Advertisement Banner

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশকে চীনের পূর্ণ সমর্থন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশকে চীনের পূর্ণ সমর্থন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: ইউএনবি

বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী পূর্ণ সমর্থন ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে চীন। একই সাথে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনব্যাপী ঐতিহাসিক চীন সফর শেষে আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা ও বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ১৫ দফার এক যৌথ বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এর আগে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রিমিয়ার লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনে তাঁর প্রথম সরকারি সফর শুরু করেন। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত সামার ডাভোসে অংশ নেওয়া ছাড়াও বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রিমিয়ার লি ছিয়াং এবং জাতীয় গণকংগ্রেসের চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সাথে পৃথক দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠক করেন।

যৌথ ইশতেহার অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও চীন সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা, জলবায়ু ও বন্যা পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ প্রশমন এবং দেশব্যাপী নদী খনন কর্মসূচিতে একযোগে কাজ করবে এবং এই খাতে আধুনিক চীনা প্রযুক্তি বাংলাদেশের সাথে ভাগ করে নেওয়া হবে। পাশাপাশি দুই দেশ সামুদ্রিক খাতেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার উচ্চ প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে চীন বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা পুনর্ব্যক্ত করে বন্ধুভাবাপন্ন আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে সাধ্যমতো মধ্যস্থতা ও সহযোগিতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বাংলাদেশকে দেওয়া চীনের শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন যে এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। বিবৃতিতে জানানো হয়, চট্টগ্রামে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প যৌথভাবে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ই-কমার্স, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এবং ক্লিন এনার্জির মতো উদীয়মান খাতে চীনা বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ককে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে রাজনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ প্রক্রিয়া চালু করা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের সফর, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। একই সাথে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত বোঝাপড়া বাড়াতে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ‘২+২’ সংলাপ মেকানিজম চালুর সম্ভাবনা অন্বেষণ করা হবে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন এবং একই সাথে নতুন সরকারের গৃহীত “বাংলাদেশ বিফোর অল” নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছে বেইজিং। চীন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় দৃঢ়ভাবে পাশে থাকবে। অনুরূপভাবে বাংলাদেশও চীনের মূল স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে 'এক চীন নীতি'র প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে তাইওয়ান চীনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বাংলাদেশ যেকোনো ধরনের তাইওয়ানের স্বাধীনতার তীব্র বিরোধিতা করে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশ্বজনীন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভস এবং যৌথ ভবিষ্যতের সমাজ গড়ার দূরদর্শী চিন্তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকাকে সমর্থন করেছে চীন। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের প্রভাব বাড়াতে ব্রিকসে অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদনকে সরাসরি সমর্থন জানানোর ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সরকার ও জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যৌথ ইশতেহারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব এক নতুন যুগের সূচনা করল।

সম্পর্কিত