Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> বিশ্লেষণ

বিরিয়ানি আগে এসেছে কোথায়, ঢাকা না কলকাতায়?

কাজী সাজিদুল হক

কাজী সাজিদুল হক

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৪: ৪৭
বিরিয়ানি আগে এসেছে কোথায়, ঢাকা না কলকাতায়?

বিরিয়ানির কথা উঠলেই আমরা অনেকে নানা ভাবনায় পড়ে যাই। কোন বিরিয়ানি ভালো। কাচ্চি নাকি পাক্কি? বিয়েবাড়ির নাকি দোকানের? দোকানের হলে কোনটা? বিয়েবাড়ি হলে কোন বাবুর্চির? বিরিয়ানি কোথা থেকে এলো? এসব নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ওঠে। বিরিয়ানি নিয়ে এই চর্চা সীমান্তও পেরিয়ে যায়। কোন বিরিয়ানি ভালো, ঢাকা না কি কলকাতা? বাসমতি নাকি চিনিগুঁড়ার?

Advertisement
Advertisement
Advertisement

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ‘ঐতিহ্যবাহী’ তকমা দিয়ে হুটহাট নানা জিনিস জিনিস আমাদের গছিয়ে দিচ্ছে বা আমরাও সোৎসাহে গিলে। এ কাজ হামেশাই হচ্ছে। আর নিজেদেরই বা অত দায় আছে না কি যে, কোনটা ঐতিহ্য আর কোনটা নয় সেটা বুঝে নেওয়ার!

এই যেমন ধরুন ঢাকার বাসমতি চালের কাচ্চি বিরিয়ানির কথা। আজকাল বাসমতি চালের কাচ্চি ছাড়া অন্য কিছু পাওয়াই দায়। আর সেই একই কথা বলা হচ্ছে- ‘ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কাচ্চি’। এ নিয়ে কত বলতে গেলেই বিপত্তি বাঁধে। বিপত্তিটা কোথায়? বলছি।

প্রথম কথা হচ্ছে, ঢাকাই কাচ্চিতে বাসমতি চাল মোটেও ঐতিহ্য নয়। যখন আমি ঐতিহ্যবাহী বলব তখন আমাকে আসল ও আদিটা বলতেই হবে। ঢাকাই কাচ্চিতে চলে ‘চিনিগুঁড়া’ ক্ষেত্রবিশেষে ‘কালোজিরা’ চাল, অনেকে ‘কালিজিরা’ লেখেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

আমরা এটা জানি যে, ‘কাচ্চি’ হলো বিরিয়ানি রান্নার অনেকগুলো পদ্ধতির একটি। নানা পথ ঘুরে ঢাকায় বিরিয়ানির নিজস্ব একটি চরিত্র, একটি স্বতন্ত্র রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় রান্না হওয়া কাচ্চিতে এখন অনেকেই বাসমতি চালের ব্যবহারও করছে। কিন্তু যখনই ‘ঐতিহ্যবাহী’ বাসমতি চালের কাচ্চি বলে খাবারটার বিজ্ঞাপন করা হয় তখন একটু ভুল বলা হয়। ঢাকার কাচ্চিতে বাসমতি চালের ব্যবহার মেরেকেটে গত কুড়ি-বাইশ বছরের মামলা।

ঢাকার বিখ্যাত বাবুর্চি সালাম সাহবের দাবি তিনিই নাকি ১৯৯৩ সালে প্রথম কাচ্চিতে বাসমতি চালের ব্যবহার করেছেন। যা তিনি শুরুতে মূলতঃ বিয়ে ও বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে তৈরি করতেন। সালাম’স কিচেনের স্বত্বাধিকারী জনাব সালাম এক আমলে আরব শেখদের হেঁশেলে কাজ করেছেন। আর পুরান ঢাকার ইশতিয়াক হোসেনের কোলকাতা কাচ্চি ঘরকেই ধরা হয় দেশের সর্বপ্রথম রেস্তরাঁ যা বাসমতি চালের কাচ্চি বিয়েবাড়ির বাইরে যখন-তখন সবাইকে চেখে দেখবার সুযোগ করে দিয়েছিল। শহরের প্রথম বাসমতি কাচ্চির রেস্টুরেন্ট হিসেবে কোলকাতা কাচ্চি ঘরের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের ৩রা নভেম্বর, আবুল হাসনাত রোডে।

