ভোটার স্থানান্তর ‘বিতর্ক’: যা বলছে ইসির তথ্য

ভোটার স্থানান্তর ‘বিতর্ক’: যা বলছে ইসির তথ্য
চরচা ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটার স্থানান্তর নিয়ে নতুন একটি ‘বিতর্ক’ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে ‘অস্বাভাবিক হারে’ ভোটার এলাকা স্থানান্তরের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

দলটি এ অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছে। যদিও অস্বাভাবিক ভোটার স্থানান্তরের বিষয়টি নাকচ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ভোটার স্থানান্তর একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও ভোটের ঠিক আগে বড় আকারের স্থানান্তর রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে স্থানান্তরের সংখ্যা বেশি হলে সন্দেহ ও অভিযোগ বাড়ে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ করছে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ভোটারের এলাকা স্থানান্তরের আবেদন অনুমোদন করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের আগে ১০ নভেম্বরের মধ্যে স্থানান্তরের সুযোগ রেখেছিল ইসি। এ সময়ের মধ্যে ১০টি অঞ্চলে সাত লাখ এক হাজার ৩৩৭ জন স্থানান্তরের আবেদন করেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছর হালনাগাদ হয় ভোটার তালিকা। সেপ্টেম্বরে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ হয়। ৩১ অক্টোবর ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় শেষ হয় আর মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত ভোটার স্থানান্তরের সময়সীমা ছিল।

বিএনপির দুই দফা অভিযোগ, ইসির দ্বিমত

দুই দফায় জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে ‘অস্বাভাবিক’ ভোটার স্থানান্তরের অভিযোগ করে বিএনপি। অভিযোগ মূলত ঢাকা-১৫ সংসদীয় আসন নিয়ে, যেখানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এ নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থীকে জেতাতে বাইরের ভোটারদের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের মতো ‘কূটকৌশল’ নিয়েছে।

গতকাল রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে একই অভিযোগের পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান নতুন একটি অভিযোগ তুলে বলেন, বিশেষ বিশেষ এলাকায় অনেক নতুন ভোটার হয়েছে, যেটা অস্বাভাবিক।

ইসি বলছে, আইন ও বিধি মেনে স্থানান্তর হয়েছে। এ অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ চরচাকে বলেন, “অস্বাভাবিক ভোটার স্থানান্তর হয়নি, অতীতে সাত লাখ স্থানান্তরের রেকর্ড আছে। আর একটি আসন যেটির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে অন্য এলাকা থেকে যেমন ভোটার ঢুকেছে, তারচেয়ে বেশি সংখ্যক বেরিয়ে গেছে।”

বিএনপির দাবি, ইসিকে যারা তথ্য সরবরাহ করেছে তারা সঠিক তথ্য দেয়নি। ফলে দলটি ইসির তথ্যে সন্তুষ্ট নয়। বিএনপি প্রকৃত তথ্য খতিয়ে দেখার আহবান জানিয়েছে ইসিকে।

বিএনপির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, বিএনপি পরাজয়ের ভয়ে অভিযোগ করছে।

ইসির তথ্য যা বলছে

ভোটার তালিকা আইন-২০০৯ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হয়। এরপর সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নিধারণ এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকাভুক্তি শেষে ভোটার স্থানান্তরের প্রজ্ঞাপন জারি করে ইসি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানান্তরের শেষ সময় ছিল ১০ নভেম্বর।

নির্বাচন কমিশন সাধারণত অঞ্চলভিত্তিক ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে। ভোটার স্থানান্তরের প্রক্রিয়া হয়ে থাকে থানা ভিত্তিক। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার স্থানান্তর হয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ভোটার স্থানান্তর হয়েছে কুমিল্লা অঞ্চলে, এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৪৩ জন। ঢাকায় ৮৬ হাজার ৮২৫, বরিশালে ৮৫ হাজার ৭২০, খুলনায় ৮১ হাজার ৭২৫ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৭৮ হাজার ৮০৫ জন ভোটার স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া রাজশাহী অঞ্চলে ৭২ হাজার ৮১৫, রংপুরে ৬৩ হাজার ৮৯৭, ফরিদপুরে ৩৯ হাজার ৯৫ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩০ হাজার ৮৫ জন ভোটার স্থানান্তর হয়েছে। সিলেট অঞ্চলে সবচেয়ে কম ভোটার স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে এই সংখ্যা ২৭ হাজার ৫৭৬ জন।

ঢাকা মহানগরে থানাভিত্তিক চিত্র

ঢাকা মহানগরের থানাভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, ঢাকার ৫৩টি থানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার স্থানান্তর হয়েছে মিরপুর থানায়-এক হাজার ৬২৭ জন। ডেমরা থানায় এক হাজার ৪৪৪, পল্লবীতে এক হাজার ২৩৫ এবং কেরানীগঞ্জ থানায় এক হাজার ২০৭ জন ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন।

বাড্ডায় ৮৫১, কাফরুলে ৮১১, সাভারে ৭৭১, খিলগাঁওয়ে ৭৪২, যাত্রাবাড়ীতে ৭১৭ এবং পল্টন থানায় ৬৩৮ জন ভোটার স্থানান্তরের তথ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ধামরাইয়ে ৬১৪, কদমতলীতে ৬২১, গুলশানে ৫৯১, রমনায় ৫৪০, ধানমন্ডিতে ৪৩৬, বনানীতে ৪১৮, ভাটারায় ৩৯৭, শাহজাহানপুরে ৩৭৫, তুরাগে ৩৫৬, নবাবগঞ্জে ৩৪৫ এবং মোহাম্মদপুরে ৩৩৬ জন ভোটার স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

তুলনামূলকভাবে কম ভোটার স্থানান্তর হয়েছে আদাবর (২৭৮), শাহবাগ (২৮২), উত্তরা পশ্চিম (২৩৪) ও উত্তরখানে (১৬৫)। সবচেয়ে কম স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে ভাসানটেক (৯৬), খিলক্ষেত (৮০), কোতয়ালী (৭৭) ও কামরাঙ্গীরচর থানায় (৭৩ জন)।

ঢাকার কোন আসনে কত স্থানান্তর

ঢাকা-১ আসনে চার হাজার ৭৩২ জন; ঢাকা-২ আসনে তিন হাজার ৯৭৮; ঢাকা-৩ আসনে এক হাজার ১০৩; ঢাকা-৪ আসনে ৮৭২; ঢাকা-৫ আসনে দুই হাজার ৬৯৪; ঢাকা-৬ আসনে ৯১৫; ঢাকা-৭ আসনে ৬৭৬; ঢাকা-৮ আসনে তিন হাজার ৬৩৩; ঢাকা-৯ আসনে দুই হাজার ৬৩৪; ঢাকা-১০ আসনে এক হাজার ৮৪৭; ঢাকা-১১ আসনে দিন হাজার ১৪১; ঢাকা-১২ আসনে ৮৭৭; ঢাকা-১৩ আসনে দুই হাজার ২৭৯; ঢাকা-১৪ আসনে দুই হাজার ৫৯; ঢাকা-১৫ আসনে তিন হাজার ৫২০; ঢাকা-১৬ আসনে দুই হাজার ৭০৭; ঢাকা-১৭ আসনে তিন হাজার ৩৯; ঢাকা-১৮ আসনে চার হাজার ৭০; ঢাকা-১৯ আসনে দুই হাজার ৫৪৩ এবং ঢাকা-২০ আসনে দুই হাজার ৬৭৩ জন।

ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স (ফেমা) সাবেক সভাপতি মুনিরা খান চরচাকে বলেন, “আমি মনে করি সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলি একত্রে মিলে পজেটিভ ওয়েতে কী করে একটা ভালো ইলেকশন করা যায়, নেগেটিভ কথা না বলে সেই চেষ্টা করা উচিত। নির্বাচন নিয়ে এখন যেন কোনোরকম, মানে এমন কোনো প্রশ্ন না ওঠে যেটাকে লোকে ক্রেডিবল বলে না। ক্রেডিবল ইলেকশনের জন্য সবারই সাহায্য করা উচিত। এটা আমাদের দায়িত্ব। এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।”

সম্পর্কিত