অ্যাসিটোন বানানোর উপায় আবিষ্কারেই কি ইসরায়েলের জন্ম?

ইয়াসির আরাফাত
ইয়াসির আরাফাত
অ্যাসিটোন বানানোর উপায় আবিষ্কারেই কি ইসরায়েলের জন্ম?
পশ্চিম তীর দখলের বিল ইসরায়েলের পার্লামেন্টে প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে। ছবি: পেক্সেলস

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, প্রায় আট দশক ধরে চলমান এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে অ্যাসিটোন উৎপাদনের একটি সুনির্দিষ্ট ও সুলভ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার আবিষ্কার! যদিও এটি কোনো সর্বজনগ্রাহ্য একক কারণ নয়, তবে ইতিহাসটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগে ইহুদিদের অতীত ইতিহাস খুব সংক্ষেপে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

ইহুদি সম্প্রদায় একসময় আজকের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করত। চতুর্থ শতাব্দীতে সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করলে তারা প্রথম বড় ধরনের ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়। পরবর্তীতে পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনেও তাদের ভাগ্যের বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিষ্টানরা জেরুজালেম দখল করলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইহুদিদের উৎখাত প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পঞ্চদশ শতকের শেষে রাজা ফার্ডিনান্দ ও রানী ইসাবেলার নেতৃত্বে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান হলে ‘ইনকুইজিশন’ বা চার্চের নির্যাতনের শিকার হয় মুসলিম ও ইহুদি উভয় সম্প্রদায়ই।

এরপর থেকেই ইহুদিদের যাযাবর ও উদ্বাস্তু জীবন শুরু হয়; কোথাও তারা স্থায়ী হতে পারেনি। ১৮৮০ সালের দিকে ইউরোপের অবহেলিত ইহুদিরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় জায়নবাদী আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৮৯৬ সালে থিওডোর হার্জেল তাঁর ‘দ্য জুইশ স্টেট’ বইয়ে একটি স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্রের রূপরেখা তুলে ধরেন এবং ফিলিস্তিনে সেই রাষ্ট্র গড়ার প্রস্তাব দেন।

সময়ের পরিক্রমায় আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের আগে তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্য (তুরস্ক) থেকে সমরাস্ত্র তৈরির অপরিহার্য উপাদান গ্লিসারিন কিনত ব্রিটিশরা। কিন্তু যুদ্ধে তুরস্ক ব্রিটিশদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় গ্লিসারিন রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী যখন গভীর সংকটে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন চাইম ওয়াইজম্যান। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রথিতযশা ইহুদি বিজ্ঞানী ও জায়নবাদী নেতা। রাশিয়ায় জন্ম নিলেও তিনি জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেখানে ইহুদিবিদ্বেষ প্রবল হয়ে উঠলে একপর্যায়ে ব্রিটেনে চলে আসেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্লিসারিনের বিকল্প হিসেবে অ্যাসিটোন উৎপাদনের একটি সুলভ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন ওয়াইজম্যান। ‘কর্ডাইট’ নামক ধোঁয়াবিহীন বিস্ফোরক তৈরির মূল উপাদান ছিল এই অ্যাসিটোন, যা আর্টিলারি শেলে ব্যবহৃত হতো। ওয়াইজম্যান ব্যাকটেরিয়া গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুট্টা ও অন্যান্য উদ্ভিদজাত উপাদান ব্যবহার করে এই নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এর আগে অ্যাসিটোন তৈরিতে প্রচুর কাঠের প্রয়োজন হতো, যা যুদ্ধের সময় জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ওয়াইজম্যান এই ফর্মুলা ব্রিটিশ সরকারের হাতে তুলে দিলে গোলাবারুদ উৎপাদন বহুগুণ সহজ হয়ে যায়।

এই আবিষ্কার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ঐতিহাসিক দাবি করেন, ব্রিটিশ সরকার এই সামরিক সাহায্যের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ওয়াইজম্যানের কাছে জানতে চেয়েছিল ব্রিটেন কীভাবে তার ঋণ শোধ করতে পারে। ওয়াইজম্যান নিজের জন্য কিছু না চেয়ে ইহুদি জাতির জন্য ফিলিস্তিনে একটি স্থায়ী আবাসভূমির দাবি জানান। এই ঘটনার ধারাবাহিকতায় তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ইহুদি নেতা ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে মাত্র ৬৭ শব্দের একটি চিঠি লেখেন, যা ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত। এই চিঠিতেই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য বেলফোর ঘোষণার পেছনে কেবল ওয়াইজম্যানের আবিষ্কারই একমাত্র কারণ কি না, তা নিয়ে আজও বিতর্ক বিদ্যমান।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর ফিলিস্তিনসহ আরবের বিশাল অঞ্চল ব্রিটিশদের অধীনে আসে, যা ওয়াইজম্যানের দাবি বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করে দেয়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে গিয়ে বসতি স্থাপন শুরু করে। গত শতকের ত্রিশের দশকে জার্মানিতে নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধন শুরু হলে এই অভিবাসন গণহারে বাড়তে থাকে। নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় আরবরাও এর প্রতিবাদ জানায়, যা একসময় দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাতের রূপ নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপিত হলে ১৮১ নং প্রস্তাবের মাধ্যমে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনের ৪৫ শতাংশ আরবদের এবং ৫৫ শতাংশ ইহুদিদের জন্য নির্ধারিত হয়। এরপরই শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ অভিযান, যার ফলে লাখ লাখ আরব বাস্তুচ্যুত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ বাহিনী ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে গেলে জন্ম নেয় ইসরায়েল রাষ্ট্র। মজার বিষয় হলো, নবগঠিত এই ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন সেই অ্যাসিটোনের আবিষ্কারক চাইম ওয়াইজম্যান!

পরবর্তীতে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৩ সালে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের চারটি বড় যুদ্ধ হয় এবং সব কটিতেই আরব জোট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ফলে সিরিয়া, মিশর ও জর্ডানের অনেক এলাকা ইসরায়েল দখল করে নেয়।

বিজ্ঞান ও রাজনীতি কীভাবে একে অপরের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, এই ইতিহাস তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ব্রিটিশ গবেষণাগারের একটি রাসায়নিক উদ্ভাবন কি তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছিল? একে চূড়ান্ত ধ্রুব সত্য বলা না গেলেও, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রভাব ছিল অপরিসীম।

তথ্যসূত্র: জুইশ হিস্ট্রি ডট ওআরজি, ব্রিটানিকা ডট কম, কেমিস্ট্রিওয়ার্ল্ড ডট কম এবং ওয়াইজম্যান ইউএসএ ডট ওআরজি

সম্পর্কিত