সুতরাং কোন বিবেচনাতেই কাচ্চিতে বাসমতি চাল দেওয়ার বিষয়টাকে ঢাকার বাসিন্দাদের আসলে পরম্পরা, পুরুষানুক্রমিক ধারা, কিংবদন্তি, বিশ্রুতি, লোক-প্রসিদ্ধি এবং একটি ইংরেজি শব্দ Tradition অর্থে ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। তাহলে এই ট্রাডিশন বা ঐতিহ্য কী বস্তু? বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘ঐতিহ্য’-এর সমার্থক শব্দ রয়েছে বেশ ক’টি। বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের সময় আলোচ্য শব্দটিকে পরম্পরাগত কথা, পুরুষানুক্রমিক ধারা, কিংবদন্তি, বিশ্রুতি, লোক-প্রসিদ্ধি এবং একটি ইংরেজি শব্দ Tradition অর্থে ব্যবহারের নিদান দিয়েছে একাডেমি। বাসমতি চালের ধানের চাষ হয় মূলতঃ: প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানে। বাসমতি শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘সুগন্ধি’। হিমালয়ের পাদদেশের অঞ্চলগুলো, যেমন- হিমাচল, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরাখ-, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি এবং জম্মু ও কাশ্মীরে চাষ হয় এই চাল।

বাসমতি চালের ঢাকাই কাচ্চি বিরিয়ানি। ছবি: চরচা
বাসমতি চালের ঢাকাই কাচ্চি বিরিয়ানি। ছবি: চরচা

এবারে দুটো দোহাই দেওয়া যাক। প্রথমেই হেকিম হাবিবুর রহমান, যিনি সাতচল্লিশপূর্ব ঢাকার নাগরিক জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রদের একজন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস পেহলে’ তারই রচনা। সেখানে হেকিম সাহেব লিখেছেন, বিরিয়ানিতে আলু ঢাকার মানুষ খুব একটা পছন্দ করতেন না। আরও লিখেছেন, যারা কলকাতায় বেশি যেতেন বা থাকতেন তারাই বিরিয়ানিতে আলু পছন্দ করতেন। হেকিম সাহেবের গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমউদ্দিন। নাজিমউদ্দিন ঢাকার নবাব পরিবারে লোক। হেকিম সাহেব তার ওই বইতে কিন্তু বিরিয়ানি নিয়ে আলোচনাই করেননি। বরং পোলাও নিয়েই তার আলোচনা বিস্তারিত। যেমন, খাচ্ছা পোলাও (মোরগ পোলাও), বুন্দিয়া পোলাও, ইলিশ পোলাও, রুই পোলাও, তেহারি (এটাকেও হাকিম সাহেব পোলাও বলছেন এবং বলেছেন তেহারি রাস্তায় বিক্রি হতো)। ঘরোয়া খাবারে পরিবেশন হয় কিন্তু দাওয়াতে দেওয়া হয় না। আর ছিল শেবেত বা সোইয়া পোলাও, মজমুয়া পোলাও, মাগলুবা পোলাও (খাসির চর্বি ছাড়া মাংস দিয়ে রান্না হতো), নার্গিসি পোলাও। কাবুলি পোলাওকে হাকিম সাহেব খিচুড়ি গোত্রে ফেলেছেন। যদিও তাতে খাসির মাংস দেওয়া হতো। তিনি বায়দা পোলাও বা খাসি পোলাও বলে আরেক বস্তুর কথাও বলেছেন। হাকিম সাহেব ‘দোগোশা’ আর ‘কোরামা পোলাও’কে বিরিয়ানি বলেছেন এবং ‘জের বিরিয়ানি’ বলে এক বিলুপ্ত পদের নাম করেছেন। হাকিম সাহেব এই যে এত খাবারের নাম করলেন তার মধ্যে কাচ্চি বিরিয়ানি কিন্তু বিন্দুমাত্র গুরুত্ব পায়নি। কারণ, বিরিয়ানির চেয়ে পোলাওই ঢাকার রইস ঘরের খাদ্যতালিকায় খাতির পেতো।

