Advertisement Banner

পুদুচেরিতে আঞ্চলিক দলই ভরসা কংগ্রেস ও বিজেপির

পুদুচেরিতে আঞ্চলিক দলই ভরসা কংগ্রেস ও বিজেপির
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

ফরাসি ভাষায় পোঁদিশেরি, বাংলা উচ্চারণে পন্ডিচেরি। আবার দক্ষিণ ভারতের তামিল উচ্চারণে পুদুচেরি। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, খুব সুন্দর দক্ষিণ ভারতের এই ছোট্ট কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ফরাসি স্মৃতি বিজড়িত শান্ত-সুন্দর পুদুচেরিতে কাল বৃহস্পতিবার বিধানসভার ভোট। দক্ষিণ ভারতে একমাত্র এই পুদুচেরিতেই বিজেপি রয়েছে শাসক জোটে। তাই ছোট হলেও বিজেপি নেতাদের কাছে পুদুচেরি প্রেস্টিজ ফাইট। ভোটের প্রচারে ও প্রস্তুতিতে কোনো খামতি নেই বিজেপির।

অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের নির্বাচনে জয়লাভ করে কংগ্রেসের জোটও পুদুচেরিতে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী। শুধু এই দুই জোট নয়, তামিল চিত্র তারকা থালাপতি বিজয়ের তৈরি করা রাজনৈতিক দল টিভিকেও এবারের নির্বাচনে সব আসনে প্রার্থী দিয়েছে। সঙ্গে দিচ্ছে জবরদস্ত ফাইট। তাই বেশ জমজমাট দ্বীপভূমির নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই পরনির্ভরশীল!

ব্রিটিশদের শাসনামলেও ফরাসিদের উপনিবেশ ছিল ভারতে। যেমন, পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগর, তেমনি পন্ডিচেরি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৫৪ সালের ১ নভেম্বর ফরাসিরা তাদের উপনিবেশগুলো নিঃশর্তে তুলে দেয় ভারতের হাতে। সেই থেকে পন্ডিচেরি ভারতের অংশ। ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলেও বঙ্গোপসাগরের পারে এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাদের সভ্যতার ঝলক। এমনকি, তামিলনাডুর প্রতিবেশি এই দ্বীপভূমিতে এখনো দক্ষিণ ভারতীয় ভাষা তামিল, তেলেগুর পাশাপাশি ফরাসি ভাষারও প্রচলন আছে। তবে সরকারি ভাবে পোঁদিশেরি বা পন্ডিচেরি হয়ে গিয়েছে তামিলের পুদুচেরি। কিন্তু কান পাতলেই শোনা যায় ফরাসির সঙ্গে তামিল ভাষা ও সংস্কৃতির এক অদ্ভুত যুগলবন্দি।

আর হবে নাই বা কেন! ১৩৮ বছরের ইতিহাস তো সহজে মুছে ফেলা যায় না! পুদুচেরিকে এখনো অনেকে বলেন, ‘প্রাচ্যের ফরাসি রিভিয়েরা’। সেখানকার খাওয়া-দাওয়াতেও রয়েছে ফরাসি ও দক্ষিণ ভারতীয় রন্ধনশৈলীর মেলবন্ধন। উপকূলবর্তী এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মূল আয় পর্যটন থেকে। তামিলনাডুর রাজনৈতিক প্রভাব পুদুচেরিতে বড্ড বেশি। এবারের নির্বাচনেও তাই বিজেপি ও কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দলগুলো তামিল রাজনীতির স্রোতেই বেশি ভরসা রেখেছেন। ক্ষমতা দখলের লড়াইতে তারা বাধ্য হচ্ছেন জোটধর্ম পালনে।

উপকূলীয় এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের তীরে চারটি ছিটমহল। সবচেয়ে বড়টিরই নাম পুদুচেরি। এই দ্বীপভূমির রাজধানী পুদুচেরি। সমুদ্রের পাথুরে তীর, সোনালি বালির সঙ্গে মিশে রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য। পর্যটকদের কাছে পাথুরে সৈকত প্রমেনেড বিচ খুবই আকর্ষণীয়। আবার নৌবিলাসীদের জন্য রয়েছে সেরেনিটি বিচ। ধর্মীয় কারণেও অনেকে পুদুচেরি যান। সেখানকার শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমের স্নিগ্ধ পরিবেশ অনেককেই আকর্ষিত করে।

ভোটের কথায় আসা যাক। মাত্র ৯ লাখ ৪৪ হাজার ২১১ জন ভোটার পুদুচেরিতে। তারাই নির্বাচিত করবেন ৩০ জন বিধায়ককে। নির্বাচিত সদস্যরা আবার তিনজন বিধায়ককে মনোনীত করবেন। বর্তমানে পুদুচেরিতে বিজেপির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে আছেন প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা এন রঙ্গাস্বামী। ২০২১ সালে নিজের নামেই ‘এন আর কংগ্রেস’ নামে দল গঠন করেন। তারপর বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে দখল করেন ক্ষমতা। তবে নির্বাচনে লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি। কংগ্রেস জোট করেছিল তামিলনাডুর শাসক দল ডিএমকের সঙ্গে। শাসক ও বিরোধী–উভয়পক্ষের জোটই অটুট রয়েছে। তবে টিভিকে প্রার্থী দেওয়ায় লড়াই হচ্ছে ত্রিমুখী।

গতবার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট পেয়েছিল ১৬টি আসন। আর কংগ্রেসের ইউপিএ জোট আটটি আসন জেতে। বাকি ছয়টি আসনে জয়লাভ করে নির্দল ও অন্যান্য প্রার্থীরা। ভোটের হার এনডিএর পক্ষে ছিল ৪৩.৬ শতাংশ, ইউপিএর ৩৭.৯ শতাংশ এবং অন্যান্যরা ১৮.৫ শতাংশ ভোট পায়। কিন্তু বিজেপি জোটের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাই ইউপিএ জোট একমাত্র লোকসভা আসনে জয়ী হয়। কংগ্রেস প্রার্থী ভি ভাইথিলিঙ্গম ৫২.৭৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিজেপি পায় মাত্র ৩৫.৮ শতাংশ ভোট। তাই পুদুচেরিতে জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেছে কংগ্রেস শিবির।

পুদুচেরিতে বিজেপি ও কংগ্রেস দুই সর্বভারতীয় দলই পরনির্ভরশীল। আঞ্চলিক দল দয়া না করলে তাদের পক্ষে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। এই ছোট্ট দ্বীপভূমে তামিলনাডুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তামিল রাজনীতির সঙ্গে তাদের মিল চোখে পড়ার মতো। এবারও তামিলনাডুর শাসক দল ডিএমকে জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মূল স্লোগান উন্নয়ন। সেইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। পুদুচেরির বেশির ভাগ বাসিন্দাই হিন্দু। তবে ৬ শতাংশের কাছাকাছি মুসলমান ও খ্রিস্টান রয়েছেন। বিজেপি তাই বিভাজনের রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ।

তবে সব জল্পনাকেই উড়িয়ে দিতে পারেন দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা থালাপতি বিজয়। গত বছর তামিলনাডুতে টিভিকে নামে তার আঞ্চলিক দলের আত্মপ্রকাশের সময়ই ভিড়ের চাপে ৪২ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষ তাকে একবার দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন। দারুন জনপ্রিয় এই অভিনেতা। আর দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে এনটি রামারাও, এমজি রামচন্দ্রন, জে জয়ললিতারাও অতীতে বহু দিন রাজ্যশাসন করেছেন। এখনো কেরলমে সুরেশ গোপী, তামিলনাডুতে কামাল হাসান, চিরঞ্জিবী বা থালাপতি বিজয়রা বেশ জনপ্রিয়। তাই পুদুচেরিতে টিভিকে চমক দেখাবে কি না সেটা ফলাফল প্রকাশ অবধি অপেক্ষা করতেই হবে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরলম ও তামিলনাডুর সঙ্গে পুদুচেরিতেও ভোটগণনা ৪ মে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)।

সম্পর্কিত