এই শাসনব্যবস্থা ও সর্বব্যাপী নীরবতা আমাকে প্রায়শই ভাবিয়ে তুলত যে, আমি কি ভারতে ফিরে এসে সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেলাম? কিন্তু আজ সেই দীর্ঘকাল নিস্তব্ধ হয়ে থাকা গণতন্ত্রের চেতনাকে পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখে- আমি নিজের মধ্যে আবার প্রাণ খুঁজে পেয়েছি, যদিও তা সাময়িক।
গত সোমবার দিল্লির রাস্তায় যা কিছু প্রত্যক্ষ করেছি, তা অনুধাবন করার চেষ্টা করতে করতে গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ ভান্না বৈদেহী ভার্গবের এই লাইনগুলো পড়ি। নিজে একজন দক্ষ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হওয়ার সুবাদে বুঝতে পারি, তার এই কথাগুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে যে, কেন ২০২৬ সালের ২০ জুলাই দিনটিকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রাখা হতে পারে।
আমি আগেও আমার লেখায় যুক্তি দিয়েছি যে, আমরা যখন প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদ থেকে ধীরে ধীরে নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছি, তখন বিরোধী রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে প্রতিরোধের রাজনীতিতে রূপান্তর করা প্রয়োজন।
দিল্লির যন্তর মন্তরের এই প্রতিবাদ বিক্ষোভটি ঠিক সেই প্রতিরোধের রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, তারই এক নিখুঁত উদাহরণ। এখানে প্রধানত সাতটি কারণ উল্লেখ করা হলো, যা এই আন্দোলনটিকে একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে চিহ্নিত করে।
প্রথমত, প্রতিবাদের বিশাল জনসমাগম। আন্দোলনকারীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ণয় করা কারো পক্ষেই হয়তো সম্ভব নয়। তবে আয়োজকেরা যে ১৫-২০ হাজার মানুষ আসার আশা করেছিলেন, উপস্থিতি যে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ড্রোন থেকে তোলা ছবি ও দৃশ্যপট নির্দেশ করে যে লক্ষাধিক মানুষ এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিলেন।
যা একটি সাধারণ মিছিল হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে একটি বিশাল জনসভায় এবং পরবর্তীতে এক উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দুপুরের মধ্যেই দিল্লির সংসদ ভবনের দিকে যাওয়া প্রতিটি রাস্তা ও মোড় আন্দোলনকারীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এটি যেন ভারতের নিজস্ব ‘অকুপাই’ আন্দোলনের মুহূর্ত ছিল।

দ্বিতীয়ত, এটি কোনো কৃত্রিম জমায়েত ছিল না। বরং সম্পূর্ণ একটি স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক সংহতি ছিল। কোনো ভাড়াটে রাজনৈতিক সমাবেশ বা সাংগঠনিক শক্তির চটকদার প্রদর্শনী থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে, যন্তর মন্তরের এই প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল মূলত নিজের তাগিদে আসা তরুণ সমাজ। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি আহ্বানে সাড়া দিয়ে, নিজ খরচে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দীর্ঘ পথ হেঁটে সেখানে এসে পৌঁছেছিল। এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ও সুসংবদ্ধ পদক্ষেপ আমি এর আগে শেষ দেখেছিলাম ২০২১ সালে কৃষক আন্দোলনের বিখ্যাত সাধারণতন্ত্র দিবসের ট্র্যাক্টর মিছিলে।
তৃতীয়ত, এই প্রতিবাদের মধ্যে দেখা গেছে এক অদ্ভূত ও নজরকাড়া বৈচিত্র্য। আমার এক বন্ধু যেমনটি বলেছিলেন, এটি ছিল এক ‘সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্য’। সেখানে আমার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল অরুণাচল প্রদেশ থেকে আসা এক তরুণ, হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালা থেকে আসা একদল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক, হুইলচেয়ারে এসেছে স্প্যানিশভাষী শিক্ষার্থী এবং দেরাদুন থেকে আসা একদল ছাত্রীর।
এছাড়া, উত্তর প্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশ থেকে আগত অসংখ্য তরুণ-তরুণী, অভিজাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সাধারণ জাতীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বহু পরীক্ষার্থীর দেখা মেলে, যারা মুখার্জি নগরের মতো বিভিন্ন কোচিং সেন্টার হাব থেকে এসেছিলেন। এই সমাবেশে নারীদের বিপুল উপস্থিতি ছিল সত্যি প্রশংসনীয়। তারা কেউ বাধা ধরা আন্দোলনের মুখ ছিলেন না। এদের অধিকাংশই জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এদের অনেকের পরিবারই এতদিন বিজেপিকে সমর্থন করে এসেছে, এমনকি তারা নিজেরাও গতকাল পর্যন্ত বিজেপি সমর্থক ছিলেন। শাসক দলের জন্য এই পরিবর্তনটি নিশ্চিতভাবেই অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হতে হবে।
চতুর্থত, যে বিষয়টি এই তরুণের দলকে একত্রিত করেছিল তা সাম্প্রতিক সময়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্থায়ী। অবশ্যই সেখানে এমন শিক্ষার্থীরা ছিলেন যারা নিট (এনইইটি) বাতিল কিংবা সিবিএসই কেলেঙ্কারির সরাসরি শিকার হয়েছেন। সেখানে এমন বাবা-মাও ছিলেন যারা এই শিক্ষাব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার কারণে নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ হারিয়ে শোকাহত। তবে সরাসরি ভুক্তভোগীদের চেয়েও বড় অংশ ছিল সম্ভাব্য ভুক্তভোগী তরুণের দল।
তারা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে আগামীকাল হয়তো তাদের পালা আসবে। কারণ তারা স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করছে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থা একদম ভেঙে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভ তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এর পেছনে থাকা আসল তাগিদ হলো একটি সমতাভিত্তিক, অর্থপূর্ণ এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা লাভ করা এবং সকলের জন্য কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা। ১৯৭৪ সালে বিহারে সংঘটিত জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের পর- এই প্রথম কোনো যুব আন্দোলন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে দেশের মূল জাতীয় এজেন্ডার কেন্দ্রে এনে দাঁড় করাল।
পঞ্চমত, প্রতিরোধের এই নতুন ধারা কোনো নির্দিষ্ট নাম বা ব্র্যান্ডের মুখাপেক্ষী নয়। সোনম ওয়াংচুক নিঃসন্দেহে এই তরুণদের চোখে একজন নায়ক। তবে আন্না হাজারের আন্দোলনের সময় যে ব্যক্তিপূজার উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল, এখানে তা অনেক বেশি সংযত ও পরিমিত। তরুণ সমাজ সিজেপি ও তার নেতৃত্বের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে পেরেছে, কিন্তু প্রয়োজনবোধে তারা সুস্থ ও গঠনমূলক সমালোচনা করতেও পিছপা হয়নি। তারা মঞ্চ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক কর্মীদের বক্তব্য শুনেছে ও করতালি দিয়েছে। তবে কোনো এক একক ব্যক্তিত্বের দ্বারা তারা সম্পূর্ণ অন্ধভাবে চালিত হয়নি। এই ধরনের গণতান্ত্রিক ও উন্মুক্ত চিন্তা ভারতের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক এক বার্তা বহন করে।

ষষ্ঠত, সমাবেশ জুড়ে বারবার ধ্বনিত হওয়া ‘গোদি মিডিয়া, ফিরে যাও’ স্লোগানটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের তরুণ সমাজ মূলধারার গণমাধ্যমের তৈরি করা বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভকে অতিক্রম করার পথ খুঁজে পেয়েছে। গত এক মাস ধরে নয়ডার টিভি চ্যানেলগুলো এবং দেশের তথাকথিত মূলধারার সংবাদপত্রগুলো যন্তর মন্তরের এই আন্দোলনকে হয় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে, না হয় আন্দোলনকারীদের উপহাস কিংবা দেশদ্রোহী বানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও শাসকগোষ্ঠীর সব হিসাব-নিকাশ এবং তাদের প্রচার মাধ্যমগুলোর সব চেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। ঠিক যেমনটা কৃষক আন্দোলনের সময় হয়েছিল।
গণমাধ্যমের এই ব্ল্যাকআউট বা বয়কট আসলে আন্দোলনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারস্পরিক কথাবার্তা এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো বিকল্প তথ্য চ্যানেল তৈরি করতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। তাদের তৈরি পোস্টারগুলো ছিল দারুণ ক্ষুরধার ও অর্থপূর্ণ। একটি পোস্টারে লেখা ছিল, ‘গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা আন্দোলনে নয়, রাষ্ট্র বা সরকার কীভাবে এতে সাড়া দেয় তার ওপর নির্ভর করে।’ তাদের স্লোগানগুলো ছিল অত্যন্ত সৃজনশীল। আমি যেমন সেখানে একটি নতুন স্লোগান শুনলাম— ‘যখনি মোদী ভয় পায়, হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি নিয়ে আসে।’ অর্থাৎ, সরকারের চাপিয়ে দেওয়া কর্তৃত্ববাদী বয়ান এখন স্পষ্টভাবে ফুটো হয়ে যেতে শুরু করেছে।
সপ্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০ জুলাইয়ের এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে ভয়ের যে এক অদৃশ্য মায়াজাল এতদিন তরুণদের ঘিরে ছিল, তা অবশেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আজকের তরুণ সমাজ ভালোভাবেই বোঝে যে এই বর্তমান শাসনের অধীনে তাদের ওপর কীভাবে ডিজিটাল নজরদারি চালানো হতে পারে বা প্রোফাইলিং করা হতে পারে– যা আন্না হাজারের আন্দোলনের সময় ছিল না। এই সম্ভাব্য সুরক্ষার ঝুঁকি এবং ভয়ের কারণেই আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রথম দু-সপ্তাহ অনেক শিক্ষার্থী যন্তর মন্তরে আসতে কিছুটা দ্বিধা বোধ করেছিল। কিন্তু সোমবার কোনো এক অদ্ভুত কারণে সেই ভয়ের দেওয়াল ভেঙে পড়ে। হয়তো বিশাল জনতার উপস্থিতির নিরাপত্তা, হয়তো হতাশার চরম সীমা থেকে তৈরি হওয়া এক অদম্য সাহস, কিংবা হয়তো কোনো ক্ষীণ আশার আলো তাদের এই সাহস জুগিয়েছে। তবে এই তরুণরা নিজেদের আওয়াজ তুলতে, ছবি তুলতে বা এমনকি টিয়ার গ্যাসের মুখোমুখি হতে বিন্দুমাত্র ভয় পায়নি।
অত্যন্ত নীরবে হলেও এই আন্দোলনটি ভারতের সামাজিক ন্যায়বিচারের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। আজ ভারতের যুবসমাজ এমন একটি আন্দোলনের অধীনে এক ছাতার নিচে এসেছে, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন দলিত প্রতিনিধি, অভিজিৎ দীপকে এবং যা অনুপ্রাণিত হয়েছে একজন আদিবাসী ব্যক্তিত্ব, সোনম ওয়াংচুকের দ্বারা। এটি কেবল চিরাচরিত তথাকথিত এসসি/এসটি সংক্রান্ত বিষয়াবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশ বা ব্যবস্থার কাছে নিজেদের অধিকার বা ভাগ পাওয়ার দাবির পরিবর্তে, এই বহুজন রাজনীতি এখন নিজেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে যে মূল দেশ বা রাষ্ট্র বলতে আসলে কী বোঝায়।
গত বহু মাস ধরে, ভারতে ভবিষ্যতের রাজনীতি নিয়ে যখনই কেউ আমাকে প্রশ্ন করেছেন, আমি একটি নির্দিষ্ট বাক্যই বারবার বলে এসেছি, “প্রশ্ন এটা নয় যে দেশের জনগণ একনায়কত্ব বা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবে কি দাঁড়াবে না। প্রশ্ন শুধু এতটুকুই যে, জনগণ যখন শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়াবে, তখন আমরা আবার নিজেদের লড়াই ছেড়ে হতাশ হয়ে বসে পড়ব না তো?”
গত সোমবার আমি সেই ইতিহাস আমার নিজের চোখের সামনে উন্মোচিত হতে দেখেছি। সেদিন দেশের সাধারণ জনগণ স্বাধিকারের দাবিতে সশরীরে উঠে দাঁড়িয়েছিল। আর তাদের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের পাশে, সশরীরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমিও।
লেখক: স্বরাজ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং ভারত জোড়ো অভিযানের জাতীয় আহ্বায়ক।
(এই লেখাটি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)