ‘টেক ইট ইজি?’
কে জানে! যে দেশে শিশুদের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি চলে, সেখানে আর কীই বা ভাবার আছে?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

একজন বাবা দাঁড়িয়ে আছেন হাসপাতালে। বের করা হচ্ছে তার সন্তানের মরদেহ। বাবা কাঁদছেন। খুবই অসহায় সেই কান্না। একেবারে সব হারিয়ে ফেললে মানুষ যেভাবে কাঁদে, ঠিক সেভাবে। বেশিক্ষণ দেখা যায় না, চোখ কেমন জানি জ্বালা করে ওঠে!
তবু এমন সন্তানহারা বাবা-মায়ের কান্না আমরা দেখছি। দেখতে হচ্ছে। হামে শয়ে শয়ে শিশু এ পর্যন্ত মারা গেছে। এসব শিশুর সাথে জড়িয়ে শত শত পরিবার। হারানোর শোক তাই অনেক অনেক মানুষকে কাঁদতে বাধ্য করছে। সংবাদমাধ্যমগুলো এ নিয়ে প্রতিবেদন করছে ধারাবাহিকভাবে। সেসব ছবি, ভিডিও দেখতে দেখতে তাই হাম অনাক্রান্ত পরিবারেও ছড়িয়েছে আতঙ্ক। আর ওই চোখ জ্বালা করার বিষয়টি তো ন্যূনতম মানবিকতাসম্পন্ন মানুষের চোখকেও ভিজিয়ে দিতে সক্ষম।
হিসাব বলা যাক। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা) দেশে আরও সাত শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ছয় শিশুর। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৩৬৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭০ শিশু। মোট ৪৩৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৪ হাজার ৯৬৮ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৭ হাজার ৩০৫ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অর্থাৎ, হাজারে হাজারে শিশু হামে ভুগেছে এবং ভুগছে। শয়ে শয়ে শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। কারণ কী? হঠাৎ কেন হাম এতটা জীবনসংহারী হয়ে উঠল এই দেশে?
আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্স এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন করেছে সম্প্রতি। তাতে বলা হয়েছে, শিশুদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সিদ্ধান্তের পরই বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে সায়েন্স নামের জার্নালে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টিকার ব্যাপারে উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে–এমন সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও তাদের পরামর্শ আমলে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।
ফলাফল কী? ফল হলো–চার শরও বেশি শিশুর অকালমৃত্যু। এতগুলো বাচ্চা মরে গেল। শত শত বাবা-মায়ের কোল খালি হলো। বাবা-মায়ের তো সন্তান গেল। কারও গেল ভাগ্নে-ভাগ্নি, কারও ভাতিজা-ভাতিজি, কারও ভাই-বোন, কারও বা নাতি-নাতনি। তা এতগুলো মানুষের জীবনে শোক স্থায়ী রূপ পেল সরকারি কিছু ভুল ও অস্পষ্ট সিদ্ধান্তের কারণে। কারা ওই সময়ে সরকারে ছিলেন বা ছিলেন না, সেটি আসলে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তৎকালীন সরকারে থাকা তথাকথিত দায়িত্বশীলেরা ভুল করেছেন। সরকারে থেকে আসলে এতটা ‘কেয়ারলেস’ হওয়া যায় না। তা সেই সরকার রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক। এতগুলো শিশুর মৃত্যুর দায় কার? যদি সরকারের ভুল সিদ্ধান্তেরই হয়, তবে অবশ্যই তৎকালীন দায়িত্বশীলদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। তার আগে সঠিক ও পূর্ণ তদন্তও প্রয়োজন।
হাম নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এ কারণেই প্রয়োজন যে–আমাদের দেশে সরকারে থাকলেই যা খুশি তা-ই করে পার পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার অবসান হওয়া দরকার। এটি একটি দুষ্টচক্র। এ দেশের মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে উঠেছে যে, আমাদের বাংলাদেশে ক্ষমতাবানদের কোনো অন্যায়ের বিচার হয় না। একে সমর্থন করার মতো অসংখ্য ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি। ফলে আমাদের সমাজে বিচারহীনতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এর ব্যতিক্রমের উদাহরণ তৈরি করা না গেলে, এ দেশকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলাটাই একটা উপহাসের বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কারণ, শুধু ভোট দিতে পারাটাই গণতান্ত্রিক হওয়ার একমাত্র পূর্বশর্ত নয়। তাই নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে, শুধু ভোট দিতে পারলেই নাগরিকের মন সরকারের প্রতি আস্থায় গদগদ হয়ে উঠবে না।
