‘জালিয়াতিতে চ্যাম্পিয়ন’ হওয়া বন্ধে অন্তর্বর্তী সরকার কী করেছে
ফজলে রাব্বি
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ৩৮
ছবি: চিফ অ্যাডভাইজার জিওবি
‘জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন’– প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য আসার পর থেকে নানা মহলে এ নিয়ে চলছে আলোচনা। অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহী যখন এ ধরনের কথা বলেন, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত মতামত থাকে না। তা রাষ্ট্রের ভাষায় পরিণত হয়। বিশেষ করে সেই ব্যক্তি যদি মুহাম্মদ ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, নোবেলজয়ী ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হন, তাহলে তার উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য দেশের সীমানা পেরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
কী বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা
গত বুধবার ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপোর উদ্বোধন এবং ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’-এর ওয়েবসাইট ও লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন। আমাদের সব জিনিস জাল। বহুদেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানাইছি আমরা।” (সূত্র: প্রথম আলো)
মুহাম্মদ ইউনূস আরও বলেন, “সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি সরকারে থাকা ঠিক না। কারণ, তার মন একটা কাঠামোর মধ্যে ফিক্সড হয়ে গেছে। এর থেকে সে বেরোতে পারে না। নতুন লোক যারা বাইরে থেকে দেখছে, তাদের নিয়ে আসতে হবে।” (সূত্র: প্রথম আলো)
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ নাগরিকদের ওপর, যাদের বড় একটি অংশ বিদেশে কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের জন্য ভিসা ও পাসপোর্টের ওপর নির্ভরশীল।
বাস্তবতা কী
বাংলাদেশে পাসপোর্ট খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনেও সে কথা উঠে এসেছে। ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, সেবাখাতের মধ্যে পাসপোর্ট পেতে গেল ২০২৩ সালে মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হতে হয়েছে।
টিআইবির জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ খানা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাত বা প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ৮৬ শতাংশ খানা দুর্নীতির শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশে ভিসা জালিয়াতি, দালালচক্র বা অবৈধ অভিবাসনের সমস্যা বহু দিন ধরেই চলছে। তবে রাষ্ট্র কি সমস্যার দায় সমষ্টিগতভাবে নাগরিকদের ঘাড়ে চাপাবে, নাকি সমস্যার কাঠামোগত কারণ ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকে সামনে আনবে?
এই প্রশ্ন করা হয়েছিল কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এম. হুমায়ুন কবিরের কাছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে তিনি ‘একটি সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন’ হিসেবে দেখেন। তার মতে, আইনের বাইরে গিয়ে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা গত কয়েক দশকে বেড়েছে, যা এক ধরনের সামষ্টিক ব্যাধির রূপ নিয়েছে। কিন্তু এখানেই আলোচনা থেমে যায় না।
ফাইল ছবি
তিনি বলেন, “বাস্তবতা স্বীকার করা আর রাষ্ট্রীয় ভাষায় নাগরিকদের চিহ্নিত করা এক জিনিস নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল রোগ শনাক্ত করা নয়, চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া। আর সেই চিকিৎসা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। কাঠামোগত সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন–এই প্রশ্নগুলো অনিবার্যভাবে সামনে আসে।”
এই প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করে বলেছেন, কেবল বক্তব্য বা তিরস্কার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তার ভাষায়, “বকাবকি করে বা বক্তব্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি মনে করি না।”
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, “ড. ইউনূসের আক্ষেপ যথার্থ হতে পারে, কিন্তু যথেষ্ট নয়। গত ১৮ মাসে কর্মসংস্থান, শিক্ষা কাঠামো বা দক্ষতা কাঠামো পরিবর্তনের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ব্লুপ্রিন্ট কি আমরা দেখেছি? ড. ইউনূসের মুখ দিয়ে মানুষ কেবল নাগরিকের সমালোচনা আর সমস্যার কথা শুনতে চায়নি। সমাধানের উদ্যোগ ও রোডম্যাপ দেখতে চেয়েছিল। ১৭ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তেমন উদ্যোগ দেখতে না পাওয়ায় প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য নাগরিকদের কাছে নৈতিক চাপ হিসেবেই ধরা দিয়ে থাকতে পারে।”
