৩১ বছরেও লালবাগ কাঁপে সাত খুনের দুঃস্বপ্নে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
৩১ বছরেও লালবাগ কাঁপে সাত খুনের দুঃস্বপ্নে
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি

একটা উৎসব মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকে। কিছুক্ষণ আগেই যে মানুষগুলো হস্যোজ্জ্বল ছিলেন, তারাই হয়ে গেলেন রক্তাক্ত মৃতদেহ। বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বহু ঘটনাই ঘটেছে, কিন্তু ১৯৯৪ সালের ৩১ জানুয়ারি লালবাগ হত্যাকাণ্ড ছিল রোমহর্ষক।

নির্বাচনী বিজয় উৎসবের মিছিলে ব্রাশফায়ার করে মানুষ হত্যা আজ থেকে ৩১ বছর আগে গোটা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল, শোকাতুর করে তুলেছিল।

১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের চার সিটি করপোরেশনে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মেয়র নির্বাচনের সঙ্গে কাউন্সিলার নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। হানিফের কাছে হেরে যান বিএনপির মির্জা আব্বাস ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছে হারেন মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন। রাজশাহী ও খুলনার মেয়র পদে জয় পান বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু ও শেখ তৈয়বুর রহমান।

ঢাকায় মেয়র পদের সঙ্গে কাউন্সিলার পদেও জিতেছিলেন আওয়ামী লীগের বেশ কিছু প্রার্থী। লালবাগ এলাকা যে ওয়ার্ডে পড়েছে, সেই ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলার হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের হুমায়ূন কবীর।

নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩০ জানুয়ারি। নির্বাচনের পরদিন ৩১ জানুয়ারি বিজয়ী কাউন্সিলার হুমায়ূন কবীরের সমর্থকেরা এক বিজয় মিছিলের আয়োজন করেন। হৃদয়বিদারক সেই হত্যাকাণ্ড ঘটে সেই বিজয় মিছিলেই।

বিজয় মিছিল নিয়ে এলাকায় বিএনপি দলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেদিন মিছিলের প্রস্তুতি চলছিল সকাল থেকেই লালবাগের নবাবগঞ্জ মাঠে। রং–বেরঙের ব্যানার ফেস্টুন, আর বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির ছিল হুমায়ূন কবীরের কর্মী–সমর্থকেরা। সেদিন লালবাগে এসেছিলেন সে সময়ের খাদ্যমন্ত্রী ও লালবাগ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা মীর শওকত আলী। সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থানীয় নেতা মেজবাহউদ্দিন সাবু। এটাও উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।

একপর্যায়ে মীর শওকত ও মেজবাহউদ্দিন এলাকা ত্যাগ করেন। হুমায়ূন কবীরের কাছে যে প্রার্থী হেরেছিলেন, সেই আজিজের সমর্থকেরা এর পরপরই অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হুমায়ূন কবীরের সমর্থকদের ওপর। অস্ত্রের আওয়াজে প্রকম্পিত হয় এলাকা। মুহূর্তেই গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩০–৪০ জন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। উৎসবমুখর লালবাগ ও নবাবগঞ্জ মাঠ পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। গুলির শব্দে সেদিন গোটা লালবাগে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

সেদিনের সেই লালবাগ হত্যাকাণ্ড সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসে সেই লালবাগ হত্যাকাণ্ড ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে থেকে গেছে চিরদিনের জন্য। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্যে বিতর্ক হতে পারে, কথার লড়াই হতে পারে, কিন্তু তাই বলে হত্যাকাণ্ড! তাও এমন নৃশংস কায়দায়? সেদিন ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিয়েছিল সাতটি তাজা প্রাণ। আহত হয়েছিল ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো মানুষ।

লালবাগ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল? এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কী কারও শাস্তি হয়েছে? দেশব্যাপী তোলপাড়ের মধ্যেই সে সময় ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী আজিজুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যদিও তিনি পরে জামিনে মুক্ত হয়ে যান। গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আরও অনেককেই। মূলত এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতদেরই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০০৮ সালের ৭ মে ঢাকার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ টি এম মুসা এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার রায়ে আবদুস সালাম ওরফে মতি এবং জাহিদ হাসান ওরফে নাটকা বাবু নামের দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। এছাড়া আবদুল আলিম ওরফে শাহীন, মুনির পাটোয়ারি, মাহতাব হোসেন, দেলোয়ার হোসেন ওরফে আন্ডা, আমির হোসেন, দিল মোহাম্মদ মতি, কালু ওরফে কাইল্যা, মোজাম্মেল ও মুন্নাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।

পরে হাইকোর্ট সাত খুনের মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, নয়জনের যাবজ্জীবন এবং একজনের ১০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখেন। আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি করে বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের বেঞ্চ ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই এ রায় ঘোষণা করেছিলেন।

সম্পর্কিত