এমএসএফের প্রতিবেদন

এক মাসেই নির্বাচনী সহিংসতা বেড়েছে ৯ গুণ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এক মাসেই নির্বাচনী সহিংসতা বেড়েছে ৯ গুণ
ছবি: এআই জেনারেটেড

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে নির্বাচনী সহিংসতা বেড়েই চলেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে ৯ গুণ। গত ডিসেম্বরে ৭টি নির্বাচনী সহিংসতায় ৯৭ জন আহত ও একজন নিহত হয়। জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যায়। এ মাসে ৬৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় ৫০৯ জন আহত ও চারজন নিহত হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদন জানুয়ারি, ২০২৬’–শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়।

এমএসএফ বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জানুয়ারিতে নির্বাচনী সহিংসতার ৬৪টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫০৯ জন। তাদের মধ্যে ৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির সমাবেশে অসুস্থ হয়ে সাইদুল ইসলাম (১৪) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন (৫৫) সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাগবিতন্ডার একপর্যায়ে যুবদল কর্মীর ঘুষিতে আজাহর (৪৫) নামের এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দে ১৩টি, বিএনপি-স্বতন্ত্র প্রার্থী ৯টি, গণ অধিকার পরিষদ-স্বতন্ত্র ১টি, বিএনপি-জামাত সংঘর্ষের ৩৩টি, বিএনপি-এনসিপি ১টি ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে ৬টি ঘটনায় দুস্কৃতিকারী কর্তৃক নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা, ভাংচুর, ককটেল বিষ্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

এমএসএফ বলছে, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাসের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ‘জটিল, সহিংস ও উদ্বেগজনক’ রূপ ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে অর্ধেকে নেমে এলেও (১৬ থেকে ৮), সরকার পতনের পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষ করে, নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ৩২০-এ উন্নীত হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণমামলার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

এমএসএফ বলছে, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সমাজে সহিংসতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা জোরদার করে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রতিমা ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড ও হামলার ঘটনা জানুয়ারি মাসে স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত হয়। ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণ ও হত্যা, শারীরিক নির্যাতন এবং হত্যার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মহত্যার উচ্চ হার সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার গভীর সংকট নির্দেশ করে। এ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৩৪টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১১টি, ধর্ষণ ও হত্যা ৩টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫ জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী।

গণপিটুনির ঘটনায় জানুয়ারিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করছে এমএসএফ।

সম্পর্কিত