Advertisement Banner

ইরান যুদ্ধে হুতিদের জড়িয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করবে?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
ইরান যুদ্ধে হুতিদের জড়িয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করবে?
ইসরায়েলে ড্রোন হামলা চালিয়োছে ইরান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানের চলমান যুদ্ধে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের জড়ানো নিয়ে বহু আলোচনা চলছিল। এরইমধ্যে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটি ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। ইরান যুদ্ধে বহুল প্রতীক্ষিত তাদের এই অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ শুরু হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, হুতিরা কি দূর থেকে ইসরায়েলের দিকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে লোহিত সাগরের নৌ-চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেবে- এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ইরান নিজেদের ভৌগলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই গুরুত্বপূর্ণ জলপথই যদি ইরান ও হুতিদের অপছন্দের দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার সম্মিলিত প্রভাব হবে বিধ্বংসী। এখানে তাহলে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেই বিখ্যাত উক্তি, “একটি রাষ্ট্রের নীতি তার ভূগোলেই নিহিত”, যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

হুতিরা মূলত ইয়েমেনের শিয়া মুসলিম সংখ্যালঘুদের (জাইদি সম্প্রদায়) প্রতিনিধিত্বকারী একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে রাজধানী সানা থেকে উৎখাত করার পর বর্তমানে তারা দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। হুতিদের সঙ্গে ইসরায়েলের বৈরিতা রয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এক হামলায় হুতিদের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান এবং মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যকে হত্যা করে ইসরায়েল। তবে সংগঠনটির নেতা আবদুল মালিক আল হুতির অবস্থান এখনো শনাক্ত করতে পারেনি ইসরায়েল।

এখনো পর্যন্ত হুতিরা সরাসরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়নি। তবে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের অনেক অস্ত্র তেহরান থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাস থেকে বাব এল-মান্দেব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ চলাচলে হামলা বন্ধ করতে ওমানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। ফলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা হামলা বন্ধ হয়।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এই যুদ্ধবিরতি মূলত হুতিদের ক্ষতির প্রতিফলন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনাগুলোর ওপর কার্যকর হামলা চালিয়েছে। তবে হুতিরা জোর দিয়ে বলেছে, এই যুদ্ধবিরতি কোনোভাবেই ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং এর পরেও কিছু হামলা অব্যাহত ছিল।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি বলছে, এই যুদ্ধবিরতির একটি উদ্দেশ্য ছিল গত বছরের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পারমাণবিক আলোচনার আগে রাজনৈতিক গতি তৈরি করা। গত বেছরের অক্টোবরে যখন ইসরায়েল গাজায় হামাসের সঙ্গে একটা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, তখন হুতিরা সেটি ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করে।

এমনকি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পরও হুতিরা বেশিরভাগ সময় সংযত ছিল।

এরপর মায়ের্স্কের মতো বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে আবার লোহিত সাগরপথে চলাচল শুরু করে, কারণ উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাওয়ার বিকল্প পথটি বেশি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ।

তবে ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকার মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালী বরাবরই ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌকার মাধ্যমে হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে থাকে।

লন্ডন-ভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারিয়া আল মুসলিমি বলেন, এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে শিপিং খরচ বাড়বে, তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে। এতে হরমুজ প্রণালীর কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই চাপে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ফারিয়া আল মুসলিমি আরও বলেন, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার ইরানের কৌশল বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে এই ধারণা বাড়বে যে হুতিরা ইরানের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগী।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, হুতিরা হয়ত আংশিক ও সতর্কভাবে পদক্ষেপ নেবে কারণ তারা সৌদি আরব থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। ইয়েমেনের দক্ষিণে সৌদি আরব আপাতত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। বছরের শুরুতে রিয়াদের চাপে এই গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইয়েমেন থেকে সরে গেছে। ফলে এখন ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ মূলত সৌদি আরবের হাতেই। এটি একটি কঠিন দায়িত্ব, কারণ রিয়াদকে শুধু দক্ষিণের গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেই নয়, হুতিদের সঙ্গেও সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

এসটিসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলেও বাস্তবে এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং রিয়াদ ও জাতিসংঘ-স্বীকৃত দক্ষিণের সরকারের ব্যর্থতার অপেক্ষায় আছে। তারা দাবি করছে, দক্ষিণের আন্দোলন এখনো শক্তিশালী।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চালাতে পারবে না, তাই প্রয়োজন হলে হুতিদের সঙ্গে গোপন সমঝোতার পথ খুঁজবে এবং লোহিত সাগরে হামলার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করবে।

দক্ষিণ ইয়েমেনের নতুন সরকারে সৌদি আরব বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, আর উত্তরের হুতিরা হয়তো সেই অর্থনৈতিক সুবিধার একটি অংশ চাইতে পারে। বিনিময়ে তারা দক্ষিণে যুদ্ধ না বাড়ানো বা লোহিত সাগরে বিঘ্ন না ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।

গার্ডিয়ান বলছে, শেষ পর্যন্ত হুতিদের প্রকৃত শক্তি ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় নয় বরং জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ক্ষমতায়। এর ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর ইয়েমেন শান্তি থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইয়েমেনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেছেন, “এই উত্তেজনা ইয়েমেনকে আঞ্চলিক যুদ্ধে টেনে নিতে পারে, যা সংঘাতের সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলবে, অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াবে এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করবে।” তিনি এর আগেও এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও দেবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত