যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পার হতে না পারায় প্রায় চার মাস পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরের বহির্নোঙরে আটকে ছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। জাহাজটির ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক যুদ্ধাবস্থায় ‘আতঙ্ক’ নিয়ে এক একটি দিন পার করেছেন।
প্রায় প্রতিদিনই মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যাওয়া মিসাইল ও ড্রোনের আলোকচ্ছটা দেখে তাদের মনে হতো, এখনই বুঝি জাহাজের ওপর এসে পড়বে! অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে আর দেশে ফেরা হবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা ছিল তাদের।
১১৫ দিন আটকে থাকার পর গত ২৩ জুন জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর হয়ে ‘জয়যাত্রা’ দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে পৌঁছায়। গত ২১ জুলাই জাহাজ থেকে ১৭ নাবিক নামেন। দেশে ফেরেন ১৬ জন।
জাহাজটির থার্ড অফিসার আরিফ ইফতেখার ঢাকা হয়ে চট্টগ্রামে নিজের বাসায় ফিরেছেন। চরচাকে তিনি বলেছেন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে মাঝ সমুদ্রে জাহাজে তাদের আটকে থাকার দিনগুলোর কথা।
২৫ বছর বয়েসী আরিফ ইফতেখার বলেন, “বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ পারস্য উপসাগরের জেবেল আলী বন্দরে ঢোকে গত ৩১ জানুয়ারি। পণ্য খালাস শেষে আরব আমিরাতের মিনা সাকার বন্দর, পরবর্তীতে কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে স্টিল নিয়ে আবার জেবেল আলী বন্দরের বহির্নোঙরে আসে ২৬ ফেব্রুয়ারি। ওই সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তাপ পাচ্ছিলাম। পরের দিন বন্দরের জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো হয়। এর মধ্যে যুদ্ধ পুরোদমে শুরু হয়।”
বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের থার্ড অফিসার আরিফ ইফতেখার। ছবি: সংগৃহীত
মিসাইলের আক্রমণের কতটা কাছে ছিল তাদের জাহাজ, সে গল্প জানালেন আরিফ, “জেবেল আলী বন্দরের জেটিতে ভেড়ার পর জাহাজের দুই কিলোমিটার দূরে একটি স্থাপনায় আগুন জ্বলতে দেখি। তার আগে মিসাইল আক্রমণের কারণে আমাদের জাহাজ কাঁপতে শুরু করে। ১ মার্চ স্থানীয় সময় রাতের বেলা জাহাজের ২০০ মিটার দূরে একটি তেলের রিজার্ভারে অ্যাটাক হয়। সে সময় আমরা খুবই ভয় পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজও তো ওই মিসাইল আক্রমণের শিকার হতে পারত!”
আতঙ্কের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এই নাবিক বলেন, “যুদ্ধ চলাকালীন প্রতিদিন বিভিন্ন সময়ে জাহাজের ওপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল ও ড্রোন উড়ে আসা এবং সেগুলো ইন্টারসেপ্ট করার দৃশ্য দেখে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম। এসময় নাবিকরা ভয়ে জাহাজের ভেতরে অবস্থান নেয় এবং প্রয়োজন ছাড়া ভেতর থেকে ডেক-এও আসতেন না।”
চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমি থেকে নটিক্যাল সায়েন্সে পড়াশোনা করা আরিফের এটি ছিল সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজটিতে তৃতীয়বারের যাত্রা। এ যাত্রাতেই পারস্য উপসাগরে জাহাজে আটকে থাকার ঘটনা তার সবসময় মনে থাকবে বলে জানান আরিফ।
‘শুরুতে সকলেই ট্রমায় ছিলাম’
আরিফ বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর যখন আমাদের মাথার ওপর দিয়ে মিসাইল ও ড্রোন উড়ে যেত… এবং জেবেল আলী বন্দরে জাহাজের কাছেই তেল রিজার্ভারে হামলা দেখার পর প্রায় সকল নাবিকই ট্রমাটাইজ হয়ে পড়ে। কেউ জাহাজের ডেক-এ কাজ করতে চাইত না। প্রায় সকলেই ১০-১৫ দিন জাহাজের কেবিনের বাইরে আসত না।”
ওই অবস্থা থেকে কীভাবে মনোবল ফিরে পেলেন, সে অভিজ্ঞতা জানালেন আরিফ, “আমরা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউই ডেক-এ যেতাম না। নিয়মিত মিসাইল বা ড্রোন উড়ে যাওয়ার সাথে আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে শুরু করি এবং জাহাজী জীবনে কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করি। নিজেদের মনোবল ফিরে পেতে ওই সময়ে দাবা, ক্যারাম ও টেবিল টেনিস খেলার সাথে শারীরিক কসরতও শুরু করি। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের হারানো মনোবল ফেরানোর চেষ্টা করি।”
“সমুদ্রের মাঝখানে আমরা ছিলাম অসহায়। ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ নাবিকের মধ্যে চারজন প্রথমবারে সমুদ্র যাত্রায় যুক্ত হয়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। এ সময়ে তাদের পুরোনো ক্যাডেটরা তাদের মনোবল শক্ত রাখার পরামর্শ দিতেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ পাড়ি দিতে না পেরে পারস্য উপসাগরের কমপক্ষে পাঁচটি বন্দর ও বন্দরের জলসীমায় অবস্থান নিয়েছিল জাহাজ। কয়েকবার চেষ্টার করেও ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় প্রণালিটি পার হতে পারেনি।”
জাহাজেই অনেকটা বন্দিদশায়ই কেটেছে বাংলার জয়যাত্রার নাবিকদের ঈদুল ফিতর। ছবি: সংগৃহীত
আরিফ বলেন, পারস্য উপসাগরে বিভিন্ন পয়েন্টে তাদের জাহাজ ভেসে ছিল। জাহাজের নাবিকদের সাগরে র্দীঘসময় ধরে ভেসে ভেসে পার করার অভিজ্ঞতা থাকে। এছাড়া নাবিকদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণও থাকে। কিন্তু যুদ্ধকালীন সাগরে র্দীঘ সময় আটকে থাকার অভিজ্ঞতা নাবিকদের কাছে ছিল একেবারেই ভিন্ন।
ওই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, “টানা ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে জাহাজে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধকালীন জাহাজে অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মতো আটকে থাকার অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন।”
আরিফ বলেন, ‘‘১৮০ মিটার লম্বা জাহাজটা ওই সময় আমাদের পৃথিবী ছিল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিদিনই রুটিনমাফিক একই কাজ করতাম, প্রায় প্রতিদিনই যেকোনো সময় মিসাইল এসে পড়ার ভয় ছিল। এর বাইরে আমাদের যাওয়ার সুযোগ ছিল না। এভাবে টানা চার মাস সমুদ্রে কাটানো খুবই কষ্টকর ছিল, নিজেদের খুবই অসহায় মনে হতো।”
কী চ্যালেঞ্জ ছিল?
