আল জাজিরার বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের নির্বাচন: সেনাবাহিনী কি এখনো পর্দার আড়ালের একটি শক্তি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাংলাদেশের নির্বাচন: সেনাবাহিনী কি এখনো পর্দার আড়ালের একটি শক্তি?
ফাইল ছবি

ঢাকার রাজনৈতিক আলাপচারিতায় একটি শব্দ প্রায়ই ঘুরেফিরে আসে। আর সেই শব্দটি হলো কচুক্ষেত। সেখানে মানুষ বিতর্ক করে, দেশটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে।

গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাবেষ্টিত কচুক্ষেত জনগণের আলাপে সেনানিবাসের প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ বা সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি রাজনীতিসহ বেসামরিক বিভিন্ন বিষয়ে তাদের প্রভাবকে ইঙ্গিত করে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান এবং নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রথম নির্বাচন।

সেনাবাহিনী নির্বাচনী ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে না। তবে ভোটদানের পরিবেশের ক্ষেত্রে তারা এখন মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের সেই টালমাটাল পরিস্থিতির পর পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা এখনো দুর্বল থাকায় জনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দৃশ্যমান রক্ষাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেনাবাহিনী। মানবাধিকার সংস্থা এবং সরকারি তদন্তের মতে, দেশটিকে এখনো সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে হিসেব-নিকেশ করতে হচ্ছে, যা হাসিনার আমলে রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়েছিল।

প্রায় দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের রাস্তায় টহল দিচ্ছে সেনাসদস্যরা, যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা’র অধীনে কাজ করছে। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই মোতায়েন আরও বৃদ্ধি পাবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, দেশজুড়ে প্রায় এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন হতে পারে। নির্বাচনী বিধিমালার প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে অবস্থিত ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ বারবার এমন সব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে, যা অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসনের মাধ্যমে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। সেই অতীত আজও বাংলাদেশিদের বর্তমানকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী আজ সরাসরি ক্ষমতা দখলের অবস্থানে নেই ঠিকই, কিন্তু তারা এখনো একটি নির্ণায়ক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও সরকারের ভেতরে উপস্থিতির মাধ্যমে বেসামরিক সিদ্ধান্তের পথকে সংকীর্ণ করতে সক্ষম।

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিষয়ক সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিন বলেন, সেনাবাহিনী কেবল রাজনৈতিকভাবেই নয়, বরং পুলিশের দুর্বলতার মধ্যে দৈনন্দিন নিরাপত্তার মাধ্যমেও অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন যে, এই প্রতিষ্ঠানটি একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর দেখতে আগ্রহী, যাতে দেশ একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর ফিরে আসে এবং সেনারা ব্যারাকে ফিরে যেতে পারে।

বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ছবি: রয়টার্স

আল জাজিরাকে কিন বলেন, “সেনাবাহিনীর ভেতরে বিভিন্ন দল এবং ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে আমি বলব যে, সেনাবাহিনী নির্বাচনটি যতটা সম্ভব মসৃণভাবে সম্পন্ন হতে দেখতে চায়।”

কিন যুক্তি দেখান যে, যদি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে চাইত, তবে ৫ আগস্ট যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল তখনই তারা তা করতে পারত। সেই দিনই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। কিন্তু সামরিক বাহিনী তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ হিসেবে ওয়াকার-উজ-জামান মনে করেন, অতীতে সরাসরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তারা করেছিল, তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে সচেতন যে ক্ষমতা দখল তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, যা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আর্থিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা উভয়ই বহন করে। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ জনবল সরবরাহকারী দেশ। এই সেবার বিনিময়ে সেনাবাহিনী প্রতি বছর ১০০ মিলিয়ন থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ ও সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন বাবদ পেয়ে থাকে।

তবে শাহান যুক্তি দেন যে, সামরিক বাহিনী এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। তার মতে, বর্তমানে তাদের প্রভাব সরাসরি হস্তক্ষেপের চেয়ে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক সামরিক বাহিনীর করপোরেট দিকগুলোর দিকেও ইঙ্গিত করেন। এই পদচারণার ব্যাপ্তি বিশাল। রাষ্ট্রীয় বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব ব্যবসায়িক সংস্থা এবং বাণিজ্যিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি পর্যন্ত এটি বিস্তৃত।

আসিফ শাহান বলেন, হাসিনার বিগত সরকার তাদের সুবিধার একটি অংশ দিয়েছিল। যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির এক ধরনের দুর্নীতির সংস্কৃতি গেঁথে গেছে। তিনি ধারণা করেন যে, এটি পরবর্তী সরকারের ওপর একটি অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে যাতে তারা একই ধারা বজায় রাখে। এছাড়া বাহিনীটির ভেতরে এই উদ্বেগও থাকতে পারে যে, তাদের অর্জিত সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারগুলো সংকুচিত হয়ে যাবে কি না।

নির্বাচন প্রসঙ্গে শাহানও মনে করেন যে, সেনাবাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটলে স্থিতিশীলতার একমাত্র উৎস হিসেবে জনতা যদি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ দাবি করে তখন তা হতে পারে।

সামরিক বাহিনীর গতিবিধি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এমন অন্যরাও এই মতের সাথে একমত। সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং বেস্টসেলার বই ‘কমান্ডো’-র লেখক রাজিব হোসেন বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে সেনাবাহিনী নিজেদের স্বার্থেই কোনো দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়ানো এড়িয়ে চলবে। তিনি বলেন, এই নির্বাচনে সেনাবাহিনী একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। গত দেড় বছরে আমরা মাঠ পর্যায়ে যা দেখেছি, তাতে সেনাবাহিনী কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করেছে এমন কোনো রেকর্ড নেই।

তবে তিনি যোগ করেন যে, ২০২৪ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। তিনি বলেন, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্তরে একটি উপলব্ধি কাজ করছে যে, সেনাবাহিনী যদি নিরপেক্ষ থাকতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের যতটুকু জনআস্থা অবশিষ্ট আছে, সেটিও তারা হারাতে পারে।

ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল রুশাও আল জাজিরাকে বলেছেন, রাজনীতিকে প্রভাবিত করার মতো কোনো স্পষ্ট উদ্দেশ্য সামরিক বাহিনীর নেই, যদিও এটি এখনো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

রুশো বলেন, এই প্রভাব বা গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছিল ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়। তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেক বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে নির্ণায়ক হিসেবে দেখেছিলেন। সামরিক বাহিনী যদি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ না করত, তবে আরও বেশি রক্তপাত হতো।

আন্দোলন তীব্র হওয়ার মুখে সামরিক বাহিনী হাসিনার জারি করা কারফিউর আদেশ পুরোপুরি কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এটি হাসিনাকে বিমানবাহিনীর বিমানে করে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে এবং পরবর্তীতে সেনাপ্রধান একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।

বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার আত্মীয়। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই মাসেরও কম সময় আগে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান।

গত বছর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আল জাজিরার একটি তথ্যচিত্রে ওয়াকার বলেন, ‘‘আমরা বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালাই না। এটি আমাদের সংস্কৃতিতে নেই...তাই আমরা হস্তক্ষেপ করিনি।’’

একই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি যে সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়... এটি আমাদের কাজ নয়।”

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। ছবি: চরচা
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। ছবি: চরচা

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অবস্থান সবসময় এমন ছিল না। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার পর দেশটিতে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসনের এক টালমাটাল পর্ব শুরু হয়। এই সময়কাল রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুন রূপ দেয় এবং এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয় যারা আজও নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার করে আছে।

এর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যার প্রতিষ্ঠাতা সেনাপ্রধান থেকে শাসক বনে যাওয়া জিয়াউর রহমান। সত্তরের দশকের শেষের দিকে তিনি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন এবং পরবর্তীতে বেসামরিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮১ সালে আরেকদল সেনা কর্মকর্তার ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টায় জিয়াউর রহমান নিহত হন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি একটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল, যার নেতৃত্বে রয়েছেন জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তিনিও এখন সম্মুখসারির রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন।

১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং আশির দশকের অধিকাংশ সময় দেশ শাসন করেন। লেখক ও রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষমতা দখলের কয়েক মাস আগেই এরশাদ বলেছিলেন,দেশ পরিচালনায় সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা উচিত।

অবশেষে জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া এবং শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গণতন্ত্রকামী আন্দোলন এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। এরপর একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

রুশাও বলেন, এরপর থেকে সামরিক বাহিনীর প্রভাব আরও পরোক্ষ হয়ে ওঠে। তবে বাংলাদেশ ১৯৯৬ সালের মে মাসে একটি ব্যর্থ শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা দেখেছিল, যখন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম রাষ্ট্রপতির আদেশ অমান্য করেছিলেন এবং তার অনুগত সেনারা ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়েছিল। পরে নাসিমকে গ্রেপ্তার ও পদ থেকে অপসারিত করা হয়েছিল।

এক দশক পর, ২০০৭ সালে সামরিক বাহিনী কার্যত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘পূর্ণ সমর্থন’ দেয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চলা খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের পর এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে এই সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ এই প্রশাসনকে টেকনোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কিন্তু সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত হিসেবে বর্ণনা করেছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব দ্রুত অবনতি ঘটছিল এবং সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ রাস্তার সহিংসতা দ্রুত বন্ধ করেছিল।

রুশো বলেন, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর সামরিক বাহিনী প্রথমবার বেসামরিক শাসনের অনুগত বা অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

সামরিক বাহিনী বর্তমানে ক্ষমতা না চাওয়ার বিষয়ে জোর দিলেও তারা প্রায়শই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে হাসিনার পতনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে।

জেনারেল ওয়াকার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, যাই ঘটুক না কেন তিনি ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন করবেন। একই সঙ্গে তিনি ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও উল্লেখ করেন। সমালোচকরা এই সাক্ষাৎকারটিকে একজন দায়িত্বরত সেনাপ্রধানের জন্য অভূতপূর্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সামরিক বাহিনীকে দেশের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বিতর্কের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও লেখক রাজিব হোসেন এই হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য রূপটির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “যদি তিনি (ওয়াকার) সব অংশীজন-অন্তর্বর্তী প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, আন্দোলনের নেতাদের সাথে বসার পর এটি আলোচনা করতেন এবং তারপর গণমাধ্যমে আসতেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু এখানে তিনি একতরফাভাবে এটি ঘোষণা করেছেন এবং নিজের ক্ষমতার অবস্থান থেকে সরকারকে অন্ধকারে রেখেছেন। এটি করার কোনো কর্তৃত্ব তার ছিল না।”

রাজিব আরও বলেন, “আপনি বলতে পারেন এটি একটি ক্রান্তিকাল এবং সামরিক বাহিনীর এখানে ভূমিকা আছে। কিন্তু তাহলে আমাদের একটি সিভিল প্রশাসন থাকার দরকার কী?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহান বলেন, জেনারেল ওয়াকার সীমারেখা অতিক্রম করার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। তিনি এটিকে ৫ আগস্টের পরবর্তী সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ফসল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

তিনি বলেন, “সামরিক সংস্থাগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়ম, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা অনুসরণ করতে পছন্দ করে।” কিন্তু ৫ আগস্ট ছিল একটি রাজনৈতিক বিচ্ছেদ, যা সেনাবাহিনী ও জাতিকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থায়িত্ব, বৈধতা এবং তারা সামরিক বাহিনীর সাথে কেমন আচরণ করবে, তা নিয়ে।

শাহান মনে করেন, এই উদ্বেগগুলোই সম্ভবত ওয়াকারকে কথা বলতে বাধ্য করেছে। তাত্ত্বিকভাবে, স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচন প্রয়োজন-সেনাপ্রধানের এমন কথা বলা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু শাহান বলেন, “যখন তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা, ১৮ মাস নির্ধারণ করে দিলেন, তখন সেটি তার ভূমিকার বাইরে চলে গেল। তখন মনে হয় যেন তিনি আদেশ দিচ্ছেন।”

শাহান আরও উল্লেখ করেন যে, সমস্যাটি তখন আরও প্রকট হয় যখন এই ধরনের নির্দিষ্ট সময়সীমা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের দাবির সাথে মিলে যায়। তিনি সেই সময় এই কথা বলছিলেন যখন কেবল বিএনপিই বারবার নির্বাচনের রোডম্যাপ বা সময়সীমার জন্য চাপ দিচ্ছিল।

আট মাস পর, ২০২৫ সালের মে মাসে, স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী একটি সামরিক সমাবেশে জামান আবারও তার অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানান। ওয়াকার বলেন যে, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হওয়া উচিত। এর পরপরই ইউনূসের বিশেষ উপদেষ্টা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ফেসবুকে লেখেন যে, সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তিনি যুক্তি দেন যে, নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ করে সেনাপ্রধান এখতিয়ারগত বাইরে কাজ করেছেন।

ঠিক সেই সময়েই রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যে ইউনূস পদত্যাগ করার কথা ভাবছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এখন এত নিবিড়ভাবে বিতর্ক হওয়ার আরেকটি কারণ হলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ক্ষত।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করেছে যে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রায়ই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০০৯ সাল থেকে হাসিনার শাসনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে গুমের কথা উল্লেখ করেছে।

২০২১ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে যখন যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছিল, “এই ঘটনাগুলো বিরোধী দলের সদস্য, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের লক্ষ্য করে করা হয়েছে।”

সমালোচকদের মতে, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো শাসনের কেন্দ্রে চলে এসেছিল এবং সেই যন্ত্রটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই প্রশ্নগুলো এখন হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক নিষ্পত্তির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাবেক কর্মকর্তা রাজিব হোসেন বলেন, হাসিনা আমলের উত্তরাধিকার এখনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “আপনি যদি নেতৃত্বের দিকে তাকান-জেনারেল, পাঁচজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং কিছু মেজর জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল-পেশাদার গুটিকয়েক কর্মকর্তা ছাড়া তাদের অনেকেই হাসিনার ব্যবস্থার অংশ ছিলেন।”

গুম সংক্রান্ত বাংলাদেশের তদন্ত কমিশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, গুমকে রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কমিশন এক হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা যাচাই করেছে।

যাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা গেছে, তাদের মধ্যে ভুক্তভোগীদের প্রায় ৭৫ শতাংশ ছিল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠনের এবং প্রায় ২২ শতাংশ ছিল বিএনপির। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যারা এখনো নিখোঁজ বা মৃত, তাদের মধ্যে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সংখ্যা প্রায় ৬৮ শতাংশ এবং জামায়াত ও তাদের সহযোগীদের সংখ্যা প্রায় ২২ শতাংশ।

কমিশন আরও উল্লেখ করেছে যে, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কারসাজি এবং ২০১৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। ডিজিএফআই আওয়ামী লীগের প্রতি কথিত পক্ষালম্বন করে নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে কমিশন যুক্তি দেয়।

বর্তমানে ১৫ জন চাকুরীরত সেনা কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা সিভিল ট্রাইব্যুনালে গুম, হত্যা ও হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।

এই বিচার প্রক্রিয়াটি বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে সিভিল কোর্টে চাকরিরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার নজির বিরল।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া ফেসবুকে লিখেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মতভেদের খবর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তার মতে, এই মতভেদগুলো অন্তর্বর্তী সরকার এবং সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে একটি গভীর ফাটল তৈরি করেছে।

তবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা রাজিব হোসেন এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, “এই বিচারগুলো সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করছে না। বরং, কতিপয় স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তার অপরাধের কারণে যে কলঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে মুক্ত করার জন্য এটি এক ধরনের প্রায়শ্চিত্ত।”

তিনি যুক্তি দেন যে, এই জবাবদিহিতা তরুণ কর্মকর্তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং সামরিক বাহিনীকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুশোও মনে করেন যে, হাসিনার আমলে রাজনীতিকরণ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আদর্শের কারণে হয়নি, বরং কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ারের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের কারণে হয়েছিল।

তিনি বলেন, “পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং এবং প্লেসমেন্ট-এসব ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগ যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করত। যখন আপনি পোস্টিংয়ে প্রভাব খাটান, তখন কিছু মানুষের আনুগত্য প্রায়শই তাদের রাজনৈতিক প্রভুদের দিকে চলে যায়। এটি পেশাদারত্ব ও সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।”

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের কিন বলেন, বাংলাদেশে সামরিক বাহিনী একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকবে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের এক ধরনের প্রভাব বজায় থাকবে। আশা করা যায়, গত ১৮ মাসের শিক্ষা এটাই হবে যে সরাসরি ক্ষমতায় থাকার চেয়ে বেসামরিক প্রশাসনকে সমর্থন দেওয়াই সেনাবাহিনীর জন্য শ্রেয়। তারা একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র এবং বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে।

তবে তিনি যোগ করেন যে, এই দায়ভার কেবল জেনারেলদের ওপর নয়। বেসামরিক রাজনীতিবিদদেরও প্রলোভন সামলাতে হবে যেন তারা সামরিক বাহিনীকে অপব্যবহার না করেন।

সম্পর্কিত