ads

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান: শোকযাত্রা থেকে দ্রোহযাত্রার রূপান্তর

রাফিকুজ্জামান ফরিদ
রাফিকুজ্জামান ফরিদ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান: শোকযাত্রা থেকে দ্রোহযাত্রার রূপান্তর

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জীবনস্মৃতিতে একটা বড় স্থান নিয়ে থাকবে আজীবন। গণঅভ্যুত্থান দেখতে ও তাতে অংশগ্রহণ করতে সকলে পারে না। আমাদের সে সুযোগ হয়েছিল। এই আন্দোলনের প্রধান কারিগর ছিল জনগণ। এত ব্যাপক ও বিচিত্র ধরণের জনসম্পৃক্ততা আর এত বড় সংখ্যায় প্রাণহানি স্বাধীনতা পরবর্তীকালের বাংলাদেশে কখনো দেখা যায়নি। আমি ছাত্র আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম এবং এই বিরাট মিছিলের একজন ছিলাম। আমরা সকলে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে আন্দোলনের যে প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছিলাম, তার নেতৃত্বেই আন্দোলনে ছিলাম। সেখানে আমার সংগঠন ‘সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট’ ও ছাত্র সংগঠনগুলোর যে জোটে আমরা আছি, সেই ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’ তাদের সাধ্য অনুসারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

শোক থেকে দ্রোহ

Advertisement

একেবারে শুরু থেকে দীর্ঘ ইতিহাস বলা অপ্রয়োজনীয়; তবে যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আমরা নিতে পেরেছিলাম– সেটা উল্লেখ করা মনে হয় জরুরি। ১৬ জুলাই, রংপুরে শহীদ আবু সাইদের দুহাত প্রসারিত করে শাসকের বুলেটকে আহ্বান করার দৃশ্য এই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতীকে পরিণত হয়। আবু সাইদ যে মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ হন তখন তার কাছেই ছিলেন ছাত্র ফ্রন্ট রংপুর জেলা শাখার সভাপতি সাজু বাসফোর। সাজুই রিকশা করে গুলিবিদ্ধ আবু সাইদকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সাজু বাসফোর আবু সাইদ হত্যা মামলার একজন অন্যতম সাক্ষী।

১৯ জুলাই রাতে ফ্যাসিট হাসিনা সরকার কারফিউ জারি করে, বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট সংযোগ, রাস্তার মোড়ে মোড়ে সেনাবাহিনীর টহল আর সাঁজোয়াযান। কারফিউ জারির পর ২৬ জুলাই রাস্তায় প্রথম পা দেন সংস্কৃতিকর্মীরা, গানের মিছিলের মাধ্যমে। এই দিনে বিকেলে পল্টন এলাকায় শোক মিছিল করে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’। শোক মিছিল থেকে ছাত্র-জনতাকে হত্যার দায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করা হয়। ২৭ জুলাই সকালে পল্টন মোড়ে ‘ছাত্র-জনতার পাশে নারী সমাজ’ ব্যানারে বামপন্থী নারী সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নারীদের অংশগ্রহণে শিক্ষার্থী হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২৮ জুলাই ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’ পুলিশী বাঁধা মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ, কারফিউ প্রত্যাহার ও স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার দাবিতে কালো পতাকা মিছিল ও সমাবেশ করে। এদিন বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলোর জোট ‘জাতীয় শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ’ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে প্রেসক্লাব এলাকায় বিক্ষোভ করে। কারফিউ জারির পর ২ আগস্ট পর্যন্ত ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র ঘোষিত কর্মসূচি কেন্দ্রীয়ভাবে মুলত পল্টন-প্রেসক্লাব এলাকায় পালন করা হতো।

পল্টন-প্রেসক্লাব এলাকার এসব কর্মসূচিতে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের’ নেতা-কর্মীরাই নেতৃত্ব দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের মধ্যে আগে থেকেই একটা আলোচনা চলছিল– সবাইকে যুক্ত করে শহিদদের স্মরণে একটা নাগরিক শোকমিছিল আমরা করতে পারি কি না। এ বিষয়ে ৩১ সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট (বর্তমানে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য) ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সাথে যখন আমাদের কথা হয়। তখন দেখি তারাও একইরকম ভাবছে। এরই ধারবাহিকতায় ৩১ সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, নারী সংগঠন, শ্রমিক সংগঠনসহ আন্দোলনে সক্রিয় সকল পক্ষকে সাথে নিয়ে প্রথমে ২ আগস্ট ‘শোকযাত্রা’ করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু প্রতিদিন যেভাবে পাল্লা দিয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়ছিল, সকলের দাবি ও আকাঙ্ক্ষা যেভাবে শেখ হাসিনা পতনের এক দাবিতে এসে কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল– সেটা দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে, এখন ‘শোকযাত্রা’ মানায় না। তখন আমরা এ কর্মসূচির নাম আমরা শোকযাত্রার বদলে ‘দ্রোহযাত্রা’ ঘোষণা করি।

২ আগস্ট বিকেল ৩টায় প্রেসক্লাবে ছিল আমাদের সমাবেশ। সেখান থেকে শুরু হয়ে ‘দ্রোহযাত্রা’ শহিদ মিনারে গিয়ে শেষ হবে। দুপুর ১টা থেকেই প্রেসক্লাবের সামনে লোক জড়ো হতে থাকে। ফলে আমরা আমাদের আয়োজনও শুরু করি নির্ধারিত সময়ের আগে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা চলতে থাকে আর বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। আমাদের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘রক্তের দাগ দিচ্ছে ডাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’। এ সমাবেশে ঢাকা শহরের শ্রমিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছিল। বৃষ্টির কারণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা সংক্ষিপ্ত করে আমরা দ্রুত দ্রোহযাত্রা শুরু করি।

দ্রোহযাত্রা শুরুর আগে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তার সভাপতির ভাষণে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। হাজার হাজার মানুষের ‘দ্রোহযাত্রা’ জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়ে হাইকোর্ট-দোয়েল চত্বর-টিএসসি হয়ে শহিদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এই ‘দ্রোহযাত্রা’ থেকে স্পষ্টভাবে সরকারের পদত্যাগের এক দফা ঘোষণা করা হয়। এর আগে থেকে বিচ্ছিন্নভাবে এক দফা উচ্চারিত হচ্ছিল, কিন্তু সম্মিলিতভাবে ‘দ্রোহযাত্রা’ থেকেই এটা সবার সামনে আসে। এরপর ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার ডাকা সংলাপ প্রত্যাখান করে ছাত্র-নাগরিকের অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া হয়। ৪ আগস্ট শাহবাগ চত্বরে ডাকা সমাবেশ থেকে ৫ আগস্ট ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। স্লোগান ওঠে ‘ছাড়তে হবে ক্ষমতা, ঢাকায় আসছে জনতা’।

সরকার নিজেকে রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে ৪ তারিখ সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। তাতে শেষরক্ষা আর হয়নি হাসিনার। লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতা কারফিউ ভেঙে ঢাকার রাজপথ ও গণভবন দখল করে। তার আগেই হাসিনা পদত্যাগ করে এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

গণঅভ্যুত্থান শেষ হয়েছে, লড়াই নয়

বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক মাইলফলকের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিলাম আমরা। আজও আছি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে লড়াই থামে না। বরং গণঅভ্যুত্থানের গণচেতনা রক্ষার জন্য এ লড়াই আরও বিপুল বেগে চালিয়ে নিতে হয়। আমরা সেই লড়াই আজও চালিয়ে যাচ্ছি।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট

সম্পর্কিত