Advertisement Banner

শেয়ারবাজারে প্রাণ সঞ্চারে আইপিও ফিরবে কবে?

শেয়ারবাজারে প্রাণ সঞ্চারে আইপিও ফিরবে কবে?
শেয়ার বাজার সূচক। ছবি: পেক্সেলস

বলা হয়, ডেনমার্কের যুবরাজ ছাড়া হ্যামলেট মঞ্চস্থ হতে পারে না। তেমনি সাধারণ বিনিয়োগকারী ছাড়া পুঁজিবাজার চলতে পারে না। আইপিও হলো পুজিঁবাজারের প্রাণ। বলাবাহুল্য, জনগণের সঞ্চিত অর্থ আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধির কাজে ব্যয়িত হয়। ব্যাংকের ঋণের বোঝা বহন করতে হয় না।

১৯৮৭-৮৮ সালে যখন সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠান শেয়ার ছাড়তে শুরু করে, তখন জনগণ বিপুল সাড়া দিয়েছিল। ১০০ টাকা মূল্যের শেয়ারের ওপর ৮০০ টাকা প্রিমিয়াম মানি প্রদান করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনেছিলেন। এমনকি অনেক গৃহিনীও শেয়ারবাজারে ঝুঁকেছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৯-১০ সালে শেয়ারবাজারে দুটি মহাপ্রলয় ঘটে। এতে একতরফাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন নিরীহ সাধারণ বিনিয়োগকারী। এই বিপর্যয়ের কাহিনি বিশদভাবে শিগগিরই লেখার ইচ্ছা রইল। এর ইতিহাস সবার জানা প্রয়োজন।

১৯৯৬ সালে এবং ২০০৯-১০ সালে শেয়ারবাজারে যে মহাপ্রলয় ঘটে, তাতে কিন্তু শেয়ারবাজারের ব্রোকাররা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হননি। এই প্রসঙ্গে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের কথা মনে পড়ছে। এক সময় দেশে যখন রুগ্নশিল্পের বিষয়ে আলোচনা বাড়তে লাগল, তখন তিনি বলেছিলেন–শিল্প রুগ্ন হয়, কিন্তু মালিকেরা তো রুগ্ন হন না। ১৯৯৬ সালে যখন শেয়ারবাজার তুঙ্গে, তখন শেয়ারবাজারের ব্রোকারদের ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশে যাওয়ার আগ্রহ এত বেড়েছিল যে, একজন ব্রোকার তো ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত ছিলেন আমেরিকান ভিসা সংগ্রহে। দুই দফা মহাপ্রলয়ের পর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নীরব নিথর হয়ে পড়েন, যাকে বলা যায় All quiet on the sharemarket front। দীর্ঘদিন ধরে স্টক এক্সচেঞ্জে মন্থর ভাব বিরাজ করছে।

ইতোমধ্যে কাঠামোগত বড় ধরনের পরিবর্তন আসে পুঁজিবাজারে। স্টক এক্সচেঞ্জ ছিল সদস্য প্রতিষ্ঠান। সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত কাউন্সিল সকল ক্ষমতার মালিক। পরে ১৯৯৩ সালে শেয়ার মার্কেট নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সংস্থাটি সঠিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারছিল না। এরপর ২০১৪ সালে ডিমিউচিয়ালাইজেশন করার পর একদিকে যেমন বিএসইসি সক্রিয় হয়ে ওঠে, অপরদিকে শেয়ারবাজার পরিচালনা পর্ষদ সদস্য মুক্ত হয় এবং আমলাতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।

আগেই বলেছি, আইপিও; অর্থাৎ, প্রাথমিক গণ-আহ্বান হলো শেয়ারবাজারের প্রাণ। অথচ গত ১৮ মাসে একটি আইপিও বাজারে ছাড়া হয়নি। এদিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে অনেক কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার দীর্ঘকালের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কয়েকবার জনসমক্ষে কথা দিয়েছিলেন, এসব শেয়ারবাজারে ছাড়া হবে। কিন্তু তার কথা পালন করা হয়নি। তিনি নিজেও একজন আমলা ছিলেন। তারপরও আমলাদের ক্ষমতা অতিক্রম করতে পারেননি। ১০০ বছরের বেশি সময় আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন “ব্যুরোক্রেসি বলিতে সর্বত্রই সেই কর্তাদের বোঝায় যারা বিধাতার সৃষ্ট মানুষলোক লইয়া কারবার করে না, যারা নিজের বিধান রচিত একটা কৃত্রিম জগতে প্রভুর জাল বিস্তার করে।” এ কথার কি আজও কোনো হেরফের হয়েছে।

কিছুদিন আগে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক হয়। ১৯২০ সালে ভারতবর্ষ–সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি নিয়ে ইংরেজ শাসকেরা গোলটেবিল বৈঠকের ব্যবস্থা করে। তখন থেকে এই বৈঠক ব্যাপকভাবে চালু রয়েছে। অবশ্য টেবিলের আকৃতি গোল হতে হবে–এমন নয়। তবে কথাটি ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে জ্ঞানীজন তাদের জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের সমৃদ্ধ করেন। যা হোক, এমনি একটি আলোচনা সভায় আমাদের দেশের শিল্পগোষ্ঠীর কেউ কেউ আইপিও আনতে কিছু কৃত্রিম বাধার কথা বলেন। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এর আগে একমাসে একাধিক আইপিও এসেছে। পুঁজিবাজারের ওপর আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা জটিলতা দেখা যেতে পারে। তবে উদ্যোক্তরা সক্রিয় হলে এ বাধা দূর করা অসম্ভব ছিল না। অবশ্য আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বদ্ধি পাওয়ায় কিছু কিছু বিধিনিষেধ বারবার আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে ভিন দেশের বিধিনিষেধ নিজ দেশে কতটা প্রযোজ্য হবে–এটা আমলারা ভাবতে চান না। আর তা যদি ট্রাম্পের দেশের হয়, তাহলে তো কথা নেই। ব্যাপক টাকা ব্যয় করে বিদেশে রোড শো করা হয়। এটি সম্পূর্ণ অর্থহীন। ১৯৯২ সালে প্রথম বাংলাদেশে অনাবাসিকদের পরিচয়ে বিদেশিদের শেয়ারবাজারে আসার অনুমতি দেওয়া হয়। আর অনাবাসিকদের জন্য বিধিবিধান অত্যন্ত উদার করা হয়েছে, যা আন্তজার্তিক মানের তূল্য।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। তিনি সকল বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তাই কিছু কিছু শিল্পগোষ্ঠীর নেতারা আইপিও ছাড়ার ব্যাপারে যেসব অভিযোগ কিংবা প্রতিবন্ধকতার কথা বলেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের অনেকের ২/১টি কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে আমাদের এখন অন্যতম প্রধান দায়িত্ব সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আবার বাজারে ফিরিয়ে আনার। যুদ্ধপ্রিয় ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কোন পর্যায় নিয়ে যাবেন, তা তো অনুধাবন করা কঠিন। ট্রাম্প সৌভাগ্যবান। কারণ, নেতানিয়াহুর মতো নিবেদিত, আন্তরিক ও ভয়াবহ যুদ্ধপ্রিয় বন্ধু বিশ্বের ইতিহাসে আর কোনো নেতা পাননি। এমনকি হিটলারও নয়।

আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য আমাদের দেশপ্রিয় নাগরিকের প্রেরণা কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে আনতে হলে তাদেরকে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক করে দিতে হবে।

প্রথমত: বলতে হবে, নিজের সঞ্চিত/গচ্ছিত অর্থ দিয়ে শেয়ার কিনতে হবে। ধার করা টাকা দিয়ে শেয়ারে বিনিয়োগ কোনো অবস্থাতে কাম্য নয়। অবশ্য মার্চেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ভিন্ন কথা।

দ্বিতীয়ত: বিনিয়োগ করে রাতারাতি লাখপতি হওয়ার চিন্তা করা কাম্য নয়। সময় দিতে হবে।

তৃতীয়ত: সব টাকা একই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে না।

চতুর্থত: যাকে চূড়ান্ত বলা যায়, তা হলো শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আকাশ মূল্যবৃদ্ধির সীমারেখা নয়।

দুটো প্রলয়ের সময় লক্ষ্য করা গেছে, শেয়ারের মূল্য যখন যুক্তিহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন একদল বিজ্ঞজন মূল্যবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ না দিয়ে সরকার বা ব্যাংকগুলোকে বেশি ঋণ প্রদানের আহ্বান জানান। এতে অনেক সরল বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হন।

লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

সম্পর্কিত