প্রধান উপদেষ্টার ওই মন্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে কী বার্তা দেয়? অনেকের আশঙ্কা, এই বক্তব্যের ফলে বিদেশি দূতাবাসগুলো বাংলাদেশি নাগরিকদের আরও সন্দেহের চোখে দেখবে।
হুমায়ুন কবিরের মতে, “বাংলাদেশকে ঘিরে যে ‘রিস্ক পারসেপশ’ বা ঝুঁকির ধারণা বিদ্যমান ছিল। ড. ইউনূসের এই বক্তব্য আগে থেকে থাকা ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। সরকারপ্রধানের মুখ থেকে আসা বক্তব্য বিদ্যমান সন্দেহকে বৈধতা দেয়। কূটনীতিতে এটিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। রাষ্ট্র নিজেই যখন নিজের নাগরিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাষা ব্যবহার করে, তখন সেই ভাষা অন্যদের জন্য গ্রহণযোগ্য রেফারেন্স হয়ে ওঠে। কূটনীতিতে অনেক সিদ্ধান্ত লিখিত নীতির চেয়ে ‘ধারণা’ ও ‘রিস্ক প্রোফাইলিং’-এর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে রাষ্ট্রপ্রধানের ভাষা ভিসা যাচাই ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াকে নীরবে কঠোর করে তুলতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কোনো ব্যতিক্রম নয়। ভিসা জালিয়াতি বা অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্নে উন্নত দেশগুলো সাধারণত দেশভিত্তিক নয়, বরং অঞ্চল বা ‘ব্লকভিত্তিক’ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকার কিছু অঞ্চল–এইভাবে তারা বিষয়টি দেখে।”
হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, “বাংলাদেশকে আলাদা করে আইডেন্টিফাই বা চিহ্নিত করা হয় না। এই বাস্তবতা জানার পরও সরকার প্রধানের মুখ থেকে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ শব্দটি ব্যবহার নাগরিকদের কাছে অপমান হিসেবেই ধরা দেয়। সরকারপ্রধানের মুখ থেকে আমরা জাতিগতভাবেই জালিয়াত, এই কথাটা কেউ শুনতে চাইবে না। এটা আমাদের প্রাইড বা অহংকারে লাগে।”
পুরো আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু আসলে এই বক্তব্য।
এই আলোচনায় নাগরিকদের পক্ষে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ রাজনীতিক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। চরচাকে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে সমষ্টিগতভাবে ‘জালিয়াত’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তিনি মনে করেন, এই সমাজে এখনো বিপুল সংখ্যক মানুষ সৎ, নীতিবান ও মানবতাবাদী, যারা রাষ্ট্র বা সমাজকে প্রতারণা করার সঙ্গে যুক্ত নন। সমস্যাটি মূলত একটি মধ্যবর্তী শোষক ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে ঘিরে, যারা সুযোগ ও দুর্বল কাঠামোর ভেতর দিয়ে সুবিধা নেয়।
সিপিবির সাবেক সভাপতি বলেন, “এই গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারলেই সাধারণ জনগণের প্রকৃত শক্তি ও সক্ষমতা প্রকাশ পাবে। সমস্যার উৎস নির্দিষ্ট না করে নাগরিকদের সমষ্টিগতভাবে দোষারোপ করলে তা বাস্তব সমাধানের বদলে সামাজিক ও নৈতিক দূরত্বই বাড়ায়।”
এই বিতর্কের একটি সাংবিধানিক দিকও আছে। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিককে কেবল রাষ্ট্রের অধীন প্রজা হিসেবে দেখে না; বরং মর্যাদা ও অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্রীয় ভাষা যদি নাগরিকদের সমষ্টিগতভাবে অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে সেটি সংবিধানের চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এই প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মনজিল মোরসেদের মতে, “ড. ইউনূসের বক্তব্যে তিনি নিজেকেও সেই ‘আমরা’র অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রাষ্ট্রপ্রধান নিজেকে বাদ দিয়ে কথা বলেননি। এর আগেও উনি বিদেশি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ টাকা খেয়ে ভোট দেয়। যা অপমানজনক।”
মনজিল মোরসেদ একই সঙ্গে মনে করেন, “বাস্তবে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নন–হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি সৎ নাগরিক আছেন। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সমষ্টিগত ভাষায় কথা বলা নাগরিকদের মর্যাদায় আঘাত করে এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আইন ও সংবিধানের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্যে দায় স্বীকার থাকতে পারে, কিন্তু সেই ভাষা এমন হওয়া উচিত নয় যা পুরো জনগোষ্ঠীকে অপমানিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।”
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য, যার নাগরিকদের বড় অংশ বৈশ্বিক চলাচলের ওপর নির্ভরশীল, রাষ্ট্রের ভাষা তাদের কাছে কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এটি সরাসরি ভিসা কাউন্টার, ইমিগ্রেশন ডেস্ক এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে প্রতিধ্বনিত হয়।
ছবি: চিফ অ্যাডভাইজার জিওবি
‘জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন’– প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য আসার পর থেকে নানা মহলে এ নিয়ে চলছে আলোচনা। অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহী যখন এ ধরনের কথা বলেন, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত মতামত থাকে না। তা রাষ্ট্রের ভাষায় পরিণত হয়। বিশেষ করে সেই ব্যক্তি যদি মুহাম্মদ ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, নোবেলজয়ী ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হন, তাহলে তার উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য দেশের সীমানা পেরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
কী বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা
গত বুধবার ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপোর উদ্বোধন এবং ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’-এর ওয়েবসাইট ও লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন। আমাদের সব জিনিস জাল। বহুদেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানাইছি আমরা।” (সূত্র: প্রথম আলো)
মুহাম্মদ ইউনূস আরও বলেন, “সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি সরকারে থাকা ঠিক না। কারণ, তার মন একটা কাঠামোর মধ্যে ফিক্সড হয়ে গেছে। এর থেকে সে বেরোতে পারে না। নতুন লোক যারা বাইরে থেকে দেখছে, তাদের নিয়ে আসতে হবে।” (সূত্র: প্রথম আলো)
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ নাগরিকদের ওপর, যাদের বড় একটি অংশ বিদেশে কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের জন্য ভিসা ও পাসপোর্টের ওপর নির্ভরশীল।
বাস্তবতা কী
বাংলাদেশে পাসপোর্ট খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনেও সে কথা উঠে এসেছে। ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, সেবাখাতের মধ্যে পাসপোর্ট পেতে গেল ২০২৩ সালে মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হতে হয়েছে।
টিআইবির জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ খানা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাত বা প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ৮৬ শতাংশ খানা দুর্নীতির শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশে ভিসা জালিয়াতি, দালালচক্র বা অবৈধ অভিবাসনের সমস্যা বহু দিন ধরেই চলছে। তবে রাষ্ট্র কি সমস্যার দায় সমষ্টিগতভাবে নাগরিকদের ঘাড়ে চাপাবে, নাকি সমস্যার কাঠামোগত কারণ ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকে সামনে আনবে?
এই প্রশ্ন করা হয়েছিল কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এম. হুমায়ুন কবিরের কাছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে তিনি ‘একটি সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন’ হিসেবে দেখেন। তার মতে, আইনের বাইরে গিয়ে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা গত কয়েক দশকে বেড়েছে, যা এক ধরনের সামষ্টিক ব্যাধির রূপ নিয়েছে। কিন্তু এখানেই আলোচনা থেমে যায় না।
ফাইল ছবি
তিনি বলেন, “বাস্তবতা স্বীকার করা আর রাষ্ট্রীয় ভাষায় নাগরিকদের চিহ্নিত করা এক জিনিস নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল রোগ শনাক্ত করা নয়, চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া। আর সেই চিকিৎসা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। কাঠামোগত সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন–এই প্রশ্নগুলো অনিবার্যভাবে সামনে আসে।”
এই প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করে বলেছেন, কেবল বক্তব্য বা তিরস্কার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তার ভাষায়, “বকাবকি করে বা বক্তব্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি মনে করি না।”
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, “ড. ইউনূসের আক্ষেপ যথার্থ হতে পারে, কিন্তু যথেষ্ট নয়। গত ১৮ মাসে কর্মসংস্থান, শিক্ষা কাঠামো বা দক্ষতা কাঠামো পরিবর্তনের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ব্লুপ্রিন্ট কি আমরা দেখেছি? ড. ইউনূসের মুখ দিয়ে মানুষ কেবল নাগরিকের সমালোচনা আর সমস্যার কথা শুনতে চায়নি। সমাধানের উদ্যোগ ও রোডম্যাপ দেখতে চেয়েছিল। ১৭ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তেমন উদ্যোগ দেখতে না পাওয়ায় প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য নাগরিকদের কাছে নৈতিক চাপ হিসেবেই ধরা দিয়ে থাকতে পারে।”
