ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মস্থান গোপালগঞ্জের ভোটের মাঠে দশকের পর দশক ধরে আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের। দীর্ঘ সময় পর এই প্রথম সেখানে নৌকা এখন ‘পুরোপুরি গায়েব’। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই প্রতীকই রাখেনি নির্বাচন কমিশন। আর নিষিদ্ধ করা হয়েছে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে গোপালগঞ্জের ভোটের মাঠ এখন কেমন–এক প্রতিবেদনে সেই চিত্রই তুরে ধরেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আজ শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গোপালগঞ্জের ভোটের মাঠে এখন শোভা পাচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের পোস্টার। আরও রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও।
রয়টার্স বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই গোপালগঞ্জ ছিল আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটি’। এখান থেকেই পরে বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা সময়ের প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। আর শেখ মুজিবুর রহমান এই গোপালগঞ্জেরই সন্তান।
২০২৪ সালের আগপর্যন্ত টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতাদের ‘গণগ্রেপ্তারের’ কারণে তারা হয় নির্বাচন বয়কট করে বা তাদের প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের আগস্টের তরুণদের নেতৃত্বে হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং তিনি পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান।
এরপর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়নি। গত অক্টোবরে রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ই-মেইলে পাঠানো এক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় এর লাখো সমর্থক কোনো প্রার্থীকেই পাবে না। এ কারণে অনেকে এই নির্বাচন বয়কটও করবে।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সমর্থক এক রিকশাচালক রয়টার্সকে বলেন, “তারা যত খুশি তত পোস্টার আনুক না কেন, ব্যালটে যদি নৌকা না থাকে, আমার পরিবারের ১১ জন ভোটকেন্দ্রেই যাব না।”
এ কথা বলার সময় বিভিন্ন প্রার্থীর পোস্টারের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওই ব্যক্তি।
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি
২০২৪ সালে আন্দোলন ভয়াবহভাবে দমনের কারণে আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন বলছে, ওই আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০ মানুষ মারা যায়। এদের বেশির ভাগই নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর দমনের কারণে। যদিও শেখ হাসিনা দাবি করছেন, তিনি হত্যার নির্দেশ দেননি।
আওয়ামী লীগের ভোটার বিএনপি-জামায়াতে যাচ্ছে
চলতি মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন ভোটারের ওপর পরিচালিত বেশির ভাগ জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ভোটারদের প্রায় অর্ধেক এখন বিএনপির পক্ষে। এর পরেই রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, প্রায় ৩০% ভোটার তাদের পক্ষে মত দিয়েছেন।
ঢাকাভিত্তিক ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ এবং ‘বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ’-এর পরিচালিত এই জরিপে বলা হয়েছে, “এই ধরনগুলো ইঙ্গিত দেয়, সাবেক আওয়ামী লীগের ভোটাররা দলীয় ব্যবস্থার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে না বা দলীয় পছন্দ থেকে সরে আসছে না; বরং তারা সুনির্দিষ্ট বিরোধী বিকল্পগুলোর দিকে তাদের সমর্থন জানান দিচ্ছে।”
গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ কর্মীদের পরিবারগুলো বলছে, হাসিনা-পরবর্তী এই রূপান্তর তাদের ব্যক্তিগত জীবনে চরম মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হচ্ছে।
ছাত্রলীগের কর্মী ইব্রাহিম হোসেন (৩০) গত বছরের জুলাই মাসে একটি সমাবেশে সহিংসতার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গত ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হন। তার বোন শিখা খানম রয়টার্সকে বলেন, তার ভাইকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তার পরিবার এখন রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছে। শিখা বলেন, “আমরা ভোট দেব না। আমাদের রাজনীতি শেষ।”
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান স্মরণে নবগঠিত ছাত্র নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ আয়োজিত গোপালগঞ্জের জুলাইয়ের ওই সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য জানিয়েছেন, তারা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
রেস্তোরাঁ কর্মী মহব্বত মোল্লা বলেন, এত প্রার্থী হলেও তিনি তাদের কারও পক্ষে না। শেখ হাসিনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের প্রার্থী এখানে নেই। আওয়ামী লীগ এখানে নেই। তাই এই নির্বাচন আমাদের জন্য নয়।”
প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন
অন্যরা অবশ্য গোপালগঞ্জের দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো নতুন নির্বাচনী পোস্টার ও ব্যানারে আশার আলো দেখছেন।
ব্যবসায়ী শেখ ইলিয়াস আহমেদ আশা করেন, আগামী নির্বাচনে মানুষ শেষ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতে পারবে। তিনি বলেন, “অতীতে আমি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখতাম, আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এবার আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা পরে কী করবেন, তা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
শাহান বলেন, “আমি দেশজুড়ে নির্বাচন বর্জনের কোনো আশঙ্কা করছি না। দলের কট্টর অনুসারীরা ভোটদান থেকে বিরত থাকতে পারে। তবে অনির্ধারিত এবং স্থানীয় ইস্যু-নির্ভর ভোটাররা ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং তারাই ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারেন।”
