ads

ঢাকা-বেইজিং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সামগ্রিক সম্পর্কেরই অংশ: চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ঢাকা-বেইজিং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সামগ্রিক সম্পর্কেরই অংশ: চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্যসমাপ্ত চীন সফর ছিল ‘সম্পূর্ণ সফল’ ছিল এবং এই সফর ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে শক্তিশালী গতি সঞ্চার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় চীনা দূতাবাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, “এটি সম্পূর্ণ সফল একটি সফর। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় উন্নীত করেছে।”

বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নতুন মাত্রার পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরকে একটি নতুন কৌশলগত সুযোগ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইয়াও ওয়েন বলেন, অর্থনৈতিক করিডোরের ধারণা নতুন নয়। প্রায় ১৫ বছর আগে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

তিনি বলেন, বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বার্থে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলতে চীন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, এই উদ্যোগে ভারতসহ অন্য দেশকে যুক্ত করতে চীন উন্মুক্ত রয়েছে। তবে এতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেই নিতে হবে।

তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প

ইয়াও ওয়েন বলেন, সফরের সময় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি) বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ এ প্রকল্পের সঙ্গে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত।

তিনি বলেন, “তিস্তা বাংলাদেশের প্রকল্প। এটি আপনাদের নিজস্ব প্রকল্প।”

‘২+২’ সংলাপ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

রাষ্ট্রদূত জানান, সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ (স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ) চালুর সিদ্ধান্ত এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘২+২’ সংলাপ কাঠামো চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক একটি সর্বাত্মক (কমপ্রিহেনসিভ) সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তারই একটি অংশ।

তবে সম্ভাব্য কোনো নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার বিষয়ে মন্তব্য করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

অনুষ্ঠানে দূতাবাসের পরিচালক ঝাং জিং এবং কাউন্সেলর সং ইয়াং উপস্থিত ছিলেন।

সম্পর্ক উন্নীত হয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে

এদিকে গত শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ’ থেকে উন্নীত হয়ে ‘বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি উইথ অ্যা শেয়ার্ড ফিউচার’-এ পৌঁছেছে, যা চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সর্বোচ্চ স্তর।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার মালয়েশিয়া ও চীন সফরের অর্জন তুলে ধরে তিনি বলেন, “চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ ধাপ।”

দুই দেশের রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।

‘২+২’ সংলাপ এখনো আলোচনাধীন

‘২+২’ সংলাপ প্রসঙ্গে ড. খলিলুর রহমান বলেন, “এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এটি এখনো অনুসন্ধান বা আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। আমরা বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করব।”

সাধারণত ‘২+২’ সংলাপে উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অংশ নেন। একসময় এটি পশ্চিমা দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কাঠামো ছিল। বর্তমানে চীন কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুরক্ষা এবং বহিরাগত চাপ মোকাবিলায় কূটনৈতিক সমন্বয়ের জন্য এই কাঠামো সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছে।

১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিল সই

বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে ১৭টি দলিল সই করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি, যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং কৃষিপণ্য বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রটোকল।

পানি সম্পদ ও অবকাঠামো সহযোগিতা

দুই দেশ সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও জোরদারে সম্মত হয়েছে।

সফরের অন্য অর্জন

মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুক্রবার দেশে ফেরেন। এটি ছিল তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর।

চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘সামার দাভোস’ বা ১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে তিনি উদীয়মান অর্থনীতির প্রতিনিধিত্বকারী নেতা হিসেবে অংশ নেন।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ওই ফোরামে মূল বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।

বেইজিং সফরে বাংলাদেশ ও চীন মংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে একমত হয়।

এ ছাড়া, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় বৃহৎ ও ক্ষুদ্র জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সহযোগিতা, কুনমিং থেকে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থা, চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (টিআরসিএমআরপি) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে।

সম্পর্কিত