অবশ্য এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি বলেছেন, বিগত সরকারেরর সময় হামের টিকার ব্যবস্থা না করার বিষয়ে যে তদন্তের কথা শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে বর্তমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্তে এখনও যায়নি। মন্ত্রী বলেছেন, “আমরা এখন ব্যস্ত দ্রুত সমস্যা (হামের টিকা) সমাধানে। চিকিৎসায় গুরুত্ব দেওয়া এখন বেশি জরুরি। বিগত সরকারের ভুলের বিষয়ে আমি এককভাবে কোনো চিন্তা করিনি। ভুলের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আমার মানুষকে, বাচ্চাদেরকে, মায়েদেরকে রক্ষা করাটা বেশি দরকার। ওইটাই আমি চেষ্টা করছি।”
তদন্তের বিষয়ে সরকার নজর দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, “তদন্ত করব না, সে কথা তো আমি বলিনি। সেটা হবে সংকট সমাধানের পর।”
ভালো কথা। সরকার সংকট মোকাবিলায় বেশি মনযোগ দিচ্ছে, এটি যে কোনো নাগরিককেই স্বস্তি দেবে কিছুটা হলেও। কিন্তু সংকট আসলেই কি ঠিকঠাকভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে? অন্তত চট্টগ্রামের সুমন জলদাসের বক্তব্যে তা মনে হচ্ছে না। দৈনিক প্রথম আলো’কে সুমন বলেছেন, “আমার মেয়ের হাম হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন তাকে আইসিইউতে ভর্তি করাতে হবে। সরকারি হাসপাতালে অনেক ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও আইসিইউ বেড খালি পাইনি। বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। এখন মেয়ে সুস্থ আছে, কিন্তু হাসপাতালের বিল অনেক বেশি এসেছে। স্ত্রীর সব গয়না বিক্রি করেও পুরো বিল হচ্ছে না। আমরা গরিব মানুষ, ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। তবু হাসপাতাল থেকে মেয়েকে ছাড়ছে না।”
মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা সুমন জলদাস এই দেশের অত্যন্ত সাধারণ একজন নাগরিক। এ সমাজে তিনি নিম্নবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি মেয়ের হামের চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে করাতে পারেননি। মেয়েটাকে বাঁচাতে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়েছেন। সেখানে তাকে অকাতরে অর্থ খরচ করতে হয়েছে। মেয়ের জীবন বলে কথা! কিন্তু বিত্তের হিসাবে এ দেশের একজন ‘গরিব’ মানুষ কতটা আর খরচ করতে পারেন? এখন মেয়ে সুস্থ হওয়ার পর সেই সুস্থ মেয়েটাকে তিনি বাড়ি নিয়ে যেতে পারছেন না। কারণ হাসপাতাল ছাড়ছে না, টাকা না পেলে সুস্থ বাচ্চাটাকেও ছাড়া হবে না!

একটি দেশে কোনো সংকট মোকাবিলায় সরকার পাসমার্ক পাচ্ছে কিনা, তা নির্ভর করে আসলে সুমন জলদাসদের মতো মানুষের পাশে সরকার কতটা আছে, তার ভিত্তিতে। কী মনে হয়? সুমনের পাশে সরকার বরাবরই আছে? থাকলে কি সুমনের সুস্থ মেয়েটাকে শুধু টাকার জন্যই আটকে রাখতে পারত কোনো হাসপাতাল? সুমন কি সরকারি হাসপাতালে বাচ্চাকে কম খরচে সুস্থ করে তোলার একটু সুযোগ পেত না?
সুমনকে পুরোপুরি নিঃস্ব করেও শান্তি দিচ্ছে না বর্তমান সরকারি ব্যবস্থাই। অসুস্থ অবস্থায় একজন মানুষ ও তার পরিবার সবচেয়ে ‘অসহায়’ অবস্থায় থাকে। সেই অসুস্থতা যদি পরিবারের কয়েক মাস বা বছরের শিশুর হয়, তাহলে সেই অসহায় অবস্থা কতটা তীব্র হয়ে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অথচ, তেমন পরিস্থিতিতে গিয়েই এখানে সন্তান হারানোর শোক পেতে হচ্ছে বাবা-মা’কে। সন্তান বেঁচে ফিরলে নিতে হচ্ছে অসহনীয় আর্থিক চাপ।
তা, এমন সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ বা পরিস্থিতি মোকাবিলা–সব ক্ষেত্রেই কি কেবল বাগাড়ম্বর দিয়ে পার পাওয়া যাবে? শুধু মুখের কথায় কি চিঁড়া ভিজবে? নাকি উন্নতির চেষ্টাকে দৃশ্যমান করাটা জরুরি?
কমনসেন্স শেষ বিষয়টাতেই জোর দিতে বলে। তবে এতদিনের নাগরিক অভিজ্ঞতা আবার ভরসা রাখতে না করে। তবে কি হামে সন্তানহারা বাবা-মা’কে শুধুই ‘স্যরি’ বলে দেওয়া হবে? সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব বাবা-মা’কে বলা হবে, ‘টেক ইট ইজি?’
কে জানে! যে দেশে শিশুদের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি চলে, সেখানে আর কীই বা ভাবার আছে?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সলিল ছাড়াও সুকান্তর কবিতাকে গানে রূপ দিয়েছেন আরও কয়েকজন সুরকার। কিন্তু সলিল হেমন্তের সহযোগিতায় সুকান্তর গানকে যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন, তা আর কেউ পারেননি। সলিল ও হেমন্ত পারলেন কেন? সম্ভবত আর কেউ গণমানুষের কবি সুকান্ত এবং তার সৃষ্টিকে তাদের মতো করে এত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেননি বলে।