ছবি: রয়টার্স
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মস্থান গোপালগঞ্জের ভোটের মাঠে দশকের পর দশক ধরে আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের। দীর্ঘ সময় পর এই প্রথম সেখানে নৌকা এখন ‘পুরোপুরি গায়েব’। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই প্রতীকই রাখেনি নির্বাচন কমিশন। আর নিষিদ্ধ করা হয়েছে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে গোপালগঞ্জের ভোটের মাঠ এখন কেমন–এক প্রতিবেদনে সেই চিত্রই তুরে ধরেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আজ শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গোপালগঞ্জের ভোটের মাঠে এখন শোভা পাচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের পোস্টার। আরও রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও।
রয়টার্স বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই গোপালগঞ্জ ছিল আওয়ামী লীগের ‘ঘাঁটি’। এখান থেকেই পরে বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা সময়ের প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। আর শেখ মুজিবুর রহমান এই গোপালগঞ্জেরই সন্তান।
২০২৪ সালের আগপর্যন্ত টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতাদের ‘গণগ্রেপ্তারের’ কারণে তারা হয় নির্বাচন বয়কট করে বা তাদের প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের আগস্টের তরুণদের নেতৃত্বে হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং তিনি পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান।
এরপর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়নি। গত অক্টোবরে রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ই-মেইলে পাঠানো এক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় এর লাখো সমর্থক কোনো প্রার্থীকেই পাবে না। এ কারণে অনেকে এই নির্বাচন বয়কটও করবে।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সমর্থক এক রিকশাচালক রয়টার্সকে বলেন, “তারা যত খুশি তত পোস্টার আনুক না কেন, ব্যালটে যদি নৌকা না থাকে, আমার পরিবারের ১১ জন ভোটকেন্দ্রেই যাব না।”
এ কথা বলার সময় বিভিন্ন প্রার্থীর পোস্টারের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওই ব্যক্তি।
শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি
২০২৪ সালে আন্দোলন ভয়াবহভাবে দমনের কারণে আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন বলছে, ওই আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০ মানুষ মারা যায়। এদের বেশির ভাগই নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর দমনের কারণে। যদিও শেখ হাসিনা দাবি করছেন, তিনি হত্যার নির্দেশ দেননি।
আওয়ামী লীগের ভোটার বিএনপি-জামায়াতে যাচ্ছে
চলতি মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন ভোটারের ওপর পরিচালিত বেশির ভাগ জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ভোটারদের প্রায় অর্ধেক এখন বিএনপির পক্ষে। এর পরেই রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, প্রায় ৩০% ভোটার তাদের পক্ষে মত দিয়েছেন।
ঢাকাভিত্তিক ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ এবং ‘বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ’-এর পরিচালিত এই জরিপে বলা হয়েছে, “এই ধরনগুলো ইঙ্গিত দেয়, সাবেক আওয়ামী লীগের ভোটাররা দলীয় ব্যবস্থার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে না বা দলীয় পছন্দ থেকে সরে আসছে না; বরং তারা সুনির্দিষ্ট বিরোধী বিকল্পগুলোর দিকে তাদের সমর্থন জানান দিচ্ছে।”
গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ কর্মীদের পরিবারগুলো বলছে, হাসিনা-পরবর্তী এই রূপান্তর তাদের ব্যক্তিগত জীবনে চরম মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হচ্ছে।
ছাত্রলীগের কর্মী ইব্রাহিম হোসেন (৩০) গত বছরের জুলাই মাসে একটি সমাবেশে সহিংসতার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গত ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হন। তার বোন শিখা খানম রয়টার্সকে বলেন, তার ভাইকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তার পরিবার এখন রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছে। শিখা বলেন, “আমরা ভোট দেব না। আমাদের রাজনীতি শেষ।”
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান স্মরণে নবগঠিত ছাত্র নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ আয়োজিত গোপালগঞ্জের জুলাইয়ের ওই সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য জানিয়েছেন, তারা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
রেস্তোরাঁ কর্মী মহব্বত মোল্লা বলেন, এত প্রার্থী হলেও তিনি তাদের কারও পক্ষে না। শেখ হাসিনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের প্রার্থী এখানে নেই। আওয়ামী লীগ এখানে নেই। তাই এই নির্বাচন আমাদের জন্য নয়।”
প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন
অন্যরা অবশ্য গোপালগঞ্জের দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো নতুন নির্বাচনী পোস্টার ও ব্যানারে আশার আলো দেখছেন।
ব্যবসায়ী শেখ ইলিয়াস আহমেদ আশা করেন, আগামী নির্বাচনে মানুষ শেষ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতে পারবে। তিনি বলেন, “অতীতে আমি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখতাম, আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এবার আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা পরে কী করবেন, তা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
শাহান বলেন, “আমি দেশজুড়ে নির্বাচন বর্জনের কোনো আশঙ্কা করছি না। দলের কট্টর অনুসারীরা ভোটদান থেকে বিরত থাকতে পারে। তবে অনির্ধারিত এবং স্থানীয় ইস্যু-নির্ভর ভোটাররা ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং তারাই ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারেন।”