বুন্দিয়া /মোতি পোলাও। ছবি: চরচা
বুন্দিয়া /মোতি পোলাও। ছবি: চরচা

হেকিম সাহেবের উর্দু গ্রন্থের সটীক সংস্করণের অনুবাদক ও ভাষ্যকার পুরান ঢাকা বিশেষজ্ঞ হাশেম সূফী তো বলেছেন আরও ভয়ংকর কথা। তার মতে, ‘ঢাকার (আদি) জনগোষ্ঠীর মূল স্রোততো ছিলো তুর্ক-আফগান-পাঠান সুন্নী মতবাদের এবং (কাচ্চি বিরিয়ানীতে) অনর্থক গোলমরিচের সম্পূর্ণ দানার উপস্থিতি ও গরম মসলার অহেতুক আধিক্য যা ঢাকার আবহাওয়ার সাথে সংগতিবিহীন (বিধায় ঢাকায় কাচ্চি খাবার হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে জনপ্রিয় নয়!)। ঢাকার বর্তমান কাচ্ছি (কাচ্চি) অত্যন্ত নিম্নমানের যা কম খরচের জন্য ও কম কষ্টে তৈরির জন্য আপাতত বাজার পেয়েছে।’

হাশেম সূফী পাঠককে পরামর্শ দিয়েছেন শুধুমাত্র শীতকালেই কাচ্চি খেতে এবং পাশাপাশি মনে করিয়ে দিয়েছেন খাবারটা ঢাকার ডিশ নয় বরং লখনৌ, হায়দ্রাবাদ, পাটনা ও মুর্শিদাবাদের ডিশ। এই যে নানারকম পোলাও, যা মাংস সহযোগে রান্না হতো- হেকিম সাহেবের লেখা পড়ে অনেকেই হয়তো বিভ্রান্ত হয়েছেন, হচ্ছেন। এবং নিজেরা পরে সেই পোলাওকে বিরিয়ানি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হেকিম সাহেব তার বইতে যে সময়ের বিবরণ দিয়েছেন, সেটা ১৯ শতকের শেষার্ধ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধ। পরের দিকের তথ্যও কিন্তু বলছে যে দেশভাগের আগে ঢাকায় পোলাওর চলই বেশি ছিল।

চিনিগুঁড়া চালের কাচ্চি বিরিয়ানি। ছবি: চরচা
চিনিগুঁড়া চালের কাচ্চি বিরিয়ানি। ছবি: চরচা

বিরিয়ানি বিশেষতঃ কাচ্চি নিয়ে জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ‘ষাট বছর আগের ঢাকা’ শিরোনামে ২০০৩ সালে প্রকাশিত বইতে লিখেছেন- ‘এখন যেমন বিবাহ উৎসবে বিরিয়ানীর প্রচলন, আগেকার দিনে ঢাকায় সম্ভ্রান্ত লোকের গৃহে মোরগ পোলাওয়ের প্রচলন ছিল।’ ঢাকার খাবার-দাবার নিয়ে অনুপম একটি প্রবন্ধে তিনি এর বেশি একটি বাক্যও বিরিয়ানি নিয়ে ব্যয় করেননি। বরং লিখেছেন শিল্প তত্ত্বজ্ঞ প্রফেসর শাহেদ সোহরাওয়ার্দির কথা। পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হোসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দির বড় ভাই। ত্রিশের দশকে তিনি রন্ধন শিল্প নিয়ে ইংরেজিতে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। ছেপেছিল কলকাতার থ্যাকার, স্পিংক অ্যান্ড কোম্পানি। শাহেদ তার বইতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রান্নার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করেছেন ঢাকার মোরগ-পোলাওয়ের। তিনি লিখেছেন, ঢাকার মোরগ-পোলাওর স্বাদ লিখে তুলে ধরা যায় না। এটি একটি অভিজ্ঞতা, যা অর্জন করতে হয়।

