চরচা ডেস্ক

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৬ সালের শুরুতে এসেও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। একদিকে রাজনৈতিক সংস্কারের স্বপ্ন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বিরাজ করছে চরম উত্তেজনা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা সোল্যাস গ্লোবালের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এ সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দেশে প্রায় এক হাজার ৫০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৬০ জন নিহত এবং আট হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে প্রধানত তিনটি দল- বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) সক্রিয় রয়েছে। যদিও এরইমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করেছে এনসিপি। তবে এই দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে মব জাস্টিস বা গণপিটুনি এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
সোল্যাস গ্লোবাল একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই সংস্থা, বিশ্বজুড়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে নিরাপদভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে। বিভিন্ন নামজাদা কোম্পানিকে সহায়তা দেওয়া সোল্যাস স্থল, মেরিটাইম এবং সাইবার স্পেস থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও মোকাবিলা করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সেবা দিয়ে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি ভ্রমণ নিরাপত্তা, অফশোর অপারেশন, কর্পোরেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের সুরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দেয়। বিভিন্ন কোম্পানি এইসব সেবা গ্রহণ করে এবং নানা দেশ ও এলাকায় বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ নিয়ে মূল্যায়নে সোল্যাস তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। সেইসঙ্গে ভারতে অবস্থান করা দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি ‘রাজনৈতিক নতুন সূচনা’ হবে। তবে বাস্তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়টিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সহিংসতাই দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও প্রাপ্ত উপাত্ত ইঙ্গিত দেয় যে, দেশে খুনের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে অপহরণ, ডাকাতি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও বাড়ছে।
সোল্যাস গ্লোবাল বলছে, শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপক বহিষ্কার ও পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। প্রচলিত আছে, এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এর ফলে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে তীব্র জনবল সংকট দেখা দেয় এবং অপরাধ দমনে তাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পাশাপাশি পুলিশের ভেতরে দুর্নীতিও একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিপ্লব পরবর্তী ১৬ মাসে দেশজুড়ে ১ হাজার ৩২৮টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে এবং ঘুষ গ্রহণ ও চাঁদাবাজি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই খাতটি বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এবং জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ জোগান দেয়।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে কয়েক ডজন কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বেকারত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের মধ্যে, যারা পোশাক শিল্পের মূল কর্মশক্তি। এই পরিস্থিতি আরও গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের এই সম্মিলিত প্রভাব ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যদি নির্বাচনী প্রচারণা সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতায় জর্জরিত হয়, অথবা ভোটের ফলাফলকে জনগণের একটি বড় অংশ ‘অন্যায্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে দেশটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার পথে এগোতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফলের বাইরেও কিছু কাঠামোগত বিষয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী-এনসিপির মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো স্থিতিশীলতার পথে অন্যতম বড় বাধা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে অস্থিতিশীলতা চলছে, তার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের ‘সুবিধাভোগী বা ক্লায়েন্টেলিজম’ ব্যবস্থা। শেখ হাসিনা আমলের সেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধার বলয়টি এখনো পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক দলগুলো সেই পুরোনো শূন্যস্থান পূরণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই ক্ষমতার লড়াই কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতাও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিপ্লবের পর সামাজিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে সদস্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা।
নির্বাচন পরবর্তী সরকার, তারা যে আদর্শেরই হোক না কেন, গণ-সহিংসতা বন্ধে আগ্রহী হতে পারে। তবে রাজনৈতিক পুঁজি ও বৈধতার সংকট থাকলে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে আগামী সরকারকে শ্রম-সম্পর্কিত ও আর্থ-সামাজিক ক্ষোভ মোকাবিলা করতে হবে। পোশাক শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি হলেও এর জন্য বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প মজুরি, দুর্বল শ্রম অধিকার এবং বিপজ্জনক কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে আসছে। এসব সমস্যার সমাধান ব্যর্থ হলে যেকোনো নির্বাচিত সরকারের গতি দ্রুত থমকে যেতে পারে এবং বড় পরিসরের গণ-অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৬ সালের শুরুতে এসেও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। একদিকে রাজনৈতিক সংস্কারের স্বপ্ন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বিরাজ করছে চরম উত্তেজনা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা সোল্যাস গ্লোবালের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এ সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দেশে প্রায় এক হাজার ৫০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৬০ জন নিহত এবং আট হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে প্রধানত তিনটি দল- বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) সক্রিয় রয়েছে। যদিও এরইমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করেছে এনসিপি। তবে এই দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে মব জাস্টিস বা গণপিটুনি এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
