বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচনের সময়গুলোতে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক উত্তেজনার মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিজেদের অবরুদ্ধ মনে করছেন। তাদের বাড়ি-ঘর লক্ষ্য করে হামলা, হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এর মধ্যে অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে ঘটেনি।
এই প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
রাজশাহী শহরের শিক্ষক সুকুমার প্রামাণিক বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন দেশের রাজনীতির প্রতি তার বিশ্বাসের শেষ পরীক্ষা। তিনি বলেন, “প্রধান দলগুলোর নেতারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, ভোটের আগে এবং পরে আমরা নিরাপদ থাকব।”কিন্তু এই মুহূর্তে তার সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনীতিবিদদের ওপর বিশ্বাস অত্যন্ত কম।
২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বেশ কিছু স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করে হামলার অভিযোগ ওঠে। এই সম্প্রদায়ের অনেকে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিত, যে দলটি দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দাবি করত। যদিও সমালোচকরা দলটির বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘ শাসনামলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া এবং ভয়ভীতি দেখানোর রাজনীতির অভিযোগ তুলেছেন।
প্রামাণিক আল জাজিরাকে জানান, রাজশাহীর বিদ্যাধরপুরে তার নিজের গ্রামের একটি দল হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালায়, তাকে মারধর করে হাত ভেঙে দেয়। এর জন্য তাকে বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি এই বিশ্বাস নিয়ে ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম যে, পূর্বপরিচিতির সূত্রে তারা আমার ওপর হামলা করবে না। তারা আমার হাত ভেঙেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তারা আমার হৃদয় এবং বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। আমি আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি।”
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ হিন্দু, এ ছাড়া খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্মের লোকও বাস করে।
বিশেষজ্ঞ এবং সংখ্যালঘু নেতারা মনে করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসজুড়ে রাজনৈতিক নেতা এবং তাদের সমর্থকেরা মাঝেমধ্যেই ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাতে বা স্থানীয় বিরোধ মেটাতে ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করেন। এর ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, উপাসনালয় এবং ব্যক্তিদের ওপর পরিকল্পিত হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’-এর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ আল জাজিরাকে বলেন, “আপনি যদি অতীতের নির্বাচনের দিকে তাকান, সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন এবং নির্যাতন কখনোই থেমে থাকেনি, এমনকি আওয়ামী লীগের শাসনামলেও। নির্বাচনের আগেও এটি হয়েছে, নির্বাচনের পরেও হয়েছে। এসবের কোনো বিচার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।”
আল জাজিরা বলছে, ২০০১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হওয়ার পর যখন হিন্দুরা হামলার শিকার হয়েছিল, তার কোনো বিচার হয়নি। এমনকি পরবর্তী বছরগুলোতে হিন্দুদের ওপর হওয়া হামলাগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।
নির্বাচনের আগে সাম্প্রতিক বিক্ষিপ্ত হামলা সেই আতঙ্ককে আবার জাগিয়ে তুলেছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৫২২টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রয়েছে। সংগঠনটি জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ওই বছর ২ হাজার ১৮৪টি সহিংস ঘটনা ঘটেছিল। মনীন্দ্র নাথ বলেন, নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
প্রতীকী ছবিতবে বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক হারে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবি অস্বীকার করেছে। ২০২৫ সালে সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা জড়িত আছে এমন ৬৬৫টি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। এর মধ্যে মাত্র ৭১টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক, বাকিগুলো সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কর্মকর্তারা যুক্তি দেন, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, সংখ্যালঘুদের সাথে জড়িত অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত নয়। তারা সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিজনিত অপরাধ থেকে আলাদা করে দেখার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ জন সহিংস অপরাধে মৃত্যুবরণ করেন।
সরকার আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে এই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকভাবে, বিশেষ করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং কর্মকর্তাদের দ্বারা রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করছে। বিশিষ্ট মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২৫ সালে ২২১টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু এবং ১৭ জন আহত হওয়ার খবর রয়েছে, যা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাবের চেয়ে কম হলেও সরকারি তথ্যের চেয়ে বেশি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে রাজশাহীর বিদ্যাধরপুরে হামলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশই পালিয়ে যান এবং নারীদের বাড়িতে রেখে যান।
বিদ্যাধরপুরের গৃহিণী শেফালী সরকার সেই দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, “ওরা আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করতে শুরু করে। আমি ভেবেছিলাম, ওইদিনই বোধহয় মারা যাবো। এই ঘটনা আমার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে এবং এর জন্য পরে আমাকে মানসিক চিকিৎসাও নিতে হয়েছে।”
নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় শেফালী জানান, তিনি উদ্বিগ্ন। তিনি ভয় পাচ্ছেন, যে কোনো নতুন অস্থিরতা আবারও হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। তিনি আবার এমন মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে চান না।
তার স্বামী নারায়ণ সরকার জানান, বিগত কয়েক মাস এলাকাটি শান্ত রয়েছে এবং স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দা ও রাজনৈতিক নেতারা তাদের সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “কিন্তু ভয় সবসময় থেকেই যায়। এই শান্তি যে কোনো সময় কেড়ে নেওয়া হতে পারে।”
তবে ভিন্ন চিত্রও আছে।
ফরিদপুর জেলার স্থানীয় দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামল কর্মকার বলেন, “ঐতিহ্যগতভাবে আমরা এখানে বছরের পর বছর ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেছি। অভ্যুত্থানের সময় অনেক এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেলেও আমাদের এলাকায় তেমন কিছু ঘটেনি।”
তিনি আরও যোগ করেন, রাজনৈতিক নেতারা সংখ্যালঘুদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, তাদের কাছে ভোট চেয়েছেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদে বাস করবে। অন্যদিকে, নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসংযোগের অংশ হিসেবে এই প্রথমবারের মতো খুলনা শহর থেকে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিসাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এলাকা হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ জেলায় নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছে, যেখানে প্রায় এক–চতুর্থাংশ ভোটার হিন্দু। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট (বিএনএইচএম)-এর মহাসচিব গোবিন্দ প্রামাণিক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এই জেলা থেকে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আশঙ্কা করছেন, “এই নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।”
বাংলাদেশ হিন্দু–বৌদ্ধ–খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ দূর করতে সরকার ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন একবারের জন্যও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কাছে জানতে চায়নি–তারা কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বা তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।”
তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছি, যাতে সব সম্প্রদায়ের মানুষ—সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু, যেকোনো ধর্ম ও পরিচয়ের অনুসারীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারেন।”
আগের নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “গত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনার অধীনে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি, কারণ সেই সময়ের নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক হারে কারচুপি হতো। সবাই যেন ভোট দিতে পারে সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার। সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে পরামর্শ করেছে ও তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো সমাধান করেছ।”
রাজশাহীর বিদ্যাধরপুর গ্রামের সুকুমার প্রামাণিক বলেন, সরকারের এসব আশ্বাস তিনি খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করছেন। তিনি বলেন, “এই শেষবারের মতো আমি সরকারকে বিশ্বাস করছি। আবার যদি আমাদের ওপর হামলা হয়, তাহলে সব আশা-ভরসা নষ্ট হয়ে যাবে।”