তিনি বাংলাদেশের অভিনয় জগতের কিংবদন্তি। তাকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় বানিয়েছিলেন অশনি সংকেতের মতো ছবি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে ‘অনঙ্গ বউয়ের’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বাংলা সিনেমার চিরকালীন দৃশ্যপটে জায়গা করে নিয়েছেন। জহির রায়হান, সুভাষ দত্ত, আমজাদ হোসেন, নারায়ণ ঘোষ মিতার মতো পরিচালকদের ক্ল্যাসিক অভিনেত্রী। ববিতা বাংলাদেশে একজনই। তিনি বাংলা সিনেমার অহংকার, গৌরব! সবার ভালোবাসার, সবার শ্রদ্ধার এক মানুষ।
সেই ববিতাকেই এবার দেওয়া হচ্ছে একুশে পদক—বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। এই সম্মাননা যেন ববিতার বর্ণাঢ্য জীবনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। স্বীকৃতি তিনি বহু পেয়েছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে, দেশে–বিদেশের নানা পুরস্কার। আজীবন সম্মাননাও আছে। কিন্তু একুশে পদক আলাদাই বাংলাদেশের এই খ্যাতিমান অভিনেত্রীর কাছে। চরচাকে তিনি বলেছেন, “একুশে পদকের জন্য নির্বাচিত হওয়ায় নিজেকে ধন্য মনে করছি। একুশে আমার প্রাণ। একুশে আমার ভালোবাসা। ভাষা আন্দোলনের শহীদের অবদান আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। এই পদকের জন্য নির্বাচিত করায় আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”
নিজের এই অর্জনে ববিতার প্রথমেই মনে পড়েছে জহির রায়হানের কথা। তার স্মৃতি মনে করে কিছুটা আবেগতাড়িতও তিনি। ১৯৬৮ সালে বড় বোন, অভিনেত্রী সুচন্দার স্বামী জহির রায়হানই অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী পপিকে (ববিতার পুরো নাম ফরিদা আক্তার পপি) চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে আসেন। জহির রায়হান পরিচালিত ‘সংসার’ ছবির মাধ্যমে রুপালি পর্দায় পা রাখেন। সেই ছবিতে সুচন্দা ও নায়ক রাজ্জাকের কন্যার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। শুরু সে–ই থেকে। তবে চলচ্চিত্রে ববিতার প্রথম নাম ছিল ‘সূবর্ণা’। এরপর জহির রায়হানেরই এক উর্দু ছবি ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ থেকে তিনি নাম নেন ববিতা। পপি থেকে সূবর্ণা, তা থেকে ববিতা ও এরপর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একজন কিংবদন্তি হয়ে ওঠার জয়যাত্রার শুরুটা হয়েছিল জহির রায়হানের হাত ধরেই। একুশে পদক প্রাপ্তির এই গৌরবময় ক্ষণে ববিতার খুব মনে পড়ছে তার গুরুর কথা, “আমার একুশে পদক আমি শ্রদ্ধেয় পরিচালক জহির রায়হানকে উৎসর্গ করছি। জহির ভাইয়ের হাত ধরেই তো আমি সিনেমায় এসেছিলাম। তিনি আমার অভিনয় জীবনের গুরু। আজ ওনাকে খুব মনে পড়ছে।”
ববিতা একুশে পদক প্রাপ্তির এই সময়টায় নিজের ভক্ত, দর্শকদের কথাও মনে করছেন। তিনি মনে করেন যারা হলে গিয়ে তার সিনেমা দেখেছেন, যারা তাকে ক্যারিয়ারজুড়ে ভালোবেসেছেন, ববিতা হয়ে ওঠার পেছনে তাদের অবদান অনেক, “আমি আমার অগণিত ভক্ত, দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাদের জন্যই তো আমি আজ একজন ববিতা হতে পেরেছি। সবাইকে জানাই আমার গভীর কৃতজ্ঞতা।”
আইয়ুব বাচ্চু। ছবি: ফেসবুকএকুশে পদকটা কী পেতে একটু দেরি হয়ে গেল? এমন বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবন যার, তার একুশে পদকটা তো আরও আগেই পাওয়া উচিত ছিল। ববিতা অবশ্য এ ব্যাপারে বললেন একটু অন্যভাবেই, “আমি আরও আগে কেন একুশে পদক পাইনি, সেটা আমি বলব না। তবে একটা কথা বলতে চাই, এই যে আইয়ুব বাচ্চুর মতো একজন শিল্পীকে মৃত্যুর পর মরনোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়েছে, ওনাকে যদি জীবিত অবস্থায় পদকটা দেওয়া হতো, তাহলে খুব ভালো হতো। উনি সম্মননাটা দেখে যেতে পারতেন। আমি এতটুকুই শুধু বলতে চাই।”
সত্তর ও আশির দশকের ব্যস্ত অভিনেত্রী এখন জীবন কাটান নিভৃতেই। নিজের সব অর্জনকে সঙ্গী করেই, স্মৃতিগুলোকে ধারণ করেই। ছেলের কাছে কানাডায় গিয়ে বছরের অর্ধেক সময়টা কাটান। দেশে তার সময় কাটে নিজের কাজ করেই, আত্মীয়–স্বজনদের সঙ্গেই। ববিতা–ভক্তরা তাকে সিনেমার পর্দায় খুব মিস করেন। কেন অভিনয় থেকে দূরে কিংবদন্তি?
ববিতার কথা, “এটা ঠিক যে আমি নিয়মিত অভিনয় করি না। আমি তো নিজের মতো চরিত্র পাই না। আমি কী সব পরিচালকের ছবিতে কাজ করেছি! আমজাদ হোসেন, জহির রায়হান, সত্যজিৎ রায়, নারায়ণ ঘোষ মিতা, এমন কত জন! এখনকার পরিচালকেরাও ভালো। কিন্তু আমি যদি অভিনয় করি, তাহলে আমাকে বড়জোর একটা মায়ের চরিত্র দেওয়া হবে। আমি চাই, এমন একটা চরিত্র, যেটিকে কেন্দ্র করেই গল্পটা দাঁড়াবে। এমন ছবি তো ভারতেও হচ্ছে। আমি আসলে নিজে এত বছরে যা অর্জন করেছি, সেটাকে কোনোভাবেই নষ্ট করতে চাই না।”
এখনকার ছবিতে তার কোনো আগ্রহ নেই। নিজের পুরনো ছবিগুলো দেখেন এখনো। স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন, “মোবাইলে বা ল্যাপটপে বসে পুরনো ছবিগুলো দেখি নিজের। খুব ভালো লাগে। স্মৃতিকাতর হয়ে যাই। নতুন ছবি তেমন একটা দেখা হয় না।”