গল্পের শুরুটা ১৯৯৩ সালের ‘দ্য ভালচার অ্যান্ড দ্যা লিটেল গার্ল’ নামে একটি ছবি দিয়েই হয়তো করা যায়। বিশ্বে সাড়া তোলা সুদানের সেই ছবিটিতে দেখা যায় একটি জীর্ণ শীর্ণ দেহধারী বাচ্চা মেয়ের মৃত্যু্র জন্য তারই পাশে অপেক্ষা করছে একটি শকুন।
কী নিদারুণ জীবন! যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রতিবছর গড়ে ১২০ কেজির ওপরে খাবার নষ্ট করছে। মুদ্রার ঠিক অন্যপিঠে একজন মানুষ নিজেই খাদ্য হওয়ার অপেক্ষা করছে শকূনের।
বর্তমান পৃথিবীতে ১৯৫টি দেশ রয়েছে। তবে ক্যাপিটালিজমের এই দুনিয়ায় মানচিত্রের তারকাটার ওপর নির্ভর করে একেক জনের জীবন হয় একেক রকম। এখানে কেউ চাইলেই হয়তো এক দিনেই কিনে নিতে পারে কোনো একটি বিশাল দ্বীপ। আবার কিছু কিছু দেশের মানুষের হয়তো বেঁচে থাকাই এক বিরাট অর্জন।
ইউরোপের দেশ লুক্সেমবার্গে যেখানে এক লিটার খাবার পানির দাম ২৪ ডলার, সেখানে আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর একজন সাধারণ মানুষের বার্ষিক আয় ১৮০ ডলারের কাছাকাছি, যা হিসাব করলে মাথাপিছু মাসিক আয় দাঁড়ায় মাসে ১৫ ডলারের মতো। অর্থাৎ, লুক্সেমবার্গের সঙ্গে তুলনা করলে বুরকিনা ফাসোর একজন মানুষের পক্ষে এক লিটার খাবার পানি কিনতে হলে তাকে ব্যয় করতে হবে দেড় মাসের আয়ের চেয়েও বেশি অর্থ। শুধু বুরকিনা ফাসো নয়, আফ্রিকার বহু দেশেই একফোটা পানির জন্য যুদ্ধ লেগে যায়।
প্রশ্ন আসতে পারে–আফ্রিকা মহাদেশ কেন এতটা গরিব? আর আফ্রিকা মহাদেশের দরিদ্র হয়ে ওঠা কি নিছকই প্রাকৃতিক কোনো কারণ, নাকি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো কৌশল?
মনে হতে পারে মহাদেশটি হয়তো শুরু থেকেই গরিব। মনে হওয়াটা অস্বাভাবিকও নয়। কারণ, ক্ষমতাধর পশ্চিমা দেশগুলো ও তাদের সংবাদমাধ্যম আফ্রিকা যে অনাদিকাল থেকেই গরিব–এ কথাই প্রচার করছে। কিন্তু অদ্ভুত ঠেকলেও সত্য হল–জাতিসংঘের সমীক্ষা বলছে ভিন্ন কথা। সারা বিশ্বের মোট খনিজ মজুতের প্রায় ৩০ শতাংশই আছে আফ্রিকায়। এ ছাড়া বিশ্বের মোট তেলের মজুতের ১২ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতের ৮ শতাংশ এই মহাদেশে রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই মহাদেশ থেকে প্রায় ১০০ কোটি টন খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা হয়েছিল, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪০৬ বিলিয়ন ডলার।
প্রশ্ন আসে, প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী একটি মহাদেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষগুলো কেন বাস করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে হবে।
আফ্রিকার একটি বাজার। ছবি: রয়টার্স
আফ্রিকার অতীত
এ জন্য ইতিহাস পাঠ জরুরি। যদিও ইতিহাস পাঠের ধৈর্য্য আমাদের খুব কম। আর বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে অতীতের প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ জানা-বোঝার চেষ্টা তো একেবারে নেই বললেই চলে। কিন্তু সময় সবসময় সোজা পথে চলে না এবং আমরা যে সবসময় সামনের দিকেই এগোচ্ছি, তা-ও নয়। তাই ইতিহাসকে বিবেচনা না করে বর্তমান আফ্রিকাকে বোঝার কোনো উপায় নেই।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, পনেরো শতকে পর্তুগিজরাই ছিল প্রথম ইউরোপীয় জাতি, যারা পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলের সাও তোমে দ্বীপে চিনির বাগানে কাজের জন্য আফ্রিকান দাসদের ব্যবহার শুরু করে। এরপর থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এর মাত্রা চরমে পৌঁছায়। যদিও উনিশ শতকের শেষভাগে ধাপে ধাপে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত আফ্রিকানদের ঘিরে দাসপ্রথার মতো এই অমানবিক ও পাশবিক ব্যবসাটিই ছিল ইউরোপের প্রাথমিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে ইউরোপের শুরুর দিকের উপনিবেশায়নের খরচ মেটানো হয়েছিল।
