ads

ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য উপহার

ফরিদ জাকারিয়া
ফরিদ জাকারিয়া
ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য উপহার
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

চলমান ইরান সংকট ও যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। বেইজিংকে এই সুবিধার জন্য কোনো একটি গুলিও ছুড়তে হয়নি, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়নি কিংবা কোনো রাজনৈতিক মূলধনও বাজি ধরতে হয়নি।

তা সত্ত্বেও বিগত তিন দশকের মধ্যে ঘটে যাওয়া যেকোনো সংকটের চেয়ে এই যুদ্ধের মাধ্যমে বেইজিং সবচেয়ে বেশি সুবিধা অর্জন করেছে।

Advertisement

মূলত ইরান যুদ্ধ চীনের তিনটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনকে অভাবনীয়ভাবে ত্বরান্বিত করেছে: প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যকে আমেরিকার ওপর কম নির্ভর করে তোলা; দ্বিতীয়ত, বিশ্বের প্রযুক্তি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ চীনা প্রযুক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করা; এবং তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনকে একটি দায়িত্বশীল, বিশ্বস্ত ও স্থির পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।

মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছাই চীনের নেই। কারণ তা বাস্তবায়ন করতে গেলে বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।

বেইজিংয়ের মূল কৌশলটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী। তা হলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন কক্ষপথ থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে আনা।

ছবি: এআই
ছবি: এআই

মজার বিষয় হলো, এই কাজে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছে যে, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করছে। যেখানে তাদের শহর, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং অর্থনীতির ওপর কী পরিমাণ প্রভাব পড়ছে তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এখন দৃশ্যত দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। একপক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক আরও নিবিড় করছে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বে কাতার, ওমান ও সম্ভবত ইরাক ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী একটি গোষ্ঠী এখন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করছে।

তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরানের সাথে সংঘাত এড়িয়ে সংলাপে বসছে এবং একই সাথে চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষমতার এই ভারসাম্যই মূলত বেইজিং সবসময় চেয়ে এসেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতাতেই সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এরপর থেকে রিয়াদ মার্কিন নেতৃত্বাধীন বেশ কিছু ডেটা সেন্টার এবং কম্পিউটার চিপ সংক্রান্ত প্রকল্প থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে।

এর পরিবর্তে সৌদি আরব চীনের তৈরি মিসাইল ও ড্রোন কিনেছে। চীনা নৌবাহিনীর সাথে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে এবং চীনের উইং লুং যুদ্ধ ড্রোন নিজ দেশে উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে চীনের মোট প্রতিরক্ষা রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি গিয়েছে কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোতে।

পারস্য উপসাগরের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তাবলয় একেবারেই ত্যাগ করতে চাচ্ছে না।

তবে তারা বিকল্প পথ খোলা রাখতে চায়। আর বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হওয়া মানেই ওয়াশিংটনের একক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব কমে আসা।

চীন সবচেয়ে চমকপ্রদ রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় অর্জন করেছে ভূ-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যে দেশটি তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই রপ্তানি করে আনে।

তাই ইরান যুদ্ধের কারণে তারা হয়তো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু বাস্তবে চীন বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার কারণে এই আকস্মিক তেলের ধাক্কা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলে নিয়েছে। চীন তার তেল সরবরাহকারীদের উৎস বহুমুখী করেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের মজুত গড়ে তুলেছে। কয়লার ব্যবহার সচল রেখেছে। পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রসার ঘটিয়েছে।

এবং নিজ দেশের অর্থনীতিকে এমন এক অভূতপূর্ব মাত্রায় বিদ্যুতায়িত করেছে যা বিশ্বের আর কোনো দেশ করতে পারেনি।

বর্তমানে চীনের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশই বিদ্যুৎ থেকে আসে, যা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।