ঢাকায় বিয়ে বাড়িতে যারা ক্যাটারিং করে তাদের হাত ধরেই বিরিয়ানিতে বাসমতির চল শুরু হয়েছে। সুগন্ধি এই চালটির কারণে দামটা একটু ভালো পাওয়া যায়। এই দামের বিষয়টা মাথায় রাখলেই সালাম মিয়া কিংবা কোলকাতা কাচ্চি ঘরের ঢাকাই কাচ্চিতে ‘বিশিষ্ট’ বাসমতি উদ্ভাবনের ব্যাপারটা বোঝা যায়।

আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো, বিরিয়ানি হচ্ছে, যাকে বলে প্রলেতারিয়েত খাবার। মানে বড়লোকের বাড়িতে বিরিয়ানি সাধারণত হতো না। তাঁদের হেঁশেলে হতো পোলাও। সেই পোলাও খাওয়া হতো নানা জিনিস দিয়ে। কোর্মা, কালিয়া, মাংসের আরও নানা পদ। আর বিরিয়ানি হচ্ছে, যাকে বলে ‘ওয়ান পট মিল’। চাল-মাংস (আলু, যার সংযোজন পরে ঘটেছে), মশলা এক সাথে এক পাত্রে রান্না। বিরিয়ানির উৎপত্তি নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সে আলোচনায় যাব না। তবে বড়লোকরা বা ক্ষমতাসীনরা গরিবদের খাওয়াতে বিরিয়ানি রাঁধতেন বলে ইতিহাসের অনেকেই সাক্ষী দেবেন।

বলা হয়ে থাকে, কলকাতায় প্রথম বিরিয়ানির প্রচলন করেন আওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। বিরিয়ানিতে আলুর প্রচলনও নাকি তাঁর হেঁশেলে শুরু হয়। অনেকে বলেন, নবাব সাহেবের কোষাগারে টান পড়ছিল বলে নাকি বিরিয়ানিতে আলু ঢুকেছিল। আবার অনেকে বলেন, আলু তখন আমদানি পণ্য ছিল। সুতরাং সেটা দামী ছিল। সেহেতু ট্যাঁকে টান পড়ায় বিরিয়ানিতে আলু ঢুকেছে- এই তত্ত্ব ঠিক নয়। যে মতই হোক না কেন, বিরিয়ানিতে আলুর সংযোজন বাঙালির জন্য ভালোই হয়েছে। আলুর দোষ থাকুক বা না থাকুক, বিরিয়ানির আলুর কিন্তু কোনো দোষ নেই। খাসা লাগে খেতে।

ইতিহাস বলছে, ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান ঢাকাকে রাজধানী করেন। মাঝখানে অল্প কিছুদিন ছাড়া ঢাকা প্রায় ১০০ বছর রাজধানী ছিল। ওয়াজিদ আলি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন ১৮৫৭ সাল থেকে। আর মুঘলরা ঢাকায় আসেন তারও বহু আগে। তাহলে ঢাকায় কী বিরিয়ানি আগে এসেছে? ইতিহাসের পাতিহাঁস যারা খুঁজে বেড়ান তাদের অনেকেই বলছেন, ঢাকায় মুঘলদের সঙ্গে বিরিয়ানি এসেছে। যদি তাই হয়, তাহলে কলকাতায় বিরিয়ানি পৌঁছাতে দেরি হলো কেন?

অনেকে বলেন, তৈমুর লঙের সঙ্গে ভারতবর্ষে বিরিয়ানি এসেছে এবং আদতে এটি পার্সিয়ান খাবার। তৈমুর লঙের রাজধানী ছিল সমরখন্দ। তৈমুরের দেশসহ পাশের আরও দুটি দেশে আমি গিয়েছি। তিনটি দেশেই বিরিয়ানি বলে কোন বস্তুর দেখা পাইনি। পেয়েছি পিলাফ/প্লোভ/ওশ-এই তিনটে বস্তুর। যা আদতে একই পদ। গাজর, কিসমিস দিয়ে রান্না সুগন্ধি চালের ভাতের ওপরে মাংসের টুকরো দেওয়া। সেই বড় আকারের মাংসটা রান্না করে তার ওপর চাল চাপিয়ে দমে রাখা হয়। সেই দমে রাখা কিন্তু আমাদের মতো হাঁড়ির মুখ ময়দা দিয়ে সিল করে দেওয়ার মতো নয়। বড় ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া থাকে মাত্র। হতে পারে এই জিনিস থেকেই ধীরে ধীরে বিরিয়ানির উৎপত্তি হয়েছে।

পুরান ঢাকার হাজীর বিরিয়ানি
পুরান ঢাকার হাজীর বিরিয়ানি

আবার একটু মুঘল আমলে ফেরা যাক। সম্রাট শাহজাহান তখন গদিনশীন। তিনি শাহজাহানাবাদ স্থাপন করলেন। স্বাভাবিকভাবেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ যারা যারা করতেন তারা সবাই দিল্লি এলেন। ঘাঁটি গাড়লেন আরও বহু মানুষ। দিল্লি নতুন রূপে নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছে। সরগরম ব্যবস্থা। একবার সম্রাজ্ঞী মমতাজ ব্যারাকে গিয়ে নাকি সৈন্যদের শোচনীয় অবস্থায় দেখতে পান। তাদের দুর্বল ও ভগ্ন স্বাস্থ্য তাকে চিন্তিত করে তোলে। তিনি সৈন্যদের জন্য নিয়োজিত পাচককে ডেকে চাল ও মাংস দিয়ে এমন একটি খাবার প্রস্তুতের নির্দেশ দিলেন, যা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে। সম্রাজ্ঞীর নির্দেশ বলে কথা! একটি বিশাল হাঁড়িতে চাল, মাংস এবং হরেক রকমের মসলা দিয়ে অল্প আঁচে ও দমে কয়েক ঘণ্টা রান্না করেই নাকি তৈরি হয় বিরিয়ানি। কিন্তু এই গল্পের সত্যাসত্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। শাহজাহানাবাদের কতটুকু দেখা পেয়েছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত সম্রাজ্ঞী মমতাজ! তার স্মৃতিতে তাজমহল নির্মিত হলেও মাত্র তিন বছরের মাথায় জীবনের পূর্ণচ্ছেদ পড়ে।

মমতাজের সন্তান ঔরঙ্গজেব মারা যাওয়ার পরে মুঘলরা দ্রুতই দুর্বল হতে শুরু করলে তাদের সঙ্গে আসা অনেক শিল্পী, বাবুর্চিসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েন। এদের উদ্ধার করেন রামপুর, আওধ, হায়দারাবাদসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নবাবরা। বাবুর্চিদের বড় অংশেরই জায়গা হয় নানা নবাবি হেঁশেলে। ঠিক এইসময়েই ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্ম নেয় আওধি ঘরানা। যা বিশ্ব খাদ্যসম্ভারে নানা অবাদান রেখেছে। তুর্কি, মুঘল, আফগান নানা জায়গার খাবার এই হেঁশেলে ঢুকে আরও সুন্দর রূপ নিল।

বিরিয়ানির আওধে জন্মের গল্পটাও শুনুন তাহলে। আওধের নবাব আসাফ উদ দৌলা বড় ইমামবাড়া নির্মাণ কাজ শুরু করলেন ১৭৮০ সালে। শেষ হলো ১৭৯৪ সালে। বলা হয়, নবাব সাহেব নাকি দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের অন্ন-কর্ম সংস্থান নিশ্চিত করার জন্যেই এই ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। কারণ কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় শ্রমিকরা এই প্রকল্পে কাজ করতেন। কী ছিল সেই খাবার? বিরিয়ানি। আওধের দমপুখত বিরিয়ানি। অল্প আঁচে দমে রেখে মাংস আর চাল দিয়ে রান্না। ওয়ান পট মিল। ভাত ও আমিষ এক সঙ্গে। সে রান্নাও নাকি হতো দুর্দান্ত। ঘ্রাাণ পেয়ে একদিন নবাব সাহেব তার শাহী খানসামাকে বললেন, বিরিয়ানি তিনিও খেতে চান। আওধের নবাবি হেঁশেলে ঢুকল বিরিয়ানি।

তাহলে দুটো ঘটনা আমরা পেলাম, যেখানে প্রলেতারিয়াতের জন্য ওয়ান পট মিল হিসেবে বিরিয়ানি রান্না হলো। আওধের নবাবি হেঁশেলের শাহি বাবুর্চিদের বংশধররা অনেকেই এখনো নাকি আছেন এবং বংশ পরম্পরায় রান্না করে যাচ্ছেন বলে শুনেছি। খোদ নবাবের এক বংশধর মানজিলাম ফাতিমা রীতিমত রেস্তেরাঁ খুলে শহর কলকাতায় আওধি খাবারের স্বাদ বিলিয়ে যাচ্ছেন। দিল্লি বিখ্যাত করিমস হোটেলের শুরু যার হাতে তিনিও মুঘল হেঁশেলের বাবুর্চি ছিলেন।

ঘরোয়া চিকেন বিরিয়ানি। ছবি: চরচা
ঘরোয়া চিকেন বিরিয়ানি। ছবি: চরচা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সারা পৃথিবীর মতো ভারতর্ষেও অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। হয়তো বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমাদের ঢাকায় এখনকার বিখ্যাত দোকান হাজির বিরিয়ানি ব্যবসা শুরু করে ১৯৩৯ সালে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো যে বছরে। ঢাকায় মুঘলাই খাবারের জনপ্রিয়তা সবসময় ছিল। এখনও আছে। কিন্তু মুঘলাই খাবার মানে শুধুই বিরিয়ানি নয়। আরও অনেক পদ ছিল। ঢাকার ইরানি-আর্মেনিয়ানদের নিজস্ব অনেক ধরনের খাবারও জনপ্রিয় ছিল বিভিন্ন দাওয়াতে। সেসব একসময় নানা বাবুর্চির হাত ধরে সাধারণের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পায়। অনেকে সেগুলোকে সোজা মুঘলাই খাবারের তালিকার মধ্যে ফেলে দেন। যেমন: কোর্মা। আদতে তুর্কি খাবার হলেও আজকাল অধিকাংশই একে মুঘলাই খাবার বলেই বিবেচনা করেন। নানা ধরণের কাবাব এদেশে তুর্কি, আফগান, মুঘলদের হাত ধরে আসলেও এখন শুধু মুঘলাই খাবার বলেই পরিচিত।

ঢাকার মানচিত্রে কাচ্চি বিরিয়ানির জনপ্রিয়তার পেছনে দেশভাগের পর আসা উর্দুভাষীদের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। ফখরুদ্দিন কিংবা মোহাম্মদপুরের নামী বিরিয়ানির ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে ঢাকাকেই নিজের ঠিকানা বানিয়েছিলেন।

বিরিয়ানি- হোক কাচ্চি কিংবা দমপুখত, আজ নানা ভাবে, নানা কারণে আমাদের খাদ্য-তালিকার অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। কিন্তু তা বাসমতি চাল দিয়ে রান্না বিরিয়ানিকে ঢাকার ‘ঐতিহ্যবাহী’ বিরিয়ানি বলার সুযোগ দেয় না। কারণ বাসমতি চালের পরম্পরাটুকু এখনো তৈরি হয়নি।

বাসমতির বিরিয়ানি আপনার ভালো লাগতেই পারে আবার নাও লাগতে পারে। তবে যখন ঐতিহ্যের কথা বলা হয় তখন একটু ঠিকঠাক বলা ভালো।

অনেকে বিরিয়ানির সঙ্গে সেদ্ধ ডিমও দেয়। নবাব ওয়াজিদ আলী সাহেবের বংশধর কলকাতাবাসী শাহেনশাহ মির্জা এক সাক্ষাৎকারে বিরিয়ানির সঙ্গে ডিম পরিবেশন নিয়ে একটু আপত্তি করেছিলেন। তার মত হচ্ছে, ডিম বিরিয়ানির অনেক স্বাদ নিজে খেয়ে ফেলে। অর্থাৎ, যিনি খাচ্ছেন তাকে বিরিয়ানির স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে।

বিষয়: খাদ্যখাদ্য সংস্কৃতিখাবারদাবারঢাকাকলকাতা
সর্বশেষ
  • ১

    উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে সিকৃবিতে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত

  • ২

    ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোট ২৯ অক্টোবর

  • ৩

    হত্যা মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানো হলো কলিমুল্লাহকে

  • ৪

    মনপুরায় মেঘনার পাড়ে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় যুবক উদ্ধার

  • ৫

    মহাখালীতে এসকেএস টাওয়ারের পেছনের ভবনে আগুন

সম্পর্কিত
  • লং মার্চ থেকে কী পেল বিরোধীরা?

    লং মার্চ থেকে কী পেল বিরোধীরা?

    চলতি মাসে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যে লং মার্চ করেছে তাকে সরকারের জন্য ‘ওয়েক আপ কল’ বলে উল্লেখ করছেন জোটটির নেতারা। প্রায় ১ হাজার গাড়ি নিয়ে এই লং মার্চ করে জোটের পক্ষ থেকে সরকারকে ৬ দফা দাবি দেওয়া হয়েছে। জোট নেতারা ওই ৬ দফায় বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকট

  • বিএনপি ক্ষমতায় সাত মাস : সরকার তো চলছে, দলের কী অবস্থা?

    বিএনপি ক্ষমতায় সাত মাস : সরকার তো চলছে, দলের কী অবস্থা?

    ১৭ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-গ্রেপ্তার আর রাজনৈতিক চাপ সামলে এখন সরকারে বিএনপি। গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর দলের শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ এখন সরকারের দায়িত্বে ব্যস্ত। মন্ত্রিসভা, সংসদ, প্রশাসন, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্

  • কমেডিও কাঠগড়ায়! চীনে বাকস্বাধীনতা কি ডিপ ফ্রিজে?

    কমেডিও কাঠগড়ায়! চীনে বাকস্বাধীনতা কি ডিপ ফ্রিজে?

    চীনের সরকার আসলে কী কী বন্ধ করে দেয় – শুধুই কি বিদেশি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়, নাকি দেশের ভেতরে থাকা সমালোচকদের ওপরও এই নিষেধাজ্ঞা আছে, এমন চিন্তাটা আসা খুবই স্বাভাবিক। তবে এখানে সরকারের লক্ষ্য এর চেয়েও বড়।

  • ইরান যুদ্ধ কি বদলে দিল বিশ্ব তেলের বাজার?

    ইরান যুদ্ধ কি বদলে দিল বিশ্ব তেলের বাজার?

    ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পেরিয়েছে। এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে তেলের বাজার তীব্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আমেরিকানদের ওপর। গ্যাসের দাম কয়েক সপ্তাহ ধরে ৪ ডলারের বেশি। বন্ধকী ঋণের সুদের হারও বেড়ে প্রায় ৭ শতাংশের দিকে যাচ্ছে। আবার ডিজেলের রেকর্ড