সোল্যাস গ্লোবাল একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই সংস্থা, বিশ্বজুড়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে নিরাপদভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করে। বিভিন্ন নামজাদা কোম্পানিকে সহায়তা দেওয়া সোল্যাস স্থল, মেরিটাইম এবং সাইবার স্পেস থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও মোকাবিলা করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সেবা দিয়ে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি ভ্রমণ নিরাপত্তা, অফশোর অপারেশন, কর্পোরেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের সুরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দেয়। বিভিন্ন কোম্পানি এইসব সেবা গ্রহণ করে এবং নানা দেশ ও এলাকায় বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ নিয়ে মূল্যায়নে সোল্যাস তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। সেইসঙ্গে ভারতে অবস্থান করা দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি ‘রাজনৈতিক নতুন সূচনা’ হবে। তবে বাস্তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়টিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সহিংসতাই দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও প্রাপ্ত উপাত্ত ইঙ্গিত দেয় যে, দেশে খুনের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে অপহরণ, ডাকাতি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও বাড়ছে।
সোল্যাস গ্লোবাল বলছে, শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপক বহিষ্কার ও পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। প্রচলিত আছে, এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এর ফলে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে তীব্র জনবল সংকট দেখা দেয় এবং অপরাধ দমনে তাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পাশাপাশি পুলিশের ভেতরে দুর্নীতিও একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিপ্লব পরবর্তী ১৬ মাসে দেশজুড়ে ১ হাজার ৩২৮টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে এবং ঘুষ গ্রহণ ও চাঁদাবাজি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই খাতটি বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এবং জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ জোগান দেয়।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে কয়েক ডজন কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বেকারত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের মধ্যে, যারা পোশাক শিল্পের মূল কর্মশক্তি। এই পরিস্থিতি আরও গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের এই সম্মিলিত প্রভাব ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যদি নির্বাচনী প্রচারণা সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতায় জর্জরিত হয়, অথবা ভোটের ফলাফলকে জনগণের একটি বড় অংশ ‘অন্যায্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে দেশটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার পথে এগোতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফলের বাইরেও কিছু কাঠামোগত বিষয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী-এনসিপির মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো স্থিতিশীলতার পথে অন্যতম বড় বাধা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে অস্থিতিশীলতা চলছে, তার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের ‘সুবিধাভোগী বা ক্লায়েন্টেলিজম’ ব্যবস্থা। শেখ হাসিনা আমলের সেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধার বলয়টি এখনো পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক দলগুলো সেই পুরোনো শূন্যস্থান পূরণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই ক্ষমতার লড়াই কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতাও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিপ্লবের পর সামাজিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে সদস্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা।
নির্বাচন পরবর্তী সরকার, তারা যে আদর্শেরই হোক না কেন, গণ-সহিংসতা বন্ধে আগ্রহী হতে পারে। তবে রাজনৈতিক পুঁজি ও বৈধতার সংকট থাকলে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে আগামী সরকারকে শ্রম-সম্পর্কিত ও আর্থ-সামাজিক ক্ষোভ মোকাবিলা করতে হবে। পোশাক শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি হলেও এর জন্য বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প মজুরি, দুর্বল শ্রম অধিকার এবং বিপজ্জনক কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে আসছে। এসব সমস্যার সমাধান ব্যর্থ হলে যেকোনো নির্বাচিত সরকারের গতি দ্রুত থমকে যেতে পারে এবং বড় পরিসরের গণ-অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

ওসমান হাদি হত্যার পর সরকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ভোটের প্রার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার এবং রিটেইনার (গানম্যান) নিয়োগের সুযোগ দিতে নীতিমালা করেছে সরকার।

কারা হেফাজতে থাকা বন্দীদের মৃত্যুর সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি কমেছে। কিন্তু দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা প্রায় ৮৪ হাজার বন্দীর জন্য চিকিসক আছেন মাত্র দুজন। প্রতিটি কারাগারে অন্তত একজন করে স্থায়ী চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় সব কারাগারেই সেই পদ শূন্য।