ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছে মঙ্গলবার। একইসঙ্গে নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও শপথ হচ্ছে। সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও তারা শপথ নেবেন।
দীর্ঘ দুই দশক পর সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় লাভ করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ৭৭টি আসন পেয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যরাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদাভাবে শপথ নিতে হবে।
একজন সংসদ সদস্যের আলাদা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সংসদীয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞ নিজামউদ্দিন আহমেদ চরচাকে বলেন, “একদিক থেকে দেখলে নতুন করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া সংবিধানের বাইরে। কারণ, সংবিধানে ওই শপথের কথা বলা নেই। আর সংবিধান সর্বোচ্চ আইন। তবে গণভোট আবার এই বিষয়টিকে মান্যতা দেয়। কারণ, জনগণ রায় দিয়েছে।”
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন চরচাকে বলেন, “এই গণভোট অবৈধ। কারণ, সংবিধানে গণভোটের কথা নেই। আর রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংস্কার নিয়ে যে আদেশ দিয়েছেন, সেটাও বেআইনি। কারণ, তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, আদেশ নয়। এই রেফারেন্ডাম (গণভোট) মানতে বিএনপি বাধ্য নয়। কারণ, জনগণ তাকে ম্যান্ডেট দিয়েছে।”
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান সংশোধন করা যায়। এই বিধান বাতিলসহ আরও অনেক বিধান সংযোজন করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে নানা প্রস্তাব এসেছে। সেগুলোর বাস্তবায়ন করতেই গণভোটের আয়োজন করা হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদ, এটা যদি কনস্টিটিউশনে (সংবিধান) ধারণ হয়, সেই মর্মে অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধন) হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে ফরম হয়, কে শপথ পাঠ করাবেন সেটা নির্ধারিত হয়–এতগুলো হয়-এর পরে তারপরে হলে হতে পারে।”
শপথের পর নেতা নির্বাচন
শপথের পর নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ বইতে সই করবেন। পরে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা হবে বলে জানিয়েছেন, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। এই সভায় সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হবে।
নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ মঙ্গলবার সকাল ১০টায়। সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে এমপিরা শপথ নেওয়ার পর তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন।
পরে বিকেলে দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি। সাধারণত সরকারের শপথ বঙ্গভবনে হয়। তবে এবার দীর্ঘদিনের সেই রীতি ভাঙা হচ্ছে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিএনপির অভিমত অনুযায়ী এবার দক্ষিণ প্লাজায় শপথ হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর থেকে নতুন সরকারের শপথ বঙ্গভবনেই হয়ে আসছে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়। মুক্তিযুদ্ধ জয়ের পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শপথ নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেদিন শপথ নেন মন্ত্রিসভার আরও ১১ সদস্য। সেই শপথ হয় বঙ্গভবনে; শপথ পড়ান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
জাতীয় সংসদের সদস্যরা শপথ নেন আগের সংসদের স্পিকারের কাছ থেকে। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রকাশ্যে নেই। তিনি পদত্যাগও করেছেন। যদিও নতুন স্পিকার দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত আগের স্পিকার দায়িত্বে থাকেন। ফলে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে এবার নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে।
গেজেট প্রকাশের পরের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান রয়েছে। আর নির্বাচিত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে কেউ শপথ না পড়ালে সেক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে পারবেন।
যদি নির্ধারিত সময়ে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান।
সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ওপর।
সংবিধানে নিয়ম অনুযায়ী, সংসদীয় দলের নেতাকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।
সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক বসার নিয়ম রয়েছে। সংসদের প্রথম বৈঠকেই স্পিকার নির্বাচন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী গত সংসদের স্পিকার সংসদ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করে নতুন স্পিকার নির্বাচন করার কথা। তবে এবার সাবেক স্পিকার শিরীন চৌধুরী প্রকাশ্যে না থাকায় সেই নিয়মের ব্যত্যয় হবে।
কার্যপ্রণালি বিধিতে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য থাকলে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি সংসদে সভাপতিত্ব করতে পারবেন।