প্রধান উপদেষ্টার ওই মন্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে কী বার্তা দেয়? অনেকের আশঙ্কা, এই বক্তব্যের ফলে বিদেশি দূতাবাসগুলো বাংলাদেশি নাগরিকদের আরও সন্দেহের চোখে দেখবে।
হুমায়ুন কবিরের মতে, “বাংলাদেশকে ঘিরে যে ‘রিস্ক পারসেপশ’ বা ঝুঁকির ধারণা বিদ্যমান ছিল। ড. ইউনূসের এই বক্তব্য আগে থেকে থাকা ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। সরকারপ্রধানের মুখ থেকে আসা বক্তব্য বিদ্যমান সন্দেহকে বৈধতা দেয়। কূটনীতিতে এটিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। রাষ্ট্র নিজেই যখন নিজের নাগরিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাষা ব্যবহার করে, তখন সেই ভাষা অন্যদের জন্য গ্রহণযোগ্য রেফারেন্স হয়ে ওঠে। কূটনীতিতে অনেক সিদ্ধান্ত লিখিত নীতির চেয়ে ‘ধারণা’ ও ‘রিস্ক প্রোফাইলিং’-এর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে রাষ্ট্রপ্রধানের ভাষা ভিসা যাচাই ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াকে নীরবে কঠোর করে তুলতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কোনো ব্যতিক্রম নয়। ভিসা জালিয়াতি বা অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্নে উন্নত দেশগুলো সাধারণত দেশভিত্তিক নয়, বরং অঞ্চল বা ‘ব্লকভিত্তিক’ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকার কিছু অঞ্চল–এইভাবে তারা বিষয়টি দেখে।”
হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, “বাংলাদেশকে আলাদা করে আইডেন্টিফাই বা চিহ্নিত করা হয় না। এই বাস্তবতা জানার পরও সরকার প্রধানের মুখ থেকে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ শব্দটি ব্যবহার নাগরিকদের কাছে অপমান হিসেবেই ধরা দেয়। সরকারপ্রধানের মুখ থেকে আমরা জাতিগতভাবেই জালিয়াত, এই কথাটা কেউ শুনতে চাইবে না। এটা আমাদের প্রাইড বা অহংকারে লাগে।”
পুরো আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু আসলে এই বক্তব্য।
এই আলোচনায় নাগরিকদের পক্ষে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ রাজনীতিক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। চরচাকে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে সমষ্টিগতভাবে ‘জালিয়াত’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তিনি মনে করেন, এই সমাজে এখনো বিপুল সংখ্যক মানুষ সৎ, নীতিবান ও মানবতাবাদী, যারা রাষ্ট্র বা সমাজকে প্রতারণা করার সঙ্গে যুক্ত নন। সমস্যাটি মূলত একটি মধ্যবর্তী শোষক ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে ঘিরে, যারা সুযোগ ও দুর্বল কাঠামোর ভেতর দিয়ে সুবিধা নেয়।
সিপিবির সাবেক সভাপতি বলেন, “এই গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারলেই সাধারণ জনগণের প্রকৃত শক্তি ও সক্ষমতা প্রকাশ পাবে। সমস্যার উৎস নির্দিষ্ট না করে নাগরিকদের সমষ্টিগতভাবে দোষারোপ করলে তা বাস্তব সমাধানের বদলে সামাজিক ও নৈতিক দূরত্বই বাড়ায়।”
এই বিতর্কের একটি সাংবিধানিক দিকও আছে। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিককে কেবল রাষ্ট্রের অধীন প্রজা হিসেবে দেখে না; বরং মর্যাদা ও অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্রীয় ভাষা যদি নাগরিকদের সমষ্টিগতভাবে অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে সেটি সংবিধানের চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এই প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মনজিল মোরসেদের মতে, “ড. ইউনূসের বক্তব্যে তিনি নিজেকেও সেই ‘আমরা’র অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রাষ্ট্রপ্রধান নিজেকে বাদ দিয়ে কথা বলেননি। এর আগেও উনি বিদেশি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ টাকা খেয়ে ভোট দেয়। যা অপমানজনক।”
মনজিল মোরসেদ একই সঙ্গে মনে করেন, “বাস্তবে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নন–হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি সৎ নাগরিক আছেন। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সমষ্টিগত ভাষায় কথা বলা নাগরিকদের মর্যাদায় আঘাত করে এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আইন ও সংবিধানের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্যে দায় স্বীকার থাকতে পারে, কিন্তু সেই ভাষা এমন হওয়া উচিত নয় যা পুরো জনগোষ্ঠীকে অপমানিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।”
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য, যার নাগরিকদের বড় অংশ বৈশ্বিক চলাচলের ওপর নির্ভরশীল, রাষ্ট্রের ভাষা তাদের কাছে কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এটি সরাসরি ভিসা কাউন্টার, ইমিগ্রেশন ডেস্ক এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে প্রতিধ্বনিত হয়।