ওই সময়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গিয়ে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোতে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল। পাশাপাশি কয়েক শতাব্দী ধরে প্রায় সমান-সংখ্যক মানুষকে সাহারা মরুভূমি, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগর দিয়েও দাস হিসেবে পাচার করা হয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক নাথান নান আফ্রিকার দাসপ্রথা এবং এর পরবর্তী অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর একটি গবেষণা করেছেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, আফ্রিকার যে দেশগুলো আজ সবচেয়ে দরিদ্র, ঠিক সেই দেশগুলো থেকেই অতীতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে দাস হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল।
সহজ কথায়, দাসপ্রথার সময় যে এলাকাগুলো থেকে যত বেশি মানুষ হারানো গিয়েছিল, বর্তমানে সেই এলাকাগুলো অর্থনৈতিকভাবে তত বেশি পিছিয়ে।
ঔপনিবেশিক আমলের স্কুলগুলোতে আফ্রিকানদের শেখানো হতো নিজেদের গায়ের রং, ভাষা, পোশাক ও সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে। এমনকি তাদের নিজেদের ঈশ্বরকেও বদলে দেওয়া হয়েছিল।
বিখ্যাত লেখক ও মনোবিজ্ঞানী ফ্রানৎস ফানো ১৯৬১ সালে তার বই ‘দ্য রেচড অব দ্য আর্থ’-এ লিখেছিলেন, “উপনিবেশবাদ শুধু একটি জাতিকে কবজায় নিয়ে তাদের চিন্তাশক্তি কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয় না, এটি অত্যন্ত বিকৃতভাবে সেই জাতির ইতিহাস ও অতীতকেও বদলে দেয় এবং পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।”
আফ্রিকার বর্তমান
আফ্রিকার বর্তমান অবস্থা অনেকটা মিশ্র। যখন কোনো মানুষকে আফ্রিকা মহাদেশের চিত্র দেখানো হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি দারিদ্র্যের চিত্র ভেসে ওঠে। হ্যাঁ, আফ্রিকা মহাদেশে অনেক ধনী দেশও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সিশেলসের কথাই বলা যায়। দেশটির মাথাপিছু আয় প্রায় ২২ হাজার ডলারের কাছাকাছি, যা থেকে বোঝা যায় দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী।
তার আগে আফ্রিকা মহাদেশের সামগ্রিক অবস্থা একটু জেনে নেওয়া যাক। আল জাজিরা জানাচ্ছে, ২০১৯ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, আফ্রিকার ২২টি দেশে প্রধান খনিজ সম্পদ হলো পেট্রোলিয়াম (জ্বালানি তেল) এবং কয়লা।
ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু নাইজেরিয়াই মহাদেশটির মোট তেলের ২৫ শতাংশ উৎপাদন করে। পাশাপাশি অ্যাঙ্গোলা ও আলজেরিয়া যথাক্রমে ১৭ ও ১৬ শতাংশ করে জ্বালানি তেল উৎপাদন করে। অন্যদিকে আফ্রিকা মহদেশের ১১টি দেশে সোনা, লোহা, টাইটানিয়াম, দস্তা ও তামা সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়। আফ্রিকার মধ্যে ঘানা সবচেয়ে বেশি সোনা উৎপাদন করে। এরপর রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মালি। এ ছাড়া ১৩টি দেশে হীরা, জিপসাম, সালফার ও ফসফেটের মতো খনিজ উপাদান প্রধান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর মধ্যে কঙ্গো স্থানীয় শিল্পে ব্যবহৃত হীরা উৎপাদনে প্রথম। এরপর রয়েছে বতসোয়ানা ও দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে মূল্যবান রত্ন হীরা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বতসোয়ানা আফ্রিকার শীর্ষে।
কিন্তু মহাদেশটি নিজেদের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা মেটাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও নানা রকম যুদ্ধ ও দাঙ্গায় জড়িয়ে রয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশে বর্তমানে ৩৫টিরও বেশি যুদ্ধ চলছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ। এর পেছনে নানা কারণ থাকলেও মোটাদাগে বলা যায়, আফ্রিকার খনিজ সম্পদের দিকে এখনো ইউরোপের বেশ কিছু দেশের নজর রয়েছে।
আফ্রিকা মহাদেশের বিশাল একটি অংশ ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। পশ্চিম ও উত্তর আফ্রিকার বিশাল অংশ; যেমন–আলজেরিয়া, সেনেগাল, মালি, আইভরি কোস্ট, মাদাগাস্কার ফরাসি উপনিবেশের আওতায় ছিল। তবে এটি ব্রিটেনের কাছে কিছুই না। মিশর, সুদান, কেনিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ঘানা, নাইজেরিয়া, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে ইত্যাদি দেশগুলো ছিল ব্রিটেনের অধীনে।
শোষণ হয়েছে অবারিতভাবে। অথচ এই উপনিবেশবাদী দেশগুলো সেই কলঙ্কজনক অধ্যায় নিয়ে এখনো লজ্জিত নয়। ২০০২ সালে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছিলেন, “আফ্রিকায় ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।”
তার মতে, সমস্যা এটা নয় যে ব্রিটেন একসময় আফ্রিকা শাসন করেছিল, বরং সমস্যা হলো ব্রিটেন এখন আর সেখানে শাসকের ভূমিকায় নেই।
আফ্রিকান খনি। ছবি: রয়টার্স
২০১৬ সালের একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৪৪ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিকও বরিস জনসনের সঙ্গে একমত। দেশটির সাধারণ নাগরিকেরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে গর্ব করার মতো বিষয় বলে মনে করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গার্ডিয়ানের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে।
আমেরিকায় বর্ণবৈষম্য মানুষের চোখের সামনে ঘটেছিল। তবে ব্রিটেনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ তাদের উপনিবেশগুলোতে হওয়া অত্যাচার সেভাবে দেখেনি। এমনকি ব্রিটেনের স্কুলগুলোতেও এই কালো অধ্যায়গুলো পড়ানো হয় না।
ফলে অনেক ব্রিটিশ নাগরিকই মনে করে, সাম্রাজ্যবাদ হয়তো কোনো মহৎ কাজ ছিল। তাদের কেউ কেউ রাজনীতিবিদদের কথায় প্রভাবিত হয়ে সেই আগের দিনে ফিরে যাওয়ার স্বপ্নও দেখে।
ইউরোপ কিংবা আমেরিকার সঙ্গে যেখানে সম্পর্ক শীতল হয়ে উঠেছে, সেখানে চীন ও আফ্রিকার মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীর হতে যাচ্ছে।
গতবছর সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিংয়ে এক সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণা করেছেন, আগামী তিন বছরে চীন আফ্রিকায় ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবে। পাশাপাশি তিনি দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
ধীরে ধীরে আফ্রিকা মাল্টিপোলার একটি ভারসাম্যের দিকে ঝুঁকছে। তবে মহাদেশটির কপাল থেকে এখনো দাসপ্রথা নামেনি। অন্যরূপে আছে। অন্য মোড়কে আছে। বাস্তবিক অর্থে ক্রীতদাস প্রথা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হলেও আফ্রিকার সঙ্গে এ যেন এখনো জড়িয়ে আছে।
আফ্রিকার দারিদ্র্য কেবল কিছু পরিসংখ্যান বা ক্ষুধার্ত মুখের ছবি নয়। এটা দীর্ঘকালের শোষণ, বঞ্চনা ও বৈশ্বিক রাজনীতির এক জটিল আবর্ত। যে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ, সেই মাটির সন্তানেরা আজ কেন রিক্ত হস্তে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কেবল করুণার চোখে আফ্রিকাকে দেখা হবে চরম ভুল। কারণ, আফ্রিকার আসল শক্তি তার খনিজ সম্পদে নয়, বরং তার মানুষের অদম্য প্রাণশক্তিতে।