কেবল ২০২৪ সালেই চীন বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি নতুন বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এই বহুমুখী ও বিকল্প কৌশলের কারণেই চীন ইরান যুদ্ধ চলাকালে তাদের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ দিনে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, এই যুদ্ধ বিশ্ব দরবারে চীনের তৈরি পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি প্রযুক্তির এক সুবিশাল বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করেছে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ায় প্রায় সব দেশের সরকারই সোলার প্যানেল, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন, ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) এবং পাওয়ার গ্রিড তৈরিতে মনোযোগী হচ্ছে।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সোলার প্যানেল উৎপাদনের ৯১ শতাংশ এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের ৮৯ শতাংশ ক্ষমতার একক নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে।

পরিষ্কার বা ক্লিন-এনার্জি প্রযুক্তির প্রায় ৭০ শতাংশই উৎপাদন করে চীনা কোম্পানিগুলো।

ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা যত দীর্ঘায়িত হবে, এইসব শিল্পে বিশ্বকে তত বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

এর পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক বাণিজ্য থেকে মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানোর চীনা লক্ষ্যকেও গতিশীল করেছে।

বিভিন্ন তথ্যমতে, ইরান কেবল সেইসব তেলবাহী জাহাজকেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে যেগুলো তাদের বাণিজ্যের লেনদেন চীনা মুদ্রা রেনমিনবি (ইয়েন) কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে নিষ্পত্তি করতে রাজি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীন ও তার ব্যবসায়িক অংশীদাররা রেনমিনবি-ভিত্তিক বাণিজ্যের পরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি করছে।

বৈশ্বিক বাণিজ্যে এই পরিবর্তনের গতি হয়তো কিছুটা ধীর হবে। কিন্তু মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার এই ধারাটি এখন একদম স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট।

চূড়ান্তভাবে যদি ভাবমূর্তির হিসাব করা হয়, তাহলেও বেইজিং অভাবনীয় সুবিধা পেয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করার সময় বেশ কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল; যেমন–ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিঃশেষ করা এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন বন্ধ করা।

কিন্তু ওয়াশিংটনের একটি লক্ষ্যও টেকসইভাবে অর্জনে সক্ষম হয়নি। উল্টো যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত ছিল, যুক্তরাষ্ট্র এখন কেবল সেটাকেই পুনরায় চালুর পথ খুঁজছে।

ট্রাম্প এই যুদ্ধকে বেছে নিয়েছিলেন এবং করতে গিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত শেষ করেছেন।

এশিয়া অঞ্চল থেকে সামরিক মনোযোগ সরিয়ে এনেছেন। মিত্রদের হতাশ করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে চরম মার্কিন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভুল কৌশল ও ঘনঘন নীতি পরিবর্তন কখনোই ভালো ফল আনতে পারে না।

অন্যদিকে, চীন খুব কৌশলে এই পুরো সময় নিষ্ক্রিয় থেকেছে।

তারা নিয়মিত ইরান থেকে তেল কিনেছে, উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে এবং ইরানকে রক্ষা করা কিংবা পারস্য উপসাগরে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কোনো ব্যয়বহুল সামরিক দায়িত্ব কাঁধে নেয়নি।

বড় কোনো প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে না গিয়ে নিজেদের প্রভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করার এই কৌশলটিই বেইজিংয়ের চিরকাল পছন্দ।

বিগত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বড় সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়ে নিজেদের শক্তি ও সম্পদ ক্ষয় করেছে।

অন্যদিকে এই একই সময়ে চীন তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে। প্রযুক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে। এবং বিশ্বজুড়ে সুদৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নেয়, আর চীন তার সুফলের জন্য অপেক্ষা করে। ইরান যুদ্ধের কারণে চীনেরও কিছু ক্ষতি হয়েছে; যেমন জ্বালানির উচ্চ মূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক চাহিদার মন্দা। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতা সবসময় আপেক্ষিক।

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যমাত্রা, আন্তর্জাতিক সামরিক জোট এবং ভাবমূর্তির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার সাথে তুলনা করলে এটি পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে চীন এই যুদ্ধের ফলে একটি বিজয়ী পক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে।

(নিবন্ধটি মূলত ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এবং পরে ফরেন পলিসি ও সিএনএনে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।)

সম্পর্কিত