যুদ্ধকালীন জাহাজের ক্যাপ্টেনসহ সিনিয়র নাবিকরা সহকর্মীদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এছাড়া বিএসসির পক্ষ থেকে নাবিকদের সাথে নিয়মিতই অনলাইনে যোগাযোগ করে উৎসাহ দেওয়া হতো। ওই সময় বিএসসি নাবিকদের জন্য যুদ্ধকালীন বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও করে। তারপরও নাবিকদের মধ্যে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়ে যায়।
আরিফ বলেন, “র্দীঘদিন আটকে থাকায় কোনো কোনো নাবিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারও দাঁতে সমস্যা দেখা দেয় এবং কারও ত্বকে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দেয়। লম্বা সময় আটকে থাকার কারণে ওষুধের সংকটও হয় কিছুটা। এছাড়া জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার ও জ্বালানি তেল কমে আসার চ্যালেঞ্জ ছিল।” আরিফ বলেন, যুদ্ধকালীন বিভিন্ন বন্দর থেকে রসদ সংগ্রহ করা কঠিন ছিল। ওই সময়ে খাবার পানি রেশনিং করে ব্যবহার করতে হয়েছে। আর নাবিকদের মনোবল ঠিক রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
ঘরে ফেরা নিয়ে শঙ্কা
এমভি বাংলার জয়যাত্রার নাবিক আরিফের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই হলেও বন্দরনগীর খুলশী এলাকায় তারা থাকেন। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে ছোট আরিফ শখ করেই নাবিক হয়েছেন। পড়াশোনা শেষ করেই চার বছর আগে যোগ দেন জাহাজে। আগে দুই দফায় জাহাজে চাকরি করলেও কোনো বিপদের সম্মুখীন হননি। কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। আরিফ ইফতেখার বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আটকে থাকলেও জাহাজে ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু ছিল। এসময় সব নাবিক দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলতেন। আমি আব্বু-আম্মুর সাথে নিয়মিত কথা বলেছি। আম্মু প্রায় সময়ই আমার কথা ভেবে কাঁদতেন। আমি ভালো থাকার কথা বললেও প্রকৃত চিত্র উনাকে বলতাম না।”
চার মাস পর যেদিন দেশে ফিরলেন বাংলার জয়যাত্রার ১৬ নাবিক। ছবি: সংগৃহীত
আরিফ আরও বলেন, “আমরা জাহাজ নিয়ে কয়েকবার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেও সফল হইনি। ২৩ জুন রাতে হরমুজ পার হবার জন্য আমরা রওনা দিই। ইরানি নৌ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমাদের হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি ছিল না। সে দেশের নৌবাহিনী ওই দিন মিলিটারি ভ্যাসেল পার হওয়া নিয়ে সতকর্তা দিয়েছিল। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগানো হয়।”
‘‘রাতের বেলা অন্ধকারের মধ্যেই আমরা জাহাজ নিয়ে রওনা দিই। জয়যাত্রার সামনে অন্য একটি জাহাজ ছিল। ওইদিন দ্বিতীয় জাহাজ হিসেবে আমরা পাঁচ ঘণ্টায় হরমুজ পাড়ি দিয়েছিলাম। ওই সময় আমাদের জাহাজের জিপিএস ছিল না, লাইটও ছিল বন্ধ। ওই পাঁচ ঘণ্টা ছিল রুদ্ধশ্বাস সময়। যেকোনো সময় আক্রমণের শঙ্কা মাথায় নিয়ে প্রণালি পার হচ্ছিলাম। এ সময় পরিবারের সদস্যদের মুখই বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। আব্বু-আম্মুর কাছে ফিরতে পারা নিয়ে ছিল শঙ্কা।”
থার্ড অফিসার আরিফ বলেন, ‘‘আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ছিল। আমরা হরমুজ পাড়ি দিয়ে ফুজাইরাহ বন্দরে পৌঁছাই। সেখান থেকে আফ্রিকার ডারবান বন্দরে গিয়ে জাহাজ ছাড়ি। ২১ জুলাই আমরা সেখান থেকে বিমানে বাংলাদেশে আসি।”
যুদ্ধ চলাকালীন পারস্য উপসাগরে চার মাসের কাছাকাছি সময় আটকে থাকা তার নাবিক জীবনে স্মৃতি হয়ে থাকবে। এখন খুলশীর বাসাতেই পরিবারের সাথে সময় কাটছে আরিফ ইফতেখারের। আপাতত আগামী তিন মাস পরিবারের সদস্যদের সাথেই কাটাতে চান তিনি। এরপর আবারও সমুদ্রযাত্